০৯:৩০ এম
বাঙালি মুসলিম নব জাগরণের কবি ফররুখ আহমদের ৪৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তিনি মুসলিম রেনেসাঁর কবি হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর ঢাকার ইস্কাটন গার্ডেনে বিপ্লবদীপ্ত এই কবি মৃত্যুবরণ করেন। কবি ফররুখ আহমদ ১৯১৮ সালের ১০ জুন মাগুরা জেলার মাঝআইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
তৎকালীন বাংলার অধঃপতিত মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণের অনুপ্রেরণা তার কবিতায় পাওয়া যায়। দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের হাহাকার, আর্তনাদ, অনাহার ক্লিষ্টের করুণ পরিণতি, সমকালের সংকট, জরাগ্রস্ত বাস্তবতা এবং সাম্প্রদায়িকতার হিংস্রতা দেখে তিনি দগ্ধ হয়ে ওঠেন। এ সকল অসঙ্গতি তাকে সাহিত্য সাধনায় অনুপ্রেরণা জোগায়।
তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে পরিচিত। বিংশ শতাব্দীর এই কবি ইসলামী ভাবধারার বাহক হলেও, তার কবিতা প্রকরণকৌশল, শব্দচয়ন ও বাকপ্রতিমা অনন্য বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। আধুনিকতার নানা সৌকর্য তার কবিতায় পরিব্যাপ্ত হয়েছে।
আরও পড়ুন: তারেক রহমান: জামায়াত-এনসিপি আমার রাষ্ট্রীয় সম্মান সহ্য করতে পারছে না
‘রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি?/ এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে? /সেতারা হেলাল এখনো ওঠেনি জেগে? / তুমি মাস্তুলে আমি দাঁড় টানি ভুলে; / অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরি...’ এই ধরনের অসংখ্য জনপ্রিয় এবং কালজয়ী কবিতার জনক কবি ফররুখ আহমদ।
ফররুখ আহমদের পিতার নাম সৈয়দ হাতেম আলী এবং মাতা বেগম রওশন আখতার। গ্রামের পাঠশালাতেই তার শিক্ষা জীবনের হাতেখড়ি হয়। পরবর্তীতে তিনি কোলকাতায় গিয়ে তালতলা মডেল এম.ই স্কুলে ভর্তি হন। পরে কোলকাতার বিখ্যাত বালিগঞ্জ সরকারি হাই স্কুলে ভর্তি হন। ঐ সময় কবি গোলাম মোস্তফা ছিলেন এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। প্রাথমিক জীবনে কবিত্ব বিকাশে কবি গোলাম মোস্তফা ব্যাপক উৎসাহ প্রদান করেন।
১৯৩৭ সালে খুলনা জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৩৯ সালে কোলকাতার রিপন কলেজ থেকে আই.এ পাস করেন। ১৯৪১ সালে কোলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ ও সিটি কলেজে, প্রথমে দর্শন এবং পরে ইংরেজীতে অনার্সে ভর্তি হন। কিন্তু কলকাতা সিটি কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স নিয়ে বিএতে ভর্তি হলেও, নানাবিধ কারণে পড়াশুনা শেষ করতে পারেননি।
১৯৪৩ সালে আই.জি প্রিজন অফিসে চাকুরীর মাধ্যমে তার কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯৪৪ সালে সিভিল সাপ্লাইয়ে এবং ১৯৪৬ সালে জলপাইগুড়িতে একটি ফার্মে চাকুরী করেন। ১৯৪৫ সালে তিনি মাসিক ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম
১৯৪৮ সালে কোলকাতা থেকে ঢাকায় এসে ঢাকা বেতারে যোগ দেন। ঢাকা বেতারে নিয়মিত স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। ঢাকা বেতারে তিনি ‘ছোটদের খেলাঘর’ অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন। কবি ফররুখ আহমদ প্রথম যৌবনে ভারতবর্ষের বিখ্যাত কমরেড এম.এন রায়ের শিষ্য ছিলেন। তবে জন্মসূত্রে ইসলামী আদর্শ ও ঐতিহ্যের অধিকারী কবি একসময় ধর্মীয় চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন। তার কবিতায় ইসলামী সমাজতন্ত্র মূর্ত হয়ে ওঠে।
কবি ফররুখ আহমদ সৃষ্ট সাহিত্যসম্ভার ভাষা তথা বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। দর্শনগতভাবে তিনি ছিলেন মানবতাবাদী কবি। নীতি আদর্শের প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন। কবি ফররুখ আহমদের চিন্তাচেতনা দর্শন সবই ছিল এ দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। তার কবিতা ছিল মানবতাবাদী দর্শনে পরিপূর্ণ, কিন্তু কাব্যে রসবোধেরও কমতি নেই।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-স্বীকৃত একজন অসাধারণ জননন্দিত কবি ফররুখ আহমদ। কবির সাহিত্য জীবনের শুরুতে ‘সওগাত’ পত্রিকায় ফররুখ সম্পর্কে আবু রুশদ লিখেছেন- ‘ফররুখ আহমদ রোমান্টিক কবি, অর্থাৎ তার দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তব-বোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। তার কাব্যে সৌন্দর্যের জয়গান অকুণ্ঠ, সুদূরের প্রতি আকর্ষণও তার কাব্যের আর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। তবুও তিনি নিঃসন্দেহে আধুনিক।’ প্রখ্যাত অনেক সমালোচক সাহিত্যিক ফররুখ আহমদ সম্পর্কে তাদের মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন।
মানবতাবাদী ও জাতীয় জাগরণের কবি ফররুখ আহমদ একজন আধুনিক ও সৃষ্টিশীল কবি হওয়ার পরও আত্মপরিচয় ভোলেননি কখনো। সাহিত্য সাধনার দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় তিনি আত্মবিমুখ হননি বরং তার কাব্য ও রচনায় ‘বাঙালি মুসলিম’ পরিচয়টি জাগিয়ে তোলার প্রয়াস পেয়েছেন বারংবার।
আরও পড়ুন: শেরপুরে বাসের চাপায় সিএনজি যাত্রী নিহত, আহত ৪
তার প্রথম ও সেরা কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’ ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত হয়। এছাড়া আজাদ কর পাকিস্তান (১৯৪৬), সিরাজাম মুনিরা (১৯৫২), নৌফেল ও হাতেম (১৯৬১), মুহূর্তের কবিতা (১৯৬৩), হাতেম তায়ী (১৯৬৬), পাখির বাসা (১৯৬৫), হরফের ছড়া (১৯৬৮), নতুন লেখা (১৯৬৯), ছড়ার আসর (১৯৭০), নয়া জামাত (১৯৫০), হে বন্য স্বপ্নেরা (১৯৭৬), ইকবালের নির্বাচিত কবিতা (১৯৮০), চিড়িয়াখানা (১৯৮০), কাফেলা (১৯৮০), হাবেদা মরুর কাহিনি (১৯৮১), সিন্দাবাদ (১৯৮৩), কিসসা কাহিনি (১৯৮৪), ফুলের জলসা (১৯৮৪), তসবির নামা (১৯৮৬), মাহফিল (১৯৮৭), ফররুখ আহমদের গল্প (১৯৯০), ঐতিহাসিক অনৈতিহাসিক কাব্য (১৯৯১), দিলরুবা (১৯৯৪) প্রভৃতি তার অমর সাহিত্যকীর্তি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন