০৪:৩২ পি.এম
ইসরায়েলের তিন বছরের ধারাবাহিক সামরিক অভিযানের ফলে গাজা উপত্যকার জনজীবন, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। লাখো মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। পানি, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মৌলিক সেবাগুলো এখন অনেক মানুষের কাছে দুর্লভ হয়ে পড়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইসরায়েলি হামলায় ৭৪ হাজার ২৪৫ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
বুধবার (৭ অক্টোবর) যুদ্ধের তিন বছর পূর্ণ হলো। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলেও সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ১ হাজার ৪৬২ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ফলে দীর্ঘ যুদ্ধের প্রভাব এখন শুধু ধ্বংসস্তূপে নয়, মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাপনেও গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে গাজার ৯৪ শতাংশ মানুষ জরুরি আশ্রয় ও মৌলিক গৃহস্থালি সহায়তার প্রয়োজন অনুভব করছিলেন। প্রায় ৬৫ শতাংশ পরিবার তাঁবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছিল। পর্যাপ্ত বিছানা, আলো, রান্নার সরঞ্জাম এবং স্যানিটেশন সুবিধার ঘাটতি রয়েছে বহু পরিবারের।
আরও পড়ুন: ট্রাম্প: ইউক্রেনকে বিপুল সহায়তা দিয়েও কিছু পায়নি যুক্তরাষ্ট্র
পানির সংকটও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আগস্টের শুরুতে মূল্যায়ন করা পরিবারগুলোর ৯১ শতাংশ মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার পানির নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিল। গাজায় কার্যকর বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা না থাকায় হাসপাতাল এবং অন্যান্য জরুরি সেবা চালাতে জেনারেটর, জ্বালানি ও খুচরা যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা মানুষের চলাচল এবং ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগও কঠিন করে তুলেছে।
যুদ্ধের ফলে গাজার অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লেগেছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা ইউএন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজার ৯২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। বেকারত্ব বেড়ে ৭৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালে গাজার মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন ছিল মাত্র ২১২ ডলার, যা ২০২২ সালের প্রায় ১৭ শতাংশ। কৃষি ও শিল্প উৎপাদনও যুদ্ধের আগের তুলনায় ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
কর্মসংস্থান ও আয় কমে যাওয়ার ফলে বহু পরিবার এখন মানবিক সহায়তা, ঋণ এবং ছোটখাটো অনানুষ্ঠানিক কাজের ওপর নির্ভরশীল। পণ্যের সরবরাহে বিধিনিষেধ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার বিপর্যয়ের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামও যুদ্ধের আগের তুলনায় ব্যাপক বেড়ে গেছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে সংকট দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় সাত লাখ শিশু প্রায় টানা তিন বছর সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অনেক শিশু এখন তাঁবু বা অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রে পড়ছে, আবার প্রায় দুই লাখ শিশু কোনো শিক্ষার সুযোগই পাচ্ছে না।
আরও পড়ুন: সৌদি আরব থেকেই আসতে পারে জ্বালানি তেলের পরবর্তী বড় ধাক্কা
গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রায় ধ্বংসের মুখে রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, উপত্যকার ৩৬টি হাসপাতালই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি কোনোভাবে কার্যক্রম চালালেও একটিও পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না। ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, পরীক্ষার উপকরণ এবং জ্বালানির ঘাটতির কারণে ক্যানসার, কিডনি রোগসহ দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
চিকিৎসার জন্য গাজার বাইরে যাওয়ার সুযোগও সীমিত। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রায় ১২ হাজার ৪০০ রোগীকে চিকিৎসার জন্য বাইরে নেওয়া হয়েছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, আরও বহু মানুষ এমন বিশেষায়িত চিকিৎসার অপেক্ষায় রয়েছেন, যা গাজার ভেতরে পাওয়া সম্ভব নয়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত জনসংখ্যা, অস্বাস্থ্যকর আশ্রয়, পানি এবং পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার সংকটে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বেড়েছে।
যুদ্ধ গাজার ভৌগোলিক চিত্রও বদলে দিয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণ এবং চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে উপত্যকার বড় অংশে মানুষের প্রবেশ সীমিত হয়ে গেছে। সেপ্টেম্বরের এক হিসাবে, গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণ এবং প্রবেশ-নিষেধের আওতায় ছিল বলে ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটর জানিয়েছে। ফলে ২০ লাখের বেশি মানুষ উপত্যকার তুলনামূলক ছোট একটি এলাকায় ঘন হয়ে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন।
রাফাহ এ পরিবর্তনের অন্যতম বড় উদাহরণ। যুদ্ধের সময় দক্ষিণ গাজার এই শহরে বিভিন্ন এলাকা থেকে পালিয়ে আসা ১০ লাখের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের মে মাসে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরুর পর জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ৮ লাখের বেশি মানুষ রাফাহ থেকে আবারও বাস্তুচ্যুত হন। বর্তমানে শহরটির বড় অংশ ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে থাকায় বহু ফিলিস্তিনি নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারছেন না।
আরও পড়ুন: রাজপরিবারের সঙ্গে দূরত্ব ঘোচাতে চান প্রিন্স হ্যারি
যুদ্ধ গাজার বেসামরিক প্রশাসন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও দুর্বল করেছে। ২০০৭ সাল থেকে গাজা শাসন করা হামাসের প্রশাসনিক কাঠামো যুদ্ধের কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুলিশ এবং নিরাপত্তা স্থাপনাগুলোতে হামলার কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সক্ষমতাও কমেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পুলিশকে লক্ষ্য করে অন্তত ১২টি হামলায় ৫৩ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৩৫ জন পুলিশ সদস্য ছিলেন।
তিন বছরের যুদ্ধ গাজার মানুষের জীবনকে শুধু ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেনি, বরং বেঁচে থাকার পুরো কাঠামোকে বদলে দিয়েছে। ঘর, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, নিরাপদ পানি এবং চলাচলের সুযোগ হারিয়ে লাখো মানুষ এখন প্রতিদিনের জীবন চালাচ্ছেন অনিশ্চয়তা এবং সংকটের মধ্যে। যুদ্ধের অবসান হলেও গাজার স্বাভাবিক জীবন এবং অবকাঠামো পুনর্গঠনে দীর্ঘ সময় এবং বিপুল সম্পদের প্রয়োজন হবে। তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন