০৪:১৫ এম
জামালপুরের সীমান্তবাসীর রাতগুলো উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও পাহারায় কাটছে। সীমান্তে পুশইন ঠেকাতে তারা নির্ঘুম রাত্রি যাপন করছেন। রাত হলেই আতঙ্ক নেমে আসে, এবং হতাশার মধ্যে সীমান্তে পাহারা দিতে হচ্ছে। সীমান্তের কাছে একটি গ্রামের রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে যুবকরা পাহারা দিচ্ছেন। কারো হাতে টর্চলাইট, অন্যদিকে কারো হাতে বাঁশের লাঠি রয়েছে। তারা সীমান্তের দিকে নজর রেখে মোবাইল ফোনে খবর আদান-প্রদান করছেন। রাতভর দায়িত্ব পালন শেষে ভোরে বাড়ি ফেরার কথা হলেও বিশ্রামের সুযোগ খুব কম। কারণ দিনের বেলাও যেকোনো সময় সীমান্তে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তখন ফের ছুটতে হয় সীমান্তের দিকে, যেন যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে সেখানে।
ভারতের মেঘালয় ও আসামের সীমান্তের এপারে বাংলাদেশের জামালপুরের বকশীগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ। সীমান্তের উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ ঘুরে দেখা গেছে, সীমান্তবাসীদের জীবনে স্বাভাবিকতা বলতে কিছু নেই। রাতের ঘুম হারাম হয়েছে অনেক আগেই। দিনগুলো কাটছে উৎকণ্ঠা আর সতর্কতার মধ্য দিয়ে। সীমান্তে পুশইনের খবর এলেই মুহূর্তের মধ্যে লাঠিসোঁটা হাতে শত শত মানুষ জড়ো হচ্ছেন।
সীমান্ত এলাকার অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ, দিনমজুরি, ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু তারা রাতে সীমান্ত পাহারার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। দেওয়ানগঞ্জ সীমান্তের বগার চরের মকবুল হোসেন নামে এক কৃষক বলেন, সারাদিন জমিতে কাজ করি। রাতে পাহারায় থাকতে হয়। ভোরে ঘুমাতে যাই। আবার দিনের বেলায় খবর আসে সীমান্তে লোক জড়ো হতে হবে। তখন সব কাজ ফেলে ছুটে যেতে হয়। অন্যদিকে ওবায়দুল নামে এক যুবক জানান, আমরা এখন ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। মোবাইল ফোন সবসময় চালু রাখতে হয়।
আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন সেনাবাহিনী মোতায়েন ও ইউএনও প্রত্যাহারসহ চার দফা দাবি ১১-দলীয় জোটের
স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেছে, পুশইনের আশঙ্কা বা খবর ছড়িয়ে পড়লে গ্রামের পর গ্রাম থেকে মানুষ বেরিয়ে আসেন। হাতে লাঠি, বাঁশ কিংবা দেশীয় সরঞ্জাম নিয়ে তারা সীমান্ত এলাকায় অবস্থান নেন। অনেক সময় কয়েক মিনিটের মধ্যে শত শত মানুষের জমায়েত ঘটে। সীমান্তবাসীরা জানিয়েছেন, রাতের পাহারার পাশাপাশি দিনের বেলাতেও তারা বিভিন্ন স্থানে নজরদারি করছেন। তথ্য আদান-প্রদান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল ফোন ও স্থানীয় নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হচ্ছে। কোথাও অস্বাভাবিক কিছু দেখলে দ্রুত খবর ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
ব্যবসায়ী আব্দুল কুদ্দুস জানিয়েছেন, দোকানে বসে থাকলেও মন সীমান্তে থাকে। খবর পেলেই দোকান বন্ধ করে চলে যেতে হয়। এখন ব্যবসার চেয়ে সীমান্তের চিন্তাই বেশি। সীমান্ত এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, স্থানীয় অনেক তরুণ স্বেচ্ছায় তথ্য সংগ্রহ করছেন। কোথা থেকে কে আসছে, কোথায় অস্বাভাবিক তৎপরতা আছে তা নজরে রাখছেন। প্রয়োজনে সেটা দ্রুত বিএসএফের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।
বকশীগঞ্জের রামরামপুর এলাকার তরুণ নাদিম বলেন, আমরা সংঘাতে জড়াতে চাই না। তবে সীমান্ত নিয়ে সতর্ক থাকি। সন্দেহজনক কিছু দেখলেই সংশ্লিষ্টদের জানাই। সীমান্ত এলাকার নারীরা বলছেন, পরিবারের পুরুষরা প্রতিদিন রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন, ফলে উদ্বেগ বেড়েছে। সানজিদা নামে এক গৃহিণী বলেন, রাতে পাহারায় যায়, দিনে আবার খবর পেলে সীমান্তে যেতে হয়। সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকি। শিশুরাও এই পরিস্থিতির প্রভাব থেকে বাদ যাচ্ছেন না। শিশুদের মধ্যে অজানা ভয় ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে রাত জেগে পাহারা দেওয়ার কারণে মানুষের কর্মক্ষমতা কমছে। কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন কাজকর্মের উপর এর প্রভাব পড়ছে এবং অনেকেই অসুস্থ বোধ করছেন। সীমান্তঘেঁষা দেওয়ানগঞ্জের পার রামরামপুর ইউনিয়নের রহিমপুরের বাসিন্দা তালেব আলী জানান, দিনে কাজ না করলে সংসার চলে না। তবে সীমান্তের ডাক এলে না গিয়েও উপায় নেই। জীবন যেন পাল্টে গেছে।
আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ১৮৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১১৫টি ঝুঁকিপূর্ণ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন