০৮:৪৩ পি.এম
ইরান যুদ্ধের ফলস্বরূপ মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রধান সমরাস্ত্রগুলোর মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার (১০ জুলাই) দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতির ‘শেষ’ ঘোষণা দেওয়ার পর এই ঘাটতি সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশটির শীর্ষ প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে জানিয়েছেন, এই তীব্র অস্ত্র সংকট ভবিষ্যতে চীন কিংবা উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সক্ষমতাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্নেল মার্ক কানসিয়ান জানান, গত পাঁচ দিন ধরে যুদ্ধ চলতে থাকলে অস্ত্রের মজুত এতটাই কমে যাবে যে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক ঝুঁকি সৃষ্টি হবে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধের প্রথম ধাপে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-র আওতায় মার্কিন সামরিক বাহিনী ইতিমধ্যে কয়েক হাজার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
সিএসআইএস-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তাদের অন্তত অর্ধেক ‘থাড’ ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টর, প্রায় অর্ধেক ‘প্যাট্রিয়ট’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ৩০ শতাংশ ‘টমাহক’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ফেলেছে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক গবেষক মাইকেল ও’হ্যানলন বলছেন, অস্ত্রের মজুত আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক কমে গেছে—এতে কোনো সন্দেহ নেই।
আরও পড়ুন: ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ৪৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল
অস্ত্রের এই বিশাল ঘাটতি পূরণ করা পেন্টাগনের জন্য সময়সাপেক্ষ হবে। মার্ক কানসিয়ান জানান, বর্তমানে পেন্টাগন প্রতি মাসে গড়ে মাত্র ১৫টি টমাহক এবং ২০টি নতুন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র পাচ্ছে। ২০২৬ সালে নতুন কোনো থাড ক্ষেপণাস্ত্র পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। সিএসআইএস-এর মতে, সমরাস্ত্রের মজুত যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে অন্তত তিন বছর বা তারও বেশি সময় লাগবে। সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা এলেন ম্যাককাসকার জানিয়েছেন, ‘সমরাস্ত্রের মজুত আগের মতো করতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দুই থেকে পাঁচ বছর সময় লেগে যাবে।’
অন্যদিকে, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় বিশেষজ্ঞ জন ফেরারি জানিয়েছেন, ‘যুদ্ধ শুরুর পর থেকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র বদলানোর জন্যও কংগ্রেস থেকে কোন অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ফলে সাধারণ সময়ের ধীরগতির উৎপাদন প্রক্রিয়াই বর্তমানে বহাল রয়েছে।’ সম্প্রতি হোয়াইট হাউস ইরান যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে অতিরিক্ত তহবিলের জন্য কংগ্রেসের কাছে আবেদন করেছে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই প্রস্তাব পাস হওয়া কঠিন। এর পাশাপাশি, পেন্টাগনের একজন কর্মকর্তা জানান, সমরাস্ত্র শিল্প সম্প্রসারণে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গত জুনে ট্রাম্প ‘ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট’ প্রস্তাব করেন যাতে আমলাতন্ত্রের জটিলতা কমিয়ে দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করা যায়। পেন্টাগনের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আমেরিকার উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বিভাগটি কাজ করছে যাতে সরবরাহ ব্যবস্থায় গতি আসে।’ তবে মার্ক কানসিয়ান মনে করেন, সরকারের এই পদক্ষেপ কার্যকর হলেও এর প্রভাব খুবই সীমিত হবে।
বিশ্বজুড়ে অস্ত্রের চাহিদা বাড়ায় অন্যান্য দেশকে নিজস্বভাবে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির লাইসেন্স দেওয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে ট্রাম্প ইউক্রেনকে লাইসেন্স দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। তবে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর। জাপানের একটি প্যাট্রিয়ট কারখানা তৈরি করতে যেখানে তিন বছর সময় লেগেছিল, সেখানে জার্মানি ২০২২ সালে কাজ শুরু করলেও এখনো কোনো ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, চীন বা উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্বে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের এই সংকট বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য হামলা প্রতিহত করতে এবং তাদের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে প্রচুর পরিমাণ মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন হবে।
আরও পড়ুন: কসোভোতে মুসলিম দেশ হিসেবে অন্য এক দৃষ্টান্ত: ক্যাথলিক নারী নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট
অবশ্য পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আমেরিকার সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী। প্রেসিডেন্টের পছন্দ অনুযায়ী যেকোনো সময় এবং স্থানে অভিযান পরিচালনার প্রয়োজনীয় সবকিছুই আমাদের রয়েছে। আমাদের জনগণ ও স্বার্থ রক্ষায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার ও সক্ষমতা রয়েছে।’ মাইকেল ও’হ্যানলন মনে করেন, চীন বা উত্তর কোরিয়াকে প্রতিহত করার সক্ষমতা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে রয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে এই সক্ষমতা কমে যেতে পারে। সেই পর্যায়টি ঠিক কোথায়, তা হয়তো আমরা আগে থেকে জানতে পারব না, কারণ এটি মূলত শত্রুর মনস্তত্ত্বের ওপর নির্ভর করে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন