০১:৪৪ পি.এম
মিয়ানমারের রাখাইন তথা আরাকান অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলমান সংঘাতের প্রভাব বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী জনপদে ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কক্সবাজার ও বান্দরবানের সীমান্তবর্তী মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে সীমান্তের ওপারে গোলাগুলি, বিস্ফোরণ, স্থলমাইন বিস্ফোরণ এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতার কারণে। মাদকপাচারের অভিযোগ যুক্ত হওয়ায় সার্বিক সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সর্বশেষ গত ১ অক্টোবর উখিয়ার পালংখালী সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অভ্যন্তরে স্থলমাইন বিস্ফোরণে মো. হামিদ হোসেন নামে এক রোহিঙ্গা যুবক গুরুতর আহত হন। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে প্রায় ২৫০ গজ পশ্চিমে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বিস্ফোরণটি ঘটে। আহত হামিদ কুতুপালং নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শিবিরের সি-২৭ ব্লকের বাসিন্দা। পরে তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করলে বিজিবি ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাকে কুতুপালংয়ের এমএসএফ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
তবে সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। চলতি বছরের ১০ এপ্রিল উখিয়া সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের ভূখণ্ডে স্থলমাইন বিস্ফোরণে সাদেক নামে এক রোহিঙ্গা যুবকের পা বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এর আগে ১২ জানুয়ারি টেকনাফ সীমান্তেও মাইন বিস্ফোরণে এক বাংলাদেশি যুবক গুরুতর আহত হন।
আরও পড়ুন: তাহসিফ হত্যা মামলায় বন্ধু দীপের ৩ দিনের রিমান্ড
এ ছাড়া গত ২৪ মে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে তিন বাংলাদেশি নিহত হন। সীমান্তবর্তী কৃষিজমি ও কাঠ সংগ্রহের এলাকায় যাতায়াতের সময় তারা মাইন বিস্ফোরণের শিকার হন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানাগেছে।
সীমান্তবর্তী স্থানীয়দের অভিযোগ, মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণে থাকা সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মির বিভিন্ন ধরনের অপতৎপরতা সীমান্ত পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। সীমান্তের ওপারে তাদের অবস্থান, চৌকি স্থাপন এবং চলাচল নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, সীমান্তের কাঁটাতারের ওপারে ঘন জঙ্গলের মধ্যে ছোট ছোট অনেক চৌকি দেখা যায়; তাদের দাবি, এসব চৌকিতে আরাকান আর্মির সদস্যরা অবস্থান করেন।
তবে এসব চৌকির সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও সেখানে কারা অবস্থান করছে—তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে বিষয়টি স্থানীয়দের বক্তব্য হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান সংঘাত। সাম্প্রতিক সময়েও রাখাইন অঞ্চলে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বাংলাদেশের সীমান্তের কাছাকাছি কিয়াউকতাও এলাকায় আরাকান আর্মীকে লক্ষকরে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় হতাহতের খবর প্রকাশিত হয়েছে। এতে আরাকান আর্মী চাপে পড়লেও থামছেনা তাদের তৎপরতা।
আরও পড়ুন: ৪ জেলায় নতুন পুলিশ সুপার পদায়ন, দুজন বদলি
সীমান্তবর্তী স্থানীয়দের অভিযোগ, সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে মাদক পাচারের তৎপরতা বাড়ছে। তাদের দাবি, সীমান্তের কিছু মাদক কারবারিকে ব্যবহার করে আরাকান আর্মির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চক্র মাদক পাচার করছে এবং মাদক বহনের কাজে কিছু রোহিঙ্গা যুবককেও ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, মাদক বহন করতে গিয়ে কেউ কেউ সীমান্তের স্থলমাইন বিস্ফোরণের ঝুঁকিতেও পড়ছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, জঙ্গল ও নাফ নদীর বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করে মাদক পাচারের চেষ্টা করা হয় বলেও তাদের দাবি।
সীমান্তে মাদকপাচার প্রতিরোধে বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। এসব অভিযানে বিভিন্ন সময়ে ইয়াবা, গাঁজা, আইসও অন্যান্য মাদকসহ পাচারকারীদের আটক করার ঘটনাও ঘটছে অহরহ।
সীমান্তবর্তী মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে অদৃশ্য স্থলমাইন। সীমান্তের কাছাকাছি কৃষিকাজ, মাছ ধরা, বাঁশ-কাঠ সংগ্রহ কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনে যাতায়াত করতে গিয়ে স্থানীয় ও রোহিঙ্গারা ঝুঁকিতে পড়ছেন এতে।
আরও পড়ুন: আশুলিয়ায় শতাধিক কারখানা বন্ধ রয়েছে: এসপি মোমিনুল ইসলাম
বিশেষ করে সীমান্তের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় কোথায় মাইন পুঁতে রাখা হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে না থাকায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় মাইন বিস্ফোরণের একাধিক ঘটনার পর এখন অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া সীমান্তবর্তী এলাকায় যেতে ভয় পাচ্ছেন।
বর্তমানে যে সীমান্ত এলাকা দেখা যায়, তার ঠিক ওপারেই রয়েছে মিয়ানমারের কাঁটাতারের বেড়া। ঘন জঙ্গলের কারণে বেড়াটি পুরোপুরি স্পষ্টভাবে দেখা না গেলেও দূরে এর কিছু অংশ দৃশ্যমান। স্থানীয়দের দাবি, বেড়ার ওপারে থাকা কয়েকটি ছোট চৌকি আরাকান আর্মির অবস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
মাইন বিস্ফোরণ, সীমান্তের ওপারে সংঘাত, আরাকান আর্মির কথিত তৎপরতা এবং মাদকপাচারের অভিযোগ—সব মিলিয়ে সীমান্তবর্তী জনপদে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, সীমান্তে বিজিবির টহল ও নজরদারি আরও বাড়ানোর পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করতে হবে।
তাদের মতে, সীমান্তবর্তী কৃষক, জেলে, কাঠ ও বাঁশ সংগ্রহকারী এবং সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় চলাচলকারী সাধারণ মানুষকে স্থলমাইনের ঝুঁকি সম্পর্কে নিয়মিত সচেতন করা জরুরি। একই সঙ্গে মাদকপাচারের রুটগুলো চিহ্নিত করে কঠোর নজরদারি এবং সীমান্তের ওপারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আরও পড়ুন: মাদক নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে
সংশ্লিষ্টদের মতে, রাখাইন অঞ্চলের সংঘাত এখন আর শুধু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জনপদে। তাই মাইন বিস্ফোরণ প্রতিরোধ, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, মাদকপাচার বন্ধ এবং সীমান্তবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি হয়ে উঠেছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন