১০:৪৩ পি.এম
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন বিষয়ক সাময়িকী ওপিনিয়ন জুরিস-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাশলে এস. কিনসেথ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর 'আরাকান আর্মি' (এএ)-র দ্বারা পরিচালিত অমানবিক নির্যাতন ও প্রশাসনিক শোষণের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেছেন।
নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নির্মমতার পর বর্তমানে রাখাইনে জাতিগত রাখাইন সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি নতুন অত্যাচারী শাসক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তারা রোহিঙ্গাদের দাস বানিয়ে শোষণ, জমি দখল, জোরপূর্বক শ্রম এবং এলাকা খালি করার মতো গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত রয়েছে।
আরও পড়ুন: ভারতের একক বৃহত্তম তেল শোধনাগার পরিদর্শনে রুবিও, কিন্তু কেন?
চলাচল ও জীবনযাত্রার ওপর অতিরিক্ত কর এবং বিধিনিষেধের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, উত্তর রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে বা অন্য জায়গায় যাওয়ার জন্য রোহিঙ্গাদের ৩০০ থেকে ৫০০ ডলার পর্যন্ত পারমিট ফি দিতে হচ্ছে। এই অর্থ চোরাকারবারি, স্থানীয় গ্রাম প্রশাসক কিংবা সরাসরি আরাকান আর্মির পকেটে চলে যাচ্ছে।
এলাকা ছাড়ার ক্ষেত্রে শুধু নয়, নিজ ভিটেমাটিতে বসবাসের খরচও বহুগুণ বেড়ে গেছে। পাশের গ্রামে একদিনের জন্য যাওয়ার অনুমতিপত্র পেতে প্রায় ৫,০০০ কিয়াত (প্রায় ২.৪০ ডলার) খরচ হচ্ছে এবং এর জন্য প্রয়োজন দুটি পৃথক স্বাক্ষর। ঘরে বসে থাকলেও রেহাই নেই; রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ঘরবাড়ি, দোকানপাট, নৌকা, মাছ ধরার জাল, গবাদিপশু এবং ধানের জমির ওপর নতুন করে ট্যাক্স বা কর ধার্য করা হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর একে "একচেটিয়াভাবে রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করে আরোপিত অন্যায্য কর ব্যবস্থা ও পদ্ধতিগত চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা" হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
২০১৭ সালে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর 'ক্লিয়ারেন্স অপারেশন'-এর আগে যেমন চলাচলের জন্য সামরিক অনুমতির প্রয়োজন হতো, ২০২৪ সালে রাজ্যটির সিংহভাগ দখল করার পর এখন সেই অনুমতিপত্রের মূল স্বাক্ষরকারীদের একজন হলো 'আরাকান আর্মি'। তারা আগের প্রশাসনিক বিধিনিষেধের সঙ্গে যোগ করেছে জোরপূর্বক শ্রমের কোটা এবং রোহিঙ্গা জমি বাজেয়াপ্তকরণ।
প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সুপরিকল্পিত নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা আরাকান আর্মির এই কর্মকাণ্ডকে সাধারণত 'যুদ্ধাপরাধ' হিসেবে চিহ্নিত করলেও, নিবন্ধে বলা হয় এটি কেবল যুদ্ধাপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমানে রোহিঙ্গাদের দমন করতে বুলেট ও অস্ত্রের পাশাপাশি ব্যবহার করা হচ্ছে করের তালিকা, পারমিট কাউন্টার, বাধ্যতামূলক শ্রমের রোস্টার এবং জমি বন্টনের মতো প্রশাসনিক হাতিয়ার।
আরও পড়ুন: থাইল্যান্ডের ই-ভিসার আবেদন ৩ দিন বন্ধ, জানা গেল কারণ
এই আপাতদৃষ্টে আইনি বা প্রশাসনিক কাঠামোটি মূলত এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে রোহিঙ্গা হওয়ার কারণে তাদের ওপর সবচেয়ে বেশি নিপীড়ন ও বৈষম্য চালানো যায়। আইনি দৃষ্টিতে এটি স্পষ্টতই 'মানবতাবিরোধী অপরাধ', যার বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) পূর্ণ এখতিয়ার রয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন ও নথিপত্রে অপরাধের প্রমাণ
১. হুইয়ার সিসি হত্যাকাণ্ড ও 'নাসাওর পারা' ক্যাম্প: ২০২৪ সালের মে মাসে 'হিউম্যান রাইটস ওয়াচ'-এর তথ্য অনুযায়ী, 'হইয়ার সিসি' গ্রামে আরাকান আর্মির গুলিতে অন্তত ৯০টি শিশুসহ ১৭০ জনের বেশি রোহিঙ্গা নিহত বা নিখোঁজ হন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই হামলায় বেঁচে যাওয়াদের 'নাসাওর পারা' নামক একটি রুদ্ধদ্বার ক্যাম্পে বন্দি করে রাখা হয়। সেখান থেকে অনুমতি ছাড়া কারও বের হওয়া নিষেধ এবং তাদের দিয়ে অবৈতনিক নির্মাণকাজ ও লুট করা গবাদিপশু চড়ানোর কাজ করানো হচ্ছে।
২. জমি দখল ও অ-রোহিঙ্গা পুনর্বাসন: ২০২৬ সালের আগস্টে জাতিসংঘের 'ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার'-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৭ সালের সামরিক অভিযানের মতোই আরাকান আর্মি পুরো রোহিঙ্গা এলাকা খালি করে দিচ্ছে। এরপর মসজিদ ধ্বংস করে এবং প্রায় ২,০০০ একর জমি বাজেয়াপ্ত করে সেখানে অ-রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন করা হচ্ছে। ২০১৭ সালে খালি হওয়া অন্তত ১১টি সাবেক রোহিঙ্গা গ্রামে নতুনদের এনে বসানো হয়েছে এবং রোহিঙ্গা গ্রামগুলোর নাম পরিবর্তনের গুরুতর চেষ্টা চলছে।
আরও পড়ুন: সাত মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল চীনের তিব্বত
৩. শিশু ও বয়স্কদের জোরপূর্বক শ্রম: জাতিসংঘের সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর রাখাইনে গ্রামভিত্তিক বাধ্যতামূলক শ্রমের কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি গ্রামকে প্রতি সপ্তাহে বা মাসে নির্দিষ্ট সংখ্যক শ্রমিক পাঠাতে হয়। কেবল ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসেই ২,৩৫৩টি এমন ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেছে, যার মধ্যে অন্তত ৭৫টি ক্ষেত্রে শিশুদের ব্যবহার করা হয়েছে। ৬ বছরের মতো ছোট শিশুদের দিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার, ভবন নির্মাণ এবং রাখাইন পরিবারগুলোর গৃহস্থালি কাজ করানো হচ্ছে।
কেন এটি 'যুদ্ধাপরাধ' নয়, বরং 'মানবতাবিরোধী অপরাধ'?
নিবন্ধকার উল্লেখ করেন, বিশ্বজুড়ে অনেক মানবাধিকার সংস্থা আরাকান আর্মির এই আচরণকে 'যুদ্ধাপরাধ' হিসেবে ব্যাখ্যা করছে, কিন্তু এতে তাদের মূল অপরাধ আড়াল হয়ে যায়। রোম সংবিধির ৮ নম্বর অনুচ্ছেদে যুদ্ধাপরাধের মধ্যে 'দাসত্ব' বা 'জোরপূর্বক শ্রম'-এর সুনির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। কিন্তু অনুচ্ছেদ ৭(১)(সি) অনুযায়ী, যখন কোনো মানুষের ওপর মালিকানাসূলভ অধিকার প্রয়োগ করে জোরপূর্বক শ্রম দিতে বাধ্য করা হয়, তখন তা 'মানবতাবিরোধী অপরাধ'-এর অন্তর্ভুক্ত 'দাসত্ব' হিসেবে গণ্য হয়।
তাছাড়া, ভবিষ্যতে মিয়ানমার সেনা ও আরাকান আর্মির মধ্যে কোনো শান্তিচুক্তি বা যুদ্ধবিরতি হলে 'যুদ্ধাপরাধ'-এর ধারায় তাদের বিচার করা আইনিভাবে জটিল হয়ে পড়তে পারে (যেমনটি আইসিসির সাইদ মামলায় দেখা গেছে)। কিন্তু 'মানবতাবিরোধী অপরাধ'-এর ক্ষেত্রে কোনো যুদ্ধ চালু থাকার শর্ত নেই; বরং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর কোনো সংস্থাগত নীতির অধীনে পরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট আক্রমণ চালানো হয়েছে কি না—তা প্রমাণ করাই যথেষ্ট।
আরও পড়ুন: সৌদি কারাগারে ২৪৬১ বাংলাদেশি, ২২ জনের সাজা নিয়ে অস্পষ্টতা
আরাকান আর্মি নিজেই দিচ্ছে নিজেদের অপরাধের প্রমাণ
কোনো অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে "সংগঠনিক নীতি" প্রমাণ করা কঠিন হলেও, আরাকান আর্মির নিজস্ব প্রশাসনিক দাবিগুলোই তাদের অপরাধের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
আরাকান আর্মি নিজেদের একটি সরকার বা 'আরাকান পিপলস রেভোলিউশনারি গভর্নমেন্ট' হিসেবে দাবি করে, যারা ৮টি জেলা, ১০টিরও বেশি বিভাগ এবং ৩ স্তরের বিচার ব্যবস্থা পরিচালনা করছে। অর্থাৎ, তাদের এমন একটি সুসংগঠিত প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে যা দিয়ে তারা রোহিঙ্গাদের ওপর কোটা, পারমিট, জোরপূর্বক শ্রম ও জমি দখলের মতো পরিকল্পিত আক্রমণ পরিচালনা করতে সক্ষম বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাশলে এস. কিনসেথ।
আরও পড়ুন: ইয়েমেনে তীব্র সংঘাত: তিন মাসে অন্তত ৮,৫০০ হতাহত
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন