১১:৩৬ এম
ঢাকা, ১৮ জুন, ২০২৬ : আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জলবায়ু সহনশীলতা, খাদ্যনিরাপত্তা ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে পানিনিরাপত্তাকে।
নদী পুনরুদ্ধার, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, খাল খনন এবং বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিয়ে পানি সম্পদ খাতে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সরকার।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য ১০ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বরাদ্দের ঘোষণা দেন।
আরও পড়ুন: বিনিয়োগের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর তাগিদ বিজিএমইএর উপদেষ্টার
এর মাধ্যমে দেশের নদী, সেচব্যবস্থা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোয় বড় ধরনের বিনিয়োগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
প্রতিটি বিভাগে নদী দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেয়ার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার।
পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধার এবং মৃতপ্রায় নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার অংশ হিসেবে প্রতিটি বিভাগে অন্তত একটি নদীকে অবৈধ দখলমুক্ত করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
চলমান সাতটি প্রকল্পের আওতায় ধলেশ্বরী, লৌহজং, আলাইকুড়ি, মোগড়া, সালতা, সুতাং, বাঁকখালী ও বড়নাই - এই আটটি নদী থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে।
আরও পড়ুন: আইইডিসিআরের পরিচালককে মারধরের ঘটনায় চিকিৎসক জাহিদ হাসানের সদস্যপদ স্থগিত
সংশ্লিস্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, এ উদ্যোগ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, স্থানীয় প্রতিবেশব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা ও নিষ্কাশন সমস্যার সমাধানে সহায়ক হবে।
তথ্যনির্ভর শাসনব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার অংশ হিসেবে ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর জন্য ‘ওয়াটার কোয়ালিটি ইনডেক্স’ (ডব্লিউকিউআই) বা পানির গুণগত মান সূচক প্রণয়ন করেছে সরকার।
এর ফলে নদীর স্বাস্থ্য আরও নিয়মতান্ত্রিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিপ লার্নিংভিত্তিক ভূগর্ভস্থ পানির রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ ড্যাশবোর্ড চালু করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: নাহিদের অভিযোগ: আগে আ.লীগ, এখন বিএনপি দিচ্ছে প্রশ্রয়
এ ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সম্পর্কে ধারাবাহিক তথ্য পাওয়া যাবে, যা পানি সংরক্ষণ ও টেকসই উত্তোলন বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে এসব প্রযুক্তিগত উদ্যোগ বাংলাদেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়নের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ‘নদী, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ শীর্ষক একটি জাতীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
এ উদ্যোগটি আগামী পাঁচ বছরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল, নদী ও ড্রেনেজ চ্যানেল খননের বৃহত্তর সরকারি লক্ষ্যে যুক্ত।
আরও পড়ুন: পদ্মা নদীর চরের দখল নিয়ে কাকন ও কালু বাহিনীর মধ্যে চার ঘণ্টা গোলাগুলি
শুধু ২০২৬-২৭ অর্থবছরেই ৬৮০ কিলোমিটার খাল, সেচখাল ও নিষ্কাশন খাল খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া ‘বাংলাদেশের খাল শনাক্তকরণ, শ্রেণিবিন্যাস এবং জিও-ইনফরমেটিক্স ডেটাবেজ উন্নয়ন’ নামে একটি বড় প্রকল্পের আওতায় দেশের সব খালের মানচিত্র তৈরি করা হবে এবং জিআইএসভিত্তিক খাল নেটওয়ার্ক ডাটাবেজ গড়ে তোলা হবে।
এর ফলে দেশের জলপথের একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল তালিকা তৈরি হবে।
আগামী অর্থবছরে ব্যাপক বন্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: সাত মাসে ঢাকা-মাওয়া সড়কে ১১১ দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ১৪
এর আওতায় ৩০৯ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বাঁধ ও বন্যা প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ৪৮৪ কিলোমিটার নৌপথের নাব্যতা বৃদ্ধি এবং ডুবোচর অপসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
অন্যদিকে সরকারের চলমান ‘বন্যা সুরক্ষায় ১৮০ দিনের কর্মসূচি’র আওতায় ইতোমধ্যে ২৯২ কিলোমিটার এলাকায় বাঁধ ও বন্যা প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ ও পুনর্বাসনের কাজ চলছে।
এসব উদ্যোগ মৌসুমি বন্যার ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি পানি প্রবাহ ও নৌপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে সহায়ক হবে বলেও আশা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: নেতানিয়াহুর জোটের আসন ৫৪, বিরোধীদের ৪৭, আরব দলের ১৯
পানি সম্পদ খাতের বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সদ্য অনুমোদিত ‘পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্প।
সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, এটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি, মৎস্য ও পানি ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদিত এ প্রকল্পের কাজ আগামী জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত চলবে।
প্রকল্পের আওতায় রাজবাড়ীর পাংশায় পদ্মা নদীর ওপর ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল ব্যারাজ নির্মাণ, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন এবং শুষ্ক মৌসুমে মিঠাপানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে পদ্মার পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটির মাধ্যমে বছরে ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
সুন্দরবনসহ পুরো পদ্মা অববাহিকায় লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ রোধ করা যাবে।
এছাড়া পাঁচটি শাখা ও উপনদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধার হবে।
২৮ লাখ ৮৮ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা দেওয়া যাবে।
বছরে ধান উৎপাদন ২ কোটি ৩ লাখ ৯০ হাজার টন এবং মাছ উৎপাদন ২৩ লাখ ৪০ হাজার টন বাড়বে।
সরকার আশা করছে, চার বিভাগের ১৯টি জেলার ১২০টি উপজেলার বাসিন্দারা সরাসরি ও পরোক্ষভাবে এ প্রকল্পের সুফল পাবেন।
এতে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ জনগোষ্ঠী উপকৃত হবে।
বাজেট বক্তৃতায় তিস্তা ও পদ্মা নদীর উজানে নির্মিত বাঁধের কারণে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
এতে কৃষি, সেচ, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
এ সমস্যা মোকাবিলায় সরকার ‘তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ বা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ এগিয়ে নিচ্ছে।
উন্নত নদী ব্যবস্থাপনা, পানি সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান ও জীবিকা উন্নত করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জলবায়ু অভিযোজন এবং পরিবেশগত স্থায়িত্বের ভিত্তি হিসেবে পানিনিরাপত্তার ওপর সরকারের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে।
নদী দখলমুক্তকরণ, ভূগর্ভস্থ পানির পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং পদ্মা ব্যারাজের মতো দেশের অন্যতম বৃহৎ পানি অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে পানি, কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন ও পরিবেশগত সহনশীলতা জোরদারের একটি সমন্বিত কৌশল তুলে ধরা হয়েছে এ বাজেটে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন