০৭:০১ পি.এম
প্রকাশ: ০৫ আগস্ট, ২০২৬ ১৮:৪৭
কাগজে যা লেখা থাকে, আইন সবসময় তা বলে না। আইনের পরিভাষার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অন্যকিছু।
গত ১ জুলাই থেকে চীনে কার্যকর হওয়া একটি নতুন আইন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বেইজিং ‘জাতিগত ঐক্য ও অগ্রগতি বৃদ্ধি সংক্রান্ত আইন’টিকে জাতীয় সংহতি এবং আধুনিকায়নের একটি রূপরেখা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তবে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এবং চীনের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ এটিকে ‘আগ্রাসন’ হিসেবে বিবেচনা করছে। প্রশ্ন উঠেছে, সংখ্যালঘুদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বিসর্জন দিয়ে মূলধারায় একীভূত হতে বলা কী ঐক্যের বার্তা দেয়? দিনের পর দিন অনেক তিব্বতি, উইঘুর, মঙ্গোলীয় এবং অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘুদের কাছে এর উত্তরটি বেদনাদায়কভাবে স্পষ্ট।
আরও পড়ুন: ঢামেকে অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘটে মরদেহ পরিবহনে বিপাকে স্বজনরা, রোগীরাও ভোগান্তিতে
সংখ্যালঘুদের প্রতি চীনের মনোভাব নিয়ে বিতর্ক আর অস্বস্তি দীর্ঘদিনের। ঐক্যের জন্য প্রণয়ন করা আইনটি সেই বিতর্ককে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। চীন সরকার যেখানে নতুন আইনটিকে সম্প্রীতি বাড়ানো, বিচ্ছিন্নতাবাদ মোকাবেলা এবং উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করছে; সেখানে মানবাধিকার সংস্থা, আইন বিশেষজ্ঞ এবং তিব্বতি অধিকার রক্ষা গোষ্ঠীগুলোর যুক্তি হলো, এটি এমন একটি একীভূতকরণ এজেন্ডাকে আইনি রূপ দিচ্ছে, যা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের অধীনে ক্রমাগত সম্প্রসারিত হয়েছে।
গত ১ জুলাই আইনটি প্রণয়নের পর থেকে এশিয়া, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহরে তিব্বতি সম্প্রদায় এবং তাদের সমর্থকেরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছেন।
টোকিওতে বিক্ষোভকারীরা তিব্বতের পতাকা হাতে চীনা দূতাবাসের সামনে জড়ো হন এবং সতর্ক করেন যে, এই নতুন আইন তাদের ভাষা, ধর্ম ও পরিচয়কে হুমকির মুখে ফেলছে। মুম্বাইতে চীনা কনস্যুলেটের বাইরে বিক্ষোভ প্রদর্শনের পর ‘তিব্বতি যুব কংগ্রেস’-এর বেশ কয়েকজন সদস্য ও সমর্থককে আটক করা হয়। বিক্ষুব্ধরা বলছেন, এইসব কর্মসূচি তাদের বিশ্বব্যাপী প্রচারনার অংশ; যার মধ্যে রয়েছে গণসমাবেশ, মোমবাতি প্রজ্বালন, অনশন এবং তিব্বতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রতি আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা। বিক্ষুব্ধরা বলছেন, বেইজিং যাকে সংহতি বা ঐক্য বলছে, তারা সেটিকে অস্তিত্ব মুছে ফেলার আগ্রাসন হিসেবে দেখছে।
চীন অবশ্য এসব অভিযোগকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
আরও পড়ুন: ইসরাইলের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ৭৭.৭ শতাংশ, ১৯৯৯ সালের পর সর্বোচ্চ
কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, এই আইনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত দেশের ৫৬টি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে জাতীয় সংহতি সুদৃঢ় করতে, সংখ্যালঘু অঞ্চলের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্যই করা হয়েছে। বেইজিং ধারাবাহিকভাবে যুক্তি দিয়ে আসছে যে, ম্যান্ডারিন ভাষার প্রসার ঘটানো, নাগরিক পরিচয় শক্তিশালী করা এবং জাতিগত অঞ্চলগুলোকে জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করা যেকোনো সার্বভৌম সরকারের বৈধ দায়িত্ব। জোরপূর্বক আত্মীকরণের অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছে বেইজিং। তারা বরং শিক্ষা, অবকাঠামো ও দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিকে উপেক্ষা করার অভিযোগ তুলেছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো যুক্তি দিচ্ছে যে, এই আইনটি শিক্ষা ও ভাষানীতি থেকে শুরু করে ধর্ম, গণমাধ্যম এবং জনপ্রশাসন পর্যন্ত সংখ্যালঘু জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রকে রাষ্ট্রীয় প্রভাবের আওতায় নিয়ে আসবে। সমালোচকরা বলছেন, এই আইনটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর নিজস্ব ভাষা, রীতিনীতি এবং ধর্মীয় ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার জন্য ইতিমধ্যে সংকুচিত হয়ে আসা সুযোগকে আরো সীমিত করে দিচ্ছে।
আইনটির ভাষার অস্পষ্টতা ও ব্যাপকতা নিয়েও সমালোচনা ও উদ্বেগ বাড়ছে। ‘জাতিগত ঐক্য বিনষ্ট করা’র মতো শব্দ বা শর্তগুলোর ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা করার সুযোগ রয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয় - এমন আচরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে ব্যাপক ও একচেটিয়া ক্ষমতা দিয়েছে। মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, সরকারি নীতিমালার যে কোনো শান্তিপূর্ণ সমালোচনাকেও এখন থেকে ক্রমবর্ধমানভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদ বা জাতীয় স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।
গত এক দশকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, গবেষক এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো তিব্বতের মঠগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ, ম্যান্ডারিন ভাষার শিক্ষার বিস্তার, তিব্বতি সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাষ্ট্রীয় নজরদারি বাড়ানোর মতো বিষয়গুলো নথিভুক্ত করেছে। বেইজিংয়ের দাবি, এই পদক্ষেপগুলো উন্নয়ন, শিক্ষার সুযোগ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বাড়াবে। তবে তিব্বতি সংস্থাগুলো এগুলোকে ‘চীনায়ন’-এর একটি বৃহত্তর নীতির ধারাবাহিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখে, যা ধীরে ধীরে তিব্বতি পরিচয়ের ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছে।
আরও পড়ুন: তারেক রহমান: জামায়াত-এনসিপি আমার রাষ্ট্রীয় সম্মান সহ্য করতে পারছে না
আইনটি কার্যকর হওয়ার পরপরই নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বাইরে তিব্বতি শরণার্থী লোবগা রাংজেন নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন। তার এই মৃত্যু বিশ্বজুড়ে তিব্বতি সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তবে যারা তার জন্য শোক প্রকাশ করছেন, তাদের বার্তার বিষয়ে যথেষ্ট সতর্ক থেকেছেন। তিব্বতি সম্প্রদায়ের নেতারা বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, তারা কোনো সহিংসতার মাধ্যমে নয়; বরং শান্তিপূর্ণ সমর্থন, সংলাপ এবং আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমেই ন্যায়বিচার চান। আত্মাহুতির মতো ঘটনাকে কখনোই মহিমান্বিত করা উচিত নয়।
নতুন এই আইনটি নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগ শুধু তিব্বতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি শিনজিয়াং, ইনার মঙ্গোলিয়া এবং হুই মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলসহ চীনের সমস্ত সংখ্যালঘু জাতিগত অঞ্চলের ওপর প্রযোজ্য। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো যুক্তি দেয় যে, এই আইনটি এমন কিছু নীতিকে আরো শক্তিশালী করতে পারে, যা ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক মহলে ক্রমাগত সমালোচিত হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ম্যান্ডারিন ভাষার শিক্ষার বিস্তার, কঠোর আদর্শিক শিক্ষা এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো।
কেউ এই সমালোচনাগুলোকে গ্রহণ করুক বা বেইজিংয়ের আত্মপক্ষ সমর্থনকেই মেনে নিক না কেন, একটি সত্যকে উপেক্ষা করা কঠিন : এই আইনটি মূলত প্রশাসনিক নীতি হিসেবে থাকা বিষয়গুলোকে জাতীয় আইন বা বিধানে বদলে দিয়েছে। চীনের নেতৃত্ব আগামী বছরগুলোতে কীভাবে জাতিগত বিষয়াবলিকে পরিচালনা করতে চায়, আইনটি স্পষ্টভাবে সেই দিকনির্দেশনা দেয়।
যেহেতু চীনের ভেতরে বিক্ষোভ বা বিতর্ক কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। তাই নতুন আইনটি নিয়ে ওঠা বিতর্ক মীমাংসায় আন্তর্জাতিক মহলের সম্পৃক্ত হওয়া খুবই জরুরি বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মীরা। তবে মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ আর অর্থনৈতিক স্বার্থ প্রায়শই প্রতিযোগী হয়ে ওঠে। অনেক দেশ তিব্বত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো জোরদার করেছে। এতে মনে হতে পারে, অর্থনৈতিক সুযোগের সামনে মৌলিক স্বাধীনতা রক্ষার বিষয়টি আপসযোগ্য। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গঠনমূলক সম্পৃক্ততার জন্য চীনের প্রতি শত্রুতার প্রয়োজন নেই বা রাষ্ট্রীয় নীতির সমালোচনাকে চীনা জনগণের প্রতি শত্রুতা হিসেবেও ভুল করা উচিত নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত স্বচ্ছতাকে উৎসাহিত করা।
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম
ভাষা, বিশ্বাস এবং ভাগ করে নেওয়া স্মৃতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা পরিচয়গুলো সরকার তাদের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন করলেই বিলুপ্ত হয়ে যায় না। সেগুলো পরিবার, মঠ, শ্রেণীকক্ষ, গান এবং নির্বাসিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকে থাকে। এগুলো টিকে থাকে কারণ সংস্কৃতি মানুষের দ্বারা পরিচালিত হয়, কোনো সরকারি ডিক্রি বা আদেশ দ্বারা নয়।
বেইজিং বিশ্বাস করে যে নতুন আইনটি জাতীয় সংহতিকে শক্তিশালী করবে। অন্যদিকে এর সমালোচকরা মনে করেন, এটি সাংস্কৃতিক আত্মীকরণ বা বিলুপ্তিকরণকে ত্বরান্বিত করার ঝুঁকি তৈরি করবে। এই আইনের আসল মূল্যায়ন কোনো সরকারি স্লোগান বা আইনি পাঠ্যের মধ্যে পাওয়া যাবে না; বরং এটি দেখা যাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের তিব্বতি এবং অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘুরা তাদের ভাষায় স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছে কিনা, কোনো ভয় ছাড়াই তাদের ধর্ম পালন করতে পারছে কিনা এবং মর্যাদার সঙ্গে তাদের ঐতিহ্যকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারছে কিনা তার ওপর।
এটি এমন একটি প্রশ্ন যা চীনের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বৈচিত্র্যকে দমন করে জোরপূর্বক একতা চাপিয়ে দেওয়ার চেয়ে, বৈচিত্র্যকে রক্ষা করার মাধ্যমে একতাকে শক্তিশালী করার সর্বজনীন নীতি রক্ষায় এখনও প্রস্তুত কিনা, এটি তারই একটি পরীক্ষা।
আরও পড়ুন: শেরপুরে বাসের চাপায় সিএনজি যাত্রী নিহত, আহত ৪
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন