০৩:২৫ পি.এম
কিশোরগঞ্জ-মহাখালী রুটের বাস চলাচল পরিবহন মালিকদের বিরোধের কারণে থমকে গেছে। বাস হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুই প্রান্তের টার্মিনালে যাত্রীদের দুর্ভোগের চিত্র তৈরি হয়েছে। কেউ সন্তান ও ব্যাগপত্র নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন, কেউ জরুরি কাজে ঢাকায় যাওয়ার পথ খুঁজছেন, আবার কারও সামনে পরদিনের পরীক্ষায় অংশ নেওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। সাধারণ যাত্রীদের এই পরিস্থিতির জন্য বাস মালিকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের মাশুল গুনতে হচ্ছে। বিকল্প যানবাহনের সংকটের মধ্যে অনেকেই বাড়তি ভাড়া গুনেও গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুর ১২টা থেকে ঢাকা থেকে এবং বিকেল ৫টা থেকে কিশোরগঞ্জ থেকে এ রুটে সরাসরি বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ায় মহাখালী ও কিশোরগঞ্জের গাইটাল আন্তজেলা বাস টার্মিনালে এসে বিপাকে পড়েন যাত্রীরা। বাস বন্ধের খবর না জেনে টার্মিনালে পৌঁছে অনেককে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। পরে বিকল্প যানবাহন খুঁজতে গিয়ে বাড়তি ভাড়া ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন তাঁরা।
ঢাকা ও কিশোরগঞ্জ থেকে অনন্যা পরিবহনের নতুন চারটি বাস এ রুটে যুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে দুই অঞ্চলের পরিবহন মালিকদের মধ্যে কিছুদিন ধরে আলোচনা চলছিল। তবে আলোচনা শেষ করে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর আগেই ঢাকা থেকে দুটি নতুন বাস রাস্তায় নামানো হয়। এ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে কিশোরগঞ্জের পরিবহন মালিক ও শ্রমিকেরা বাস চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন।
আরও পড়ুন: মুসলিম পরিচয়ে প্রেম-বিয়ের আসরে জানা গেল হিন্দু, অতঃপর নাজমা খাতুনের আত্মহত্যা
কিশোরগঞ্জের পরিবহন মালিক নেতাদের অভিযোগ, নতুন বাস যুক্ত করার বিষয়ে পারস্পরিক আলোচনা চললেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগেই একতরফাভাবে বাস নামানো হয়েছে। এতে রুটের প্রচলিত নিয়ম ও শৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন হয়েছে। বিরোধের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অনন্যা পরিবহন, অনন্যা ক্লাসিক, উজানভাটি ও জলসিঁড়ি পরিবহনের বাস চলাচল বন্ধ থাকবে বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
মালিকদের বিরোধের কারণে যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়লেও তাৎক্ষণিক বিকল্প পরিবহনব্যবস্থা না থাকায় ভোগান্তি আরও তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে নারী, শিশু, শিক্ষার্থী ও জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতকারী মানুষ বেশি বিপাকে পড়েছেন। অনেকেই দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও বাস না পেয়ে শেষ পর্যন্ত অন্য যানবাহনে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সুযোগে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও লেগুনার ভাড়া দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ চাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন যাত্রী।
গৃহিণী রোকেয়া বেগম, যিনি সন্তান ও ভারী ব্যাগপত্র নিয়ে মহাখালীগামী বাসের অপেক্ষায় ছিলেন, বলেন, "ছোট বাচ্চাকে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা টার্মিনালে বসে আছেন। কখন বাস চলবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।" অন্যদিকে বিকল্প যানবাহনের চালকেরা কয়েক গুণ বেশি ভাড়া চাইছেন। তিনি আরও বলেন, "না পারছি ফিরতে, না পারছি বিকল্প উপায়ে যেতে।" তাঁর মতো অনেক যাত্রীই গন্তব্যে পৌঁছানোর উপায় না পেয়ে অসহায় অবস্থায় অপেক্ষা করছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী হাজী জুয়েল মিয়ার জরুরি কাজে ঢাকায় যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁর যাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, "আগে থেকে বাস চলাচল বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হলে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া যেত। কিন্তু কোনো পূর্ববার্তা না থাকায় টার্মিনালে এসে বিপাকে পড়তে হয়েছে।" পরিবহন মালিকদের নিজেদের বিরোধের কারণে সাধারণ মানুষকে বারবার এমন দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রাম হবে সব ধর্মের মানুষের নিরাপদ ও সম্প্রীতির নগরী: মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন
কিশোরগঞ্জ-মহাখালী রুটটি দুই অঞ্চলের মানুষের নিয়মিত যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতিদিন এ রুটে যাতায়াত করেন। ফলে হঠাৎ বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শুধু যাত্রাপথেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়নি, অনেকের জরুরি কাজ, কর্মঘণ্টা ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, পরিবহন মালিকদের মধ্যে নতুন বাস যুক্ত করা নিয়ে মতবিরোধ থাকলে তা আলোচনার টেবিলেই নিষ্পত্তি করা উচিত। এ বিরোধের কারণে যাত্রীদের জিম্মি করে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। বিশেষ করে আগাম ঘোষণা ছাড়াই বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় যাত্রীরা বিকল্প পরিকল্পনা করার সুযোগও পাননি। এতে সময় ও অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
ভুক্তভোগী যাত্রীরা দ্রুত দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, নতুন বাস যুক্ত করার বিষয়ে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছে দ্রুত বাস চলাচল স্বাভাবিক করা জরুরি। একই সঙ্গে যাত্রীদের দুর্ভোগ লাঘবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
যাত্রীদের মতে, পরিবহন খাতের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে সাধারণ মানুষের যাতায়াত বন্ধ হয়ে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁদের প্রশ্ন, মালিকদের মতবিরোধের দায় কেন শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী কিংবা জরুরি প্রয়োজনে পথে বের হওয়া সাধারণ মানুষ বহন করবেন? দ্রুত সমাধান না হলে এ রুটে যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন: কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের ‘বাঁধন’-এর ২৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন
গাইটাল বাস টার্মিনালে অপেক্ষমাণ যাত্রী ঊর্মিলা, ফৌজিয়া, দীপ্ত ও শাহীনুর আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সারা দেশের মধ্যে কিশোরগঞ্জ-ঢাকা সড়কে পরিবহনসেবা সবচেয়ে নিম্নমানের বলে তাঁদের মনে হয়। তাঁদের অভিযোগ, যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে, তখন সেই দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রণ নেন। কিন্তু যাত্রীদের দুর্ভোগ লাঘব কিংবা সেবার মান উন্নয়নের পরিবর্তে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতেই বেশি মনোযোগী থাকেন। তাঁদের মতে, কিশোরগঞ্জ জেলা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা গেলে যাত্রীসেবার মান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কিশোরগঞ্জ জেলা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির আহ্বায়ক আনিসুজ্জামান বাবুল বলেন, মহাখালী এলাকার পরিবহন মালিকদের সঙ্গে তাঁদের দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধ চলছে। পুরোনো বাস সরবরাহ এবং কাউন্টার বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধ আরও জটিল হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মহাখালীর পরিবহন মালিকেরা তাঁদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে অসহযোগিতা করছেন। বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে পুরোনো বাস সরবরাহের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। অথচ কিশোরগঞ্জের অন্যান্য পরিবহনে নতুন বাস চলাচল করছে। তাঁরা পুরোনো বাস নিতে রাজি না হওয়ায় মহাখালীতে কাউন্টার বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। আনিসুজ্জামান বাবুল বলেন, "কথায় কথায় কাউন্টার বন্ধ করে দেওয়ায় আমাদের পরিবহন পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে। এ বিরোধের সমাধানের দাবিতেই আমরা বাস চলাচল বন্ধ রেখেছি।
আরও পড়ুন: নারীর গোসলের ভিডিও ধারণের পর ব্ল্যাকমেইল করে ধর্ষণ, গ্রেফতার ধর্ষক
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন