০৯:৩৬ পি.এম
থাইল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে ২০১৫ সালের ১৭ আগস্টে। ওই দিন ব্যাঙ্ককের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত জনপ্রিয় এরাওয়ান মন্দিরে ভয়াবহ বোমা হামলায় বিদেশি পর্যটকসহ অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে, প্রায় এক দশক পরে, দুই ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন দেশটির আদালত। যদিও এই রায় এবং তদন্ত নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
দণ্ডপ্রাপ্ত দুজনই চীনের মুসলিম উইঘুর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম বিবিসি। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, তারা ২০১৫ সালের ১৭ আগস্ট ব্যাঙ্ককের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত জনপ্রিয় এরাওয়ান মন্দিরের কাছে ভয়াবহ বোমা হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
আরও পড়ুন: অ্যাম্বুলেন্স সেবায় সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ, রোগী ও স্বজনরা জিম্মি
ওই হামলায় ২০ জন নিহত এবং ১২০ জনের বেশি মানুষ আহত হন। নিহতদের মধ্যে বিদেশি পর্যটকও ছিল।
দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে চলা বিচারপ্রক্রিয়া এবং তদন্তের বিভিন্ন অসঙ্গতির কারণে মামলাটি নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়ে গেছে। অভিযুক্ত দুই ব্যক্তি পুরো বিচারকালেই নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন।
২০১৫ সালের ওই হামলায় একটি শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণে রাজধানী ব্যাঙ্ককের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। বিস্ফোরণে মন্দিরে প্রার্থনায় অংশ নেওয়া মানুষজন ছাড়াও আশপাশের সড়কে অবস্থানরত মোটরসাইকেল আরোহীরা হতাহত হন। ঘটনাস্থলে দ্রুত উদ্ধারকর্মীরা পৌঁছে আহতদের চিকিৎসা এবং নিহতদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেন।
হামলার পরপরই থাই কর্তৃপক্ষের তদন্ত নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। পর্যটন খাতের ক্ষতি কমাতে সরকার দ্রুত ঘটনাস্থল পরিষ্কার করার নির্দেশ দেয় এবং মাত্র দুই দিনের মধ্যেই মন্দিরটি পুনরায় খুলে দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: ভারতের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে এআইনির্ভর সাইবার হামলার ঝুঁকি
এতে গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন সমালোচকেরা।
তদন্তে দেখা যায়, আশপাশের অনেক নিরাপত্তা ক্যামেরা অকার্যকর ছিল। তবে কিছু ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, দীর্ঘ চুল ও মোটা চশমা পরা এক ব্যক্তিকে একটি বেঞ্চের নিচে ব্যাকপ্যাক রেখে দ্রুত সরে যেতে এবং পরে অন্য একটি ভিডিওতে অন্য এক ব্যক্তিকে একটি দ্বিতীয় বোমা খালে ফেলে দিতে। যে বোমাটি পরে বিস্ফোরিত হলেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
হামলার দুই সপ্তাহের মধ্যেই পুলিশ দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে। বিলাল মোহাম্মদ নামে একজনকে ব্যাঙ্ককের পার্শ্ববর্তী এলাকার একটি বাড়ি থেকে আটক করা হয়। সেখানে বোমা তৈরির উপযোগী রাসায়নিক পদার্থ উদ্ধার করা হয়েছিল। তার কাছ থেকে আদেম কারাদাগ নামের একটি জাল তুর্কি পাসপোর্ট পাওয়া যায়।
অন্য অভিযুক্ত ইউসুফু মিয়েরালিকে কম্বোডিয়া থেকে আটক করে থাইল্যান্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
আরও পড়ুন: ভারতে যাওয়ার সময় বেনাপোলে যুবলীগ নেতা হিমাংশু পাল গ্রেফতার
তদন্তের শুরুতে থাই পুলিশ বলেছিল, আটক দুই ব্যক্তি বোমা স্থাপনকারী ব্যক্তি নন। কিন্তু পরে বিলাল মোহাম্মদের বিরুদ্ধে সরাসরি হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়, যদিও নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা ব্যক্তির সঙ্গে তার চেহারার উল্লেখযোগ্য মিল ছিল না বলে দাবি করে বিভিন্ন পর্যবেক্ষক।
হামলার ঘটনায় আরও ১৩ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল, যাদের কয়েকজন এরই মধ্যে দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
মানবাধিকার সংগঠন ও আইনি বিশ্লেষকদের মতে, মামলার রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ হলেও তদন্তের বিভিন্ন অসঙ্গতি এবং অন্যান্য সন্দেহভাজনদের অনুপস্থিতির কারণে হামলার প্রকৃত নেপথ্য কাহিনি নিয়ে বিতর্ক পুরোপুরি শেষ হয়নি।
প্রত্যাশিতভাবেই অনেকেই এই বোমা হামলার সঙ্গে এর আগের মাসে থাইল্যান্ডের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের যোগসূত্র খুঁজতে শুরু করেন। ওই সিদ্ধান্তে ১০৯ জন উইঘুর পুরুষকে জোরপূর্বক চীনে ফেরত পাঠানো হয়েছিল, যা তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে উইঘুর সমর্থকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও বিক্ষোভের জন্ম দেয়।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর
হামলার লক্ষ্যবস্তু ওই মন্দিরটি চীনা পর্যটকদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয় ছিল। ফলে ঘটনাটি প্রতিশোধমূলক হামলা বলেই মনে হচ্ছিল অনেকের কাছে।
তবে থাইল্যান্ডের সামরিক সরকার এই সম্ভাবনা মানতে অস্বীকৃতি জানায়। একপর্যায়ে তারা দাবি করে, গত বছর ক্ষমতা দখল করা সামরিক জান্তার অসন্তুষ্ট বিরোধীদের কাজের কারণেও এটি হতে পারে। পরে তারা জোর দিয়ে বলে, সরকারের মানবপাচারবিরোধী অভিযানে ক্ষুব্ধ মানবপাচারকারীরাই এ হামলার পেছনে রয়েছে।
এক অদ্ভুত মোড় নিতে অপরাধীদের ধরিয়ে দিতে তথ্যদাতার জন্য ৮০ হাজার ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে থাই পুলিশ। এ ঘটনার পরপরই দুই জনকে আটক করার পরও অনেক সন্দেহভাজন পলাতক রয়েছে বলে স্বীকার করে তারা। কিন্তু এরপরও ওই পুরস্কার নিজেদের নিজেরাই দিয়ে দেয় এবং ঘোষণা করে, মামলার তদন্ত শেষ।
দুই সন্দেহভাজনকেই সামরিক হেফাজতে রাখা হয়েছিল। তাদের অভিযোগ, স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। পরে সামরিক আদালতে বিচার শুরু হলে তারা সেই স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করে নেন।
আরও পড়ুন: গাজীপুরে শ্রমিকদের মারধরে মৃত্যু, তৌফিকের স্ত্রী ও ১২ মাসের সন্তান বিপাকে
তাদের মধ্যে বিলাল মোহাম্মদ চিৎকার করে অভিযোগ করেন যে, তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হচ্ছে। আদালতে তিনি সাক্ষ্য দেন, গ্রেপ্তারের সময় যে বাড়িতে তিনি ছিলেন সেখানে তিনি একজন মানবপাচারকারীর অপেক্ষায় ছিলেন, যিনি তাকে মালয়েশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। সেখান থেকে তিনি তুরস্কে যেতে চেয়েছিলেন। এটি উইঘুর আশ্রয়প্রার্থীদের ব্যবহৃত একটি সুপরিচিত রুট।
এরপর শুরু হয় দীর্ঘ বিলম্ব। সাধারণত থাই কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, তারা উইঘুর ভাষাভাষী কোনো দোভাষী খুঁজে পাচ্ছে না। অভিযুক্তরা চীনা দূতাবাসের প্রস্তাবিত দোভাষীদের গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। এভাবে বিলম্ব চলতেই থাকে—এক দশকেরও বেশি সময় ধরে।
আন্তর্জাতিক আইনবিদ কমিশনসহ (আইসিজে) কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন বিচারপ্রক্রিয়া এবং মামলার অস্বাভাবিক দীর্ঘসূত্রতার সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, বিচারপ্রক্রিয়ায় এত বেশি সমস্যা ছিল যে দুই সন্দেহভাজনকে মুক্তি দেওয়া উচিত ছিল।
এক বিবৃতিতে আইসিজে বলেছে, বিলাল মোহাম্মদ ও ইউসুফু মিয়েরাইলির তদন্ত, বিচারিক কার্যক্রম এবং বিচার মানবাধিকার লঙ্ঘন পরিপূর্ণ ছিল। এতে থাইল্যান্ডের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার কিছু কাঠামোগত দুর্বলতাও উন্মোচিত করেছে।
আরও পড়ুন: হরমুজে মাইন বিস্ফোরণে ২ ট্যাংকার ও ১ টাগবোটে আগুন লাগল
তবে বিচারকরা রায় দেন যে, তাদের দোষী সাব্যস্ত করার জন্য পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে। বিশেষ করে পুলিশের উপস্থাপিত ফোনকলের রেকর্ডে দেখা যায়, বোমা হামলার সময় দুই ব্যক্তি ঘটনাস্থলের কাছাকাছি অবস্থান করছিলেন এবং একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন।
দুই আসামির আইনজীবী জানিয়েছেন, তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন