১১:৪১ এম
॥ নাজিউর রহমান সোহেল ॥
ঢাকা, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ : দেশের প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এবং শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সরকার শিক্ষক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার মেয়াদ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে, যা আড়াই থেকে তিন বছর হবে। এ ছাড়া, প্রতিটি প্রাইমারি ট্রেনিং ইন্সটিটিউটের (পিটিআই) সক্ষমতা বর্তমানের চেয়ে ৬ গুণ বৃদ্ধি করে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।
সম্প্রতি সচিবালয়ে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকারে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এসব তথ্য জানান।
আরও পড়ুন: শাবিপ্রবির প্রধান প্রকৌশলীর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল, তদন্ত কমিটি গঠন
সাক্ষাৎকারে প্রতিমন্ত্রী প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি, ক্লাসরুমে প্রযুক্তির ব্যবহার, ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচির রূপরেখা এবং বেসরকারি ও কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর জন্য সরকারের তদারকি নীতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
শিক্ষক প্রশিক্ষণের নতুন ফ্রেমওয়ার্ক ও পিটিআই সক্ষমতা
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অপ্রশিক্ষিত অবস্থায় দীর্ঘ সময় ক্লাসরুমে দায়িত্ব পালনের বর্তমান ধারাকে একটি নীতিগত পরিবর্তনের আওতায় আনা হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, শিক্ষকদের আধুনিক শিখনপদ্ধতিতে পারদর্শী করতে নতুন প্রশিক্ষণের ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা হচ্ছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, শিক্ষকরা প্রথমে পিটিআইতে দুই মাস ইন-ক্যাম্পাস প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে ক্লাসে ফিরে যাবেন। এরপর নির্ধারিত সিলেবাস বা মডিউল অনুযায়ী বাকি সময়ের মধ্যে (আড়াই থেকে তিন বছরের মধ্যে) তাদের প্রশিক্ষণ মডিউল ও পরীক্ষাগুলো পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করতে হবে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এক বছর নির্ধারণ করে একটি নতুন প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরির কাজ চূড়ান্ত করেছে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ)। সম্প্রতি নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের ব্যাচগুলো এই মডিউল অনুযায়ী প্রশিক্ষণ পাবে। প্রথমে শিক্ষকরা পিটিআইতে দুই মাস ইন-ক্যাম্পাস প্রশিক্ষণ শেষ করে ক্লাসরুমে পাঠদানে চলে যাবেন। আর বাকি ১০ মাস অনলাইন ও অফলাইন মিলিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রশিক্ষণ শেষ করতে হবে।
আরও পড়ুন: পুলিশের ১১ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে
ববি হাজ্জাজ আরও জানান, বর্তমানে পিটিআইগুলোর বার্ষিক প্রশিক্ষণের সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজারের মতো রয়েছে। এই সক্ষমতা বাড়িয়ে ৪২ হাজারে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য পিটিআই ছাড়াও, প্রয়োজনে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এডুকেশন ডিপার্টমেন্টকে যুক্ত করে শিক্ষকদের আধুনিক শিখনপদ্ধতিতে পারদর্শী করে তোলা হবে। একই সাথে কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘নীতিগতভাবে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি — কোনো শিক্ষক উপযুক্ত প্রশিক্ষণ না নিয়ে ক্লাসরুমে স্থায়ীভাবে পাঠদানে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না।’
আগামী বছর থেকে সারাদেশে ‘মিড-ডে মিল’
শিক্ষার্থীদের স্কুলে উপস্থিতি ধরে রাখা ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচি ‘মিড-ডে মিল’ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে দেশের ১৫০টি উপজেলায় মিড-ডে মিল চালু রয়েছে। বাকি উপজেলায় এই কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরির কাজ চলছে। আশা করছি— আগামী ২০২৭ সালের মধ্যেই দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ শিশুর জন্য পুষ্টিকর দুপুরের খাবার পরিবেশন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’
আরও পড়ুন: দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষ হিমশিম খাচ্ছে: মিয়া গোলাম পরওয়ার
‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ ও প্রযুক্তির ইকোসিস্টেম
শিক্ষকদের ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ এবং ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ উদ্যোগের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, এটি কেবল একটি ডিজিটাল ডিভাইস দেওয়ার প্রকল্প নয়। তিনি বলেন, ‘গুগলসহ বৈশ্বিক বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় আমরা ক্লাসরুমের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ইকোসিস্টেম তৈরি করছি। এর মূল কানেক্টর হিসেবে শিক্ষকদের হাতে ট্যাব পৌঁছানো হবে।’
এছাড়া যেসকল দুর্গম অঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, সেগুলোতে বিদ্যুৎ বিভাগের সাথে যৌথ সমঝোতার ভিত্তিতে সোলার প্যানেল স্থাপন ও ব্যান্ডউইথ নিশ্চিতের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
প্রধান শিক্ষক পদোন্নতি ও সহকারী শিক্ষক নিয়োগ
আরও পড়ুন: ‘গণঅভ্যুত্থানের পরতে পরতে হাসনাত ও সারজিসের গাদ্দারি খুঁজে পাওয়া যাবে’
সারাদেশে প্রায় ৩৬ হাজার ৯৬০টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকা প্রসঙ্গে আদালতের রায়ের বিষয়টি তুলে ধরে ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি কার্যক্রমের আইনি প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এখন কেবল রায়ের চূড়ান্ত সার্টিফাইড কপি হাতে পাওয়ার অপেক্ষা। সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সাথে এ বিষয়ে আগেই আলোচনা শুরু হয়েছে। রায়ের চূড়ান্ত কপি পাওয়ার সাথে সাথেই প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু হবে। এটি সম্পন্ন হলে স্বাভাবিকভাবেই নতুন শিক্ষক নিয়োগের পথ উন্মুক্ত হবে। তখন বিপুল পরিমাণ সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যাবে।’
শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে অতিরিক্ত বইয়ের বোঝা কমিয়ে আনন্দদায়ক শিক্ষা, গল্প বলার মাধ্যমে শেখানো এবং গণিত-বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের মতো কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করতে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে (এনসিটিবি) প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
এছাড়া হাওর, চর ও দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উৎসাহিত করতে বিশেষ ভাতা প্রদান এবং শিক্ষার্থীদের যাতায়াত কষ্ট নিরসনে প্রয়োজনে রেসিডেন্সিয়াল বা আবাসিক স্কুলের ব্যবস্থা করা যায় কি-না, তাও সরকারের নীতিগত ভাবনায় রয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
আরও পড়ুন: আগামী বছর দেশে বিদ্যুৎ রাখার জায়গা থাকবে না : চিফ হুইপ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন