০২:৫৬ এম
দেশে ক্ষতিকর কীটনাশকের অপব্যবহার বন্ধের উদ্দেশ্যে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ওই লক্ষ্যে নতুন একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশে কীটনাশকের ব্যবহারকে আরো বিজ্ঞানভিত্তিক, সীমিত ও পরিবেশবান্ধব করে তোলা সম্ভব হবে। নতুন ওই নীতিমালার মাধ্যমে কীটনাশকের মান নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাছাড়া চিহ্নিত অতিমাত্রায় ক্ষতিকর কীটনাশকগুলো ধাপে ধাপে নিষিদ্ধ বা কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হবে। কৃষি মন্ত্রণালয় গত জুলাইয়ে এই বিষয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে। ওই কমিটি টেকসই কৃষি ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে বিদ্যমান বালাইনাশক আইন, বিধিমালা, নিবন্ধন, লাইসেন্সিং, মান নিয়ন্ত্রণ, গবেষণাগার ও মনিটরিং ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে গাইডলাইন প্রদান করবে। এতে মাটি, পানি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি বালাইনাশকের আমদানি, উৎপাদন ও পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করার দিকনির্দেশনা থাকবে। এদিকে আমদানি করা কীটনাশক কৃষকের কাছে পৌঁছানোর আগে সেটির টেস্টের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি বিশেষজ্ঞ এবং কৃষি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এই তথ্য জানা যায়।
সূত্র মতে, দেশে চাষাবাদ বাড়ার সাথে সাথে বেড়েছে কীটনাশক ও বালাইনাশকের ব্যবহারও। ফসলের নিবিড় চাষ, উচ্চফলনশীল জাতের বিস্তার এবং সবজি ও ফল উৎপাদন গত এক দশকের মধ্যে দেশে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৫ সালে দেশে ৩৫ হাজার ৫২৩ টন কীটনাশক ব্যবহার হয়েছিল। আর ২০২৪ সালে দেশে এর পরিমাণ বেড়ে ৪০ হাজার ৮৩২ টনে পৌঁছেছে। দেশের আবাদযোগ্য কৃষিজমির পরিমাণ ৮৮ দশমিক ২৯ লাখ হেক্টর। হিসাব থেকে জানা যায়, হেক্টরপ্রতি ৪ দশমিক ৬২ কেজি কীটনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশব্যাপী কীটনাশকের অবাধ ব্যবহারের ধরন উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। একই জমিতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগ, অনুমোদনহীন মিশ্রণ তৈরি, এক সক্রিয় উপাদান বারবার ব্যবহার এবং ফসল কাটার সময়ের আগে স্প্রে করার কারণে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ঝুঁকি বাড়ছে। প্রায়ই বাজারে পাওয়া শাকসবজি ও ফলমূলেও অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ বা রেসিডিউ পাওয়া যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বড় বাধা তৈরি করছে।
সূত্র জানায়, দেশে এখনো অধিকাংশ কৃষকিন কীটনাশক স্প্রে করার পর ফসল তোলার নির্ধারিত অপেক্ষার সময় যথাযথভাবে অনুসরণ করে না। ফলে রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ সরাসরি খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। তাছাড়া অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে মাটির উপকারী অণুজীব, পরাগায়নকারী মৌমাছি, জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একই কীটনাশক দীর্ঘসময় ব্যবহারে পোকামাকড়ের প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হচ্ছে। এ কারণে কৃষকদের আরো বেশি মাত্রায় বা আরও শক্তিশালী কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে নতুন নীতিমালায় কৃষক পর্যায়ে ব্যবহারের পাশাপাশি আমদানি, নিবন্ধন, উৎপাদন, বাজারজাত ও বিক্রয় অর্থাৎ পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় নিরাপত্তা নিশ্চিতের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কোন সক্রিয় উপাদান দেশে নিবন্ধিত হবে, কোনটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বাদ পড়বে এবং কোন ক্ষেত্রে জৈব বা বায়োপেস্টিসাইডকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে, তা নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তাছাড়া কৃষকের হাতে পৌঁছানোর আগে আমদানি করা কীটনাশক ল্যাবে পরীক্ষার বিষয়টিও থাকবে।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী শিশু হাসপাতালে চিকিৎসকের ধূমপান দেখে বরখাস্তের নির্দেশ দেন
সূত্র আরো জানায়, অতিরিক্ত কীটনাশকের প্রভাব মানবস্বাস্থ্য, প্রাণীদেহ ও পরিবেশ সব ক্ষেত্রেই পড়ছে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে পুকুরের মাধ্যমে মাছের দেহে এবং ঘাসের মাধ্যমে গবাদিপশুর দেহে প্রবেশ করছে। আর সবশেষে তা মানুষের শরীরেও প্রবেশ করছে। এজন্য নীতিমালার মাধ্যমে জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজন অত্যাবশ্যক। সেক্ষেত্রে কৃষকদের প্রশিক্ষণের, বাংলায় স্পষ্ট ব্যবহারবিধি, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের ব্যবহার এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া জরুরি। নতুন নীতিমালায় উচ্চ ঝুঁকির রাসায়নিক ধাপে ধাপে প্রত্যাহার, জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার বৃদ্ধি, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি এবং নিয়মিত রেসিডিউ মনিটরিং কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি দেশের কৃষিপণ্য রফতানির প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও বৃদ্ধি করবে।
এদিকে দীর্ঘসময় ধরে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ধারাবাহিকভাবে অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক প্রত্যাহারের সুপারিশ করে আসছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন রফতানি বাজারে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের সর্বোচ্চ অনুমোদিত মাত্রা (এমআরএল) আরও কঠোর হওয়ায় বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রফতানির ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অন্যদিকে এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. খন্দকার শরিফুল ইসলাম জানান, আমদানি করা কীটনাশক কৃষকের কাছে যাওয়ার আগে সেগুলোর ঝুঁকি কতটুকু তা পরীক্ষার বিষয়টি গাইডলাইনে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হবে। আমদানি করা কীটনাশকের ল্যাব পরীক্ষার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হবে। দেশে এ ধরনের পরীক্ষাগারের সুবিধা সীমিত। তবে প্রবেশপথগুলোয় এক বা দুটি পরীক্ষাগার স্থাপন করা হতে পারে। সেখানেও অল্প সময়ে পরীক্ষা করে কীটনাশকে কোনো ক্ষতিকর উপাদান, ভারী ধাতু বা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অন্য কিছু রয়েছে কিনা, তা যাচাই করা হবে। পাশাপাশি আমদানি করা পণ্যের তথ্যও ভালোভাবে পরীক্ষা করা হবে। কোনো ত্রুটি পাওয়া গেলে কৃষকের হাতে পৌঁছানোর আগে সেটির সরবরাহ বন্ধ করা যাবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন