০৩:১২ পি.এম
গাজীপুরের শ্রীপুরের কেওয়া এবং মাওনা মৌজার মাওনা বাজারের জমি দখল করে সেমিপাকা, টিনশেড ও মাটির ঘর নির্মাণ করে দোকান নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালীরা বাজারের জমি দখল করে রাখায় বাজারের আয়তন ছোট হয়ে আসছে। এতে করে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ইজারাদার এবং সরকারি রাজস্ব আদায় ব্যাহত হচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী মাওনা বাজার হাট উপজেলার মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম হাট। এখানে সপ্তাহে দুইদিন রবিবার ও বৃহস্পতিবার হাট বসে।
সোমবার (২৯ জুন) মাওনা বাজারের ইজারাদার সুব্রত দাস এসব অভিযোগ করেন।
হাটের ক্রেতা ও বিক্রেতারা জানান, যেকোন এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র সাপ্তাহিক হাট। শ্রীপুর পৌরসভার মাওনা বাজার হাটে দেড় যুগ আগেও অনেক ফাঁকা জায়গা ছিল। হাটে কৃষকেরা ধান, আলু, পাট, সবজিসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে এসে বিক্রি করতেন। এখনো তাঁরা হাটে আসেন। কিন্তু হাটে এখন সরাসরি তাদের পণ্য বিক্রির সুযোগ কমে এসেছে। হাটের জায়গায় গড়ে উঠেছে স্থায়ী দোকানপাট। বাধ্য হয়ে কৃষকরা আড়তদার ও ফড়িয়াদের কাছে পণ্য বিক্রি করে দেন। আবার অনেকে পণ্য নিয়ে বসেন হাটসংলগ্ন সড়কের পাশে, কখনো সড়কের ওপর।
আরও পড়ুন: বিএমপি কমিশনারের উদ্যোগে পুলিশ লাইন্সের পুকুরে মৎস্যপোনা অবমুক্ত, উৎপাদন বৃদ্ধি ও পুষ্টি চাহিদা পূরণের প্রত্যাশা
মাওনা বাজার হাটে নিয়মিত পণ্য নিয়ে আসেন বারতোপা গ্রামের জলিল মিয়া। তিনি বলেন, রোদে পুড়ে ফসল ফলাই। হাটে আইয়াও রোদে পুড়ে সড়কে খাড়ায়া ফসল বেচি। আামাগো জন্যে হাটে জায়গা নাই, যেখানে বইয়া ক্ষেতের ফসল বেচপবার পামো।
কৃষক আলফাজ মিয়া বলেন, হাটের মোট জমির তিন ভাগের দুই ভাগেই অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে টিনশেড ও সেমিপাকা দোকানঘর। এতে করে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে।
বাজার দখলকারী কয়েকজন দোকানির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা দীর্ঘদিন থেকেই এই বাজারে কোনো ইজারা না দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন।
টং দোকানদার আলামিন বলেন, আমরা দোকান ঘর করে নিয়েছি, কাউকে কোন ইজারা দিই না। চা দোকানি ফারুক হোসেন বলেন, দোকানগুলো আমাদের অনেক আগে থেকে। আমরা কাউকেই কোনো ইজারা দেই না।
আরও পড়ুন: ৭নং জগদল ইউনিয়ন বিএনপির কর্মীসভা অনুষ্ঠিত, ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মীদের মূল্যায়নের দাবি
বাজারের জায়গায় বিগত পাঁচ বছর আগে একটি ঘর তুলে ভাড়া দিয়েছেন আব্দুল মান্নান। তিনি বলেন, আমি লেপ তোষকের দোকান ভাড়া দিয়েছি। খাজনা দেন কি না জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন লিজের নেওয়ার জন্য আবেদন করেছি। বিগত পাঁচ বছর যাবত আবেদন করে রেখেছি। কিন্তু লিজের অনুমতি দিচ্ছে না।
সুরুজ মিয়া বলেন, আমি মাটি (কোঠা) দিয়ে দোতলা একটি ঘর তুলেছিলাম। ওই দোকানে কসমেটিকস ও ষ্টেশনারী মালামাল বিক্রি করতাম। এখন ঘরের চাল দুর্বল হয়ে পড়ায় আপাতত বন্ধ হয়েছে। ইজারা দেন কি না জিজ্ঞাসা করলে বলেন, আগে দিতাম এখন আর ইজারা দিই না।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বাজারের ক্রেতারা জানান, ধান মহলে তিনটি টং দোকান বসিয়ে ব্যক্তিগতভাবে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। একইভাবে সরকারি খাস জমিতে সেমি পাকা ঘর নির্মাণ করে ‘শাপলা সংঘ’ নামে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করছে একটি প্রভাশালী মহল। এতে করে বাজারের প্রকৃত জমি কমে যাচ্ছে এবং বাজারের আকার ছোট হয়ে আসছে। উপজেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম মাওনা বাজার এখন অন্যান্য ছোট বাজারের চেয়েও ছোট হয়ে আসছে। বাজারের গরুর হাটে শাহিন নামে এক ব্যক্তি সরকারি জমিতে মুরগির শেড নির্মাণ করে ভাড়া আদায় করছেন।
দখলকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা লিজ নেওয়ার জন্য আবেদন করছেন, কেউ কেউ বলছে লিজের জন্য বিগত পাঁচ বছর যাবত কর্তৃপক্ষ বরাবর দৌঁড়াচ্ছেন। কিন্তু লিজ পাচ্ছেন না।
আরও পড়ুন: কুলাউড়ায় জামায়াতের পল্টন ট্র্যাজেডি দিবস পালিত, বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ
তবে লিজ না নিয়ে অবৈধভাবে বাজারের জমিতে কেন ঘর নির্মাণ করে দখলে রেখেছেন এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি দখলকারীরা।
বাজারের মধ্যেই মাওনা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কার্যালয় থাকা সত্ত্বেও কীভাবে বছরের পর বছর সরকারি জমি দখল করে ঘর নির্মাণ করে ভাড়া আদায় করছে প্রভাশালীরা তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ ভূমি অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে এসব দখলদারিত্ব সংঘটিত হয়েছে। একাধিকবার অভিযোগ জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। সরকারি খাস জমি দ্রুত দখলমুক্ত করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান স্থানীয়রা।
মাওনা বাজারের বর্তমান ইজারাদার সুব্রত দাস জানান, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে বাজার ইজারা নেওয়ার সময় চুক্তিনামা দলিলে উল্লেখ রয়েছে মাওনা বাজার প্রায় ৮ দশমিক ৬ একর (প্রায় ২৪ বিঘা) জমির উপর অবস্থিত। বর্তমানে বাজারের জমি রয়েছে ৫-৭ বিঘা। বাকিটুকু প্রভাবশালীরা দখলে নিয়ে ঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন। বাজারের খোলা জায়গা দখল করে স্থায়ী দোকানঘর নির্মাণ করে ব্যক্তিগতভাবে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এতে সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি তিনিও (ইজারাদার) আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
শ্রীপুর পৌর ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুল লতিফ বলেন, তাদের তালিকা অনুযায়ী ১১১ জন প্রভাবাশালী ব্যক্তি ঐতিহ্যবাহী মাওনা বাজার হাটের সেমি পাকা, আধা পাকা, টিনশেড এবং মাটির (কোঠা) দোকানঘর নির্মাণ করে বাজারের বেশিরভাগ অংশ দখলে রেখেছেন।
আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন সেনাবাহিনী মোতায়েন ও ইউএনও প্রত্যাহারসহ চার দফা দাবি ১১-দলীয় জোটের
শ্রীপুর পৌরসভার বাজার পরিদর্শক তৌফিক আহমেদ বলেন, মাওনা ইউনিয়ন পরিষদের অল্প কিছু জায়গা আছে। বাকি জায়গাটুকু পৌরসভার। দখলের বিষয়ে আগেও আমরা ২ থেকে ৩ বার পদক্ষেপ নিয়েছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আসলে এটা শেষ করা যায় না। আমরা কয়েকবার তালিকা করে নোটিশও দিয়েছি। কিন্তু এটা বড় একটা উচ্ছেদ। এখানে অনেকে বাড়ি-ঘরও করে ফেলেছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা চেষ্টা করেছি ছোট ছোট স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করতে। পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) স্যার এ বিষয়গুলো জানে। আসলে বাজার দখল হয়ে গেছে এটা সত্য। কিন্তু কতটুকু হয়েছে তা মাপ (মেজারমেন্ট) দিয়ে নিশ্চিত করে দেখতে হবে। এটা একবারে দখল হয় নাই, আস্তে আস্তে দখল হয়েছে।
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদ ভূঁইয়া বলেন, আমি নতুন আসছি এখানে। বিষয়টি মাওনা বাজারের ইজারাদার আমাকে জানিয়েছে। সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন: ২৫টি সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের দ্বিতীয় শিফট সাময়িক স্থগিত
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন