০৭:৩৩ এম
মাছ ধরতে প্রতিদিন সমুদ্রসৈকতে প্রবাহিত হন শত শত জেলে; এবং সেখানে হাজারো পর্যটকও নেমে আসেন। আকাশে নিয়মিত উড়ান দেয় বিমান। কিন্তু কক্সবাজারের ডপলার আবহাওয়া রাডার, যা প্রাণ এবং সম্পদ রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, গত তিন বছর ধরে অচল হয়ে আছে। ফলে বঙ্গোপসাগরের প্রায় ৪০০ কিলোমিটার এলাকায় ঘূর্ণিঝড়, বজ্রঝড়, ভারি বৃষ্টি এবং দমকা হাওয়ার গতিপ্রকৃতি আগে থেকে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে দুর্যোগের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থায় ব্যাপক ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এতে জেলে, ট্রলার মালিক, পর্যটক ও উপকূলের মানুষের উদ্বেগও বৃদ্ধি পেয়েছে।
কক্সবাজার একটি অত্যন্ত দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় জেলা। প্রতিদিন গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান শত শত জেলে; সৈকতে ভিড় করেন হাজার হাজার পর্যটক এবং বিমানবন্দর দিয়ে নিয়মিত উড্ডয়ন ও অবতরণ করে বিমান। অথচ পুরো উপকূলের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা কক্সবাজার ডপলার রাডার তিন বছরের বেশি সময় ধরে অচল।
এই রাডারটি ঘূর্ণিঝড়, বজ্রঝড়, ভারি বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ার গতিপ্রকৃতি দ্রুত শনাক্ত করে ঢাকায় তথ্য পাঠাত। কিন্তু যন্ত্রাংশের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে এটি কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এর ফলে উপকূলীয় এলাকার আবহাওয়া পর্যবেক্ষণে একটি বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন: ত্যাগীদের মধ্য থেকে একজনকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি মোঃ ফারুক আলীর
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, রাডারের ভূমিকাটি উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ ও গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া কালবৈশাখী ঝড়ের পূর্বাভাস ও মেঘের সৃষ্টি এবং গতিবিধি পর্যবেক্ষণে এটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে। কক্সবাজারের বিমানবন্দর থাকায় রাডার তথ্য বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণেও বিশেষভাবে সহায়ক। অল্প সময়ে তৈরি হওয়া মেঘের অবস্থান, প্রকৃতি এবং গতিপথ নির্ধারণে এর গুরুত্ব অসীম। রাডার থেকে প্রাপ্ত তথ্য ঢাকায় পাঠান হয়, যেখানে বিশেষজ্ঞগণ সেগুলি বিশ্লেষণ করে আবহাওয়ার পূর্বাভাস তৈরি করেন। কিন্তু রাডার অচল থাকায় এখন সরাসরি এই তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিমানবন্দরের জন্য আবহাওয়ার তথ্য সরবরাহ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, প্রতি ঘণ্টায় এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারের মাধ্যমে পাইলটদের বিভিন্ন তথ্য যেমন তাপমাত্রা, শিশিরাঙ্ক (ডিউ পয়েন্ট), আর্দ্রতা, কিউএনএইচ (বায়ুচাপ), দৃশ্যমানতা, বাতাসের গতি ও দিকসহ প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করা হয়। বিশেষ করে জরুরি পরিস্থিতিতে, যেমন বজ্রঝড় বা ঘন মেঘের সময়, প্রত্যেকে প্রতি আধা ঘণ্টা পর পর তথ্য হালনাগাদ করার নির্দেশনা দেয়া হয়।
আবহাওয়া অধিদফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, স্যাটেলাইটসহ অন্যান্য প্রযুক্তি দিয়ে পূর্বাভাস পাওয়া গেলেও কক্সবাজারের স্থানীয় পর্যায়ে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা অনেকটাই কমে গেছে। গভীর সমুদ্রে মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকার কারণে, জেলেদের একমাত্র ভরসা হচ্ছে রেডিও। তাই হঠাৎ দুর্যোগের প্রতিরোধের জন্য ডপলার রাডার ছিল সবচেয়ে কার্যকর প্রযুক্তি। এটা শুধু জেলেদের জন্য নয়, বরং সমুদ্রসৈকতে থাকা পর্যটক এবং বিমান চলাচলের নিরাপত্তার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এফবি মায়ের দোয়া ট্রলারের জেলে বাদশা মিয়া বলেন, যখন তারা সমুদ্রে কিছু দূরে চলে যান, তখন অনেক সময় মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। তখন আবহাওয়া খারাপ হলে অভিভাবকরা জেলেদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে না। এতে তাদের পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন: সুনামগঞ্জে টাঙ্গুয়ার হাওরে বৃক্ষরোপণ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান অনুষ্ঠিত
এফবি গালিব ট্রলারের মাঝি শামশুল আলম বলেন, কক্সবাজার উপকূল থেকে ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে গেলেই মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। অথচ তারা অনেক সময় ২০০ থেকে ২২৪ কিলোমিটার দূরে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান। ফলে ঝড় বা ঘূর্ণিঝড়ের আগাম তথ্য জানার সুযোগ থাকে না। নির্ভরযোগ্য আবহাওয়ার তথ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে অনেক দুর্ঘটনা, প্রাণহানি এবং ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ব্যবসায়ী ঐক্য সমবায় সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, রাডার স্টেশন অকার্যকর থাকার কারণে সময়মতো সমুদ্রের আবহাওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এতে হাজারো জেলে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মাছ ধরা একটি ট্রলারে কোটি টাকার বিনিয়োগ থাকে। দুর্ঘটনা ঘটলে প্রাণহানির পাশাপাশি বিশাল আর্থিক ক্ষতি হয়। তাই দ্রুত রাডার সচল করা প্রয়োজন।
সি সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার প্রকল্প কর্মকর্তা মো. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রাডার অকার্যকর থাকার কারণে প্রয়োজনীয় সময়ে নির্ভুল আবহাওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। কক্সবাজার ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকা হওয়ায় আগাম তথ্য পাওয়ার মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য আরও কার্যকর প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব হবে এবং জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কমানো যাবে।
২০২৩ সালে কক্সবাজারের রাডার সচল করতে জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকার কাছে কারিগরি সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সাড়া না পাওয়ায় সরকার নিজস্ব অর্থায়নে রাডার আধুনিকীকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৪ সালে জাপানি বিশেষজ্ঞ দল পরিদর্শন করে ভবনটি ব্যবহারযোগ্য বলে মত দিয়েছে তবে নতুন যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু এখনো কাজ শুরু করা হয়নি।
আরও পড়ুন: ফেনীতে যুবদলের ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পে চিকিৎসা নিলেন ১০০-এরও বেশি নারী-পুরুষ
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, কক্সবাজারের রাডারটি ২০০৭ সাল থেকে ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। পরবর্তী সময়ে যন্ত্রাংশের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয় এবং এটি বন্ধ হয়ে যায়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা কয়েক দফা চেষ্টা করেও এটিকে সচল করতে সক্ষম হননি। কক্সবাজার ছাড়া পটুয়াখালীর খেপুপাড়া ও মৌলভীবাজারের রাডারও একইভাবে আধুনিকীকরণের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে। এ জন্য একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে এবং সম্ভাব্যতা যাচাইও সম্পন্ন হয়েছে। জাপানের প্রতিনিধি দল জানিয়েছে, বর্তমান ভবন ও অবকাঠামো ব্যবহারযোগ্য, তবে পুরানো যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন করতে হবে। প্রকল্পটি এখনো মন্ত্রণালয়ে রয়েছে এবং প্রতি মাসেই এ বিষয়ে ঢাকার দফতর থেকে চিঠি আসে কিন্তু প্রকল্প অনুমোদনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও নেয়া হয়নি।
কক্সবাজারকে ‘মাল্টি হ্যাজার্ড’ জেলা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, এখানে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, আকস্মিক বন্যা, জলাবদ্ধতা, ভূমিধস ও ভারি বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বেশি। ২০২৪ সালে এক দিনেই ৫৫০ মিলিমিটার এবং সাত দিনে ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের রেকর্ড হয়েছে। এ ধরনের দুর্যোগ পর্যবেক্ষণ এবং আগাম সতর্কতায় আধুনিক আবহাওয়া রাডারের বিকল্প নেই। দ্রুত নতুন রাডার স্থাপন করা গেলে জনগণকে আরও কার্যকর আবহাওয়া সেবা প্রদান করা সম্ভব হবে।
আবহাওয়া অফিসের কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি উল্লেখ করেন, কক্সবাজার অফিস মূলত একটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। সেখানে সরাসরি পূর্বাভাস তৈরি করা হয় না। বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, বায়ুচাপ, বাতাসের গতি ও দিকসহ নানা তথ্য সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়। বেলুনের মাধ্যমে ঊর্ধ্বাকাশের তথ্যও পাঠানো হয়। পরে কেন্দ্রীয়ভাবে পূর্বাভাস তৈরি করে তা গণমাধ্যম, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হয়। রাডার অচল থাকায় বর্তমানে পর্যবেক্ষণ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ ও ঢাকায় পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. আ. মান্নান জানান, বিষয়টি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় অবগত রয়েছে এবং এর আগে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: রাজশাহী নগরীতে চোরাই ল্যাপটপ ও একডজন মোবাইল ফোন সহ গ্রেফতার ২
কক্সবাজার শহরের সার্কিট হাউস-সংলগ্ন পাহাড়ের চূড়ায়, সমতল থেকে ১৬০ ফুট উপরে অবস্থিত এই রাডার স্টেশনটি ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ২০০৭ সালে জাপানের সহায়তায় এটিকে আধুনিক ডপলার আবহাওয়া রাডারে উন্নীত করা হয়।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন