০২:১৫ পি.এম
নিত্য-প্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার পণ্য কেনার পরিকল্পনা করছে। সংস্থাটি ভোজ্যতেল, মসুর ডাল ও চিনির পাশাপাশি ছোলা ও খেজুরও সংগ্রহ করবে।
টিসিবির পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে এসব পণ্যের প্রায় অর্ধেক দেশীয় উৎস থেকে এবং বাকি অর্ধেক আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সংগ্রহ করা হবে। তবে, যদি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পণ্য সংগ্রহ তুলনামূলক বেশি প্রতিযোগিতামূলক ও নির্ভরযোগ্য হয়, তাহলে বিদেশ থেকে কেনার পরিমাণ বাড়ানো হতে পারে।
টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ আজ এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, "আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পণ্য সংগ্রহ বেশি প্রতিযোগিতামূলক ও নির্ভরযোগ্য হলে বিদেশ থেকে সংগ্রহের পরিমাণ বাড়ানো হতে পারে।"
আরও পড়ুন: মাদক নিয়ন্ত্রণে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে: বিদ্যুৎমন্ত্রী
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের জন্য টিসিবি একটি ক্রয় পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যার আওতায় স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে ২২ কোটি লিটার ভোজ্যতেল, ২ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল, ১ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন চিনি, ১৪ হাজার মেট্রিক টন ছোলা এবং ৪ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন খেজুর কেনা হবে।
পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত ও ভোক্তাদের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে টিসিবি মাসভিত্তিক চাহিদা, বরাদ্দ, গুদামে থাকা মজুত এবং পাইপলাইনে থাকা সরবরাহ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে।
মজুত ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে গুদাম সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে টিসিবি। বর্তমানে সংস্থাটির ৪০টি গুদাম রয়েছে, যার মধ্যে ৯টি নিজস্ব এবং ৩১টি ভাড়ায় নেওয়া। এসব গুদামের মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৪৮ হাজার ৩৭০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে নিজস্ব গুদামের ধারণক্ষমতা ১৩ হাজার ৩৭১ মেট্রিক টন এবং ভাড়ার গুদামের ৩৪ হাজার ৯৯৯ মেট্রিক টন।
চলমান কার্যক্রমের জন্য টিসিবির বর্তমান মজুত পরিস্থিতি সন্তোষজনক বলে জানিয়েছেন চেয়ারম্যান ফয়সল আজাদ। তিনি বলেন, "নিত্যপণ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত ও বাজার স্থিতিশীল রাখতে, বিশেষ করে সরকারি সহায়তায় পণ্য পাওয়া ভোক্তাদের জন্য ক্রয় ও মজুত ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হচ্ছে।"
আরও পড়ুন: ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা ও ঐক্যবদ্ধ কাজের আহ্বান রিজভীর
সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা কমাতেও কাজ করছে টিসিবি। প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য কিনে কিছু পণ্য সামান্য মুনাফায় বিক্রির মাধ্যমে ভর্তুকি নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
ফয়সল আজাদ বলেন, সরকার টিসিবিকে বাজারের চাহিদার সঙ্গে আরও দ্রুত সাড়া দিতে সক্ষম একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে। একই সঙ্গে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ ও বাজার স্থিতিশীল রাখতে সংস্থাটির ভূমিকা বাড়ানো হচ্ছে।
তিনি জানান, টিসিবি বছরে প্রায় আড়াই লাখ মেট্রিক টন ভোজ্যতেল সরবরাহ করে, যা দেশের মোট বাজারের প্রায় ১৫ শতাংশ। তবে পরিবার পর্যায়ে এর কার্যকর বাজার অংশীদারত্ব আরও বেশি।
ডাল ও চিনির ক্ষেত্রেও পরিবারের চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ টিসিবি সরবরাহ করে, যা এসব পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে সহায়তা করে বলে তিনি জানান।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ ব্যাংক বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের ঋণ পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে শর্ত শিথিল করেছে
পণ্যের তালিকাও বাড়াচ্ছে টিসিবি। ভোজ্যতেল, ডাল ও চিনির পাশাপাশি পরীক্ষামূলকভাবে সাবান, ডিটারজেন্ট ও লবণ বিক্রি শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে আটা, বিভিন্ন মসলা, মরিচ ও হলুদ যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফয়সল আজাদ বলেন, "এসব পণ্য নিয়মিত বাজারদরের চেয়ে কম দামে সরবরাহ করা হবে, তবে এর জন্য সরকারি ভর্তুকি দেওয়া হবে না।"
বর্তমানে টিসিবির প্রায় ৮০ লাখ স্মার্ট কার্ড অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ লাখ কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। বাকি সুবিধাভোগীদের আগামী পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগে স্মার্ট কার্ড দেওয়ার আশা করা হচ্ছে।
স্মার্ট কার্ড ব্যবস্থাকে একটি গতিশীল প্রক্রিয়া উল্লেখ করে তিনি বলেন, মৃত্যু, স্থানান্তর বা অন্য কোনো কারণে সুবিধাভোগীদের তালিকায় নতুন নাম যুক্ত, নাম বাদ বা পরিবর্তন হতে পারে।
আরও পড়ুন: গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংসের জন্য আন্দোলন করছে সরকার: এমপি দিপু
টিসিবি সরবরাহব্যবস্থাকে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করার দিকেও এগোচ্ছে। বর্তমানে ডিলাররা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে স্মার্ট কার্ড স্ক্যান করেন। শিগগিরই বিক্রয়কেন্দ্রে পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে ভোক্তারা লেনদেনের রসিদ পান।
পাশাপাশি স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের জন্য নতুন একটি মোবাইলভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সুবিধাভোগীরা ডিজিটালভাবে তাদের স্মার্ট কার্ডের তথ্য দেখতে পারবেন এবং মোবাইল আর্থিক সেবা বা নগদে মূল্য পরিশোধ করতে পারবেন।
ফয়সল আজাদ বলেন, টিসিবি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যার সঙ্গে প্রায় ২১টি ভিন্ন কর্মসূচি যুক্ত করা সম্ভব। ভবিষ্যতে অন্যান্য সরকারি সংস্থাও তাদের সুবিধাভোগীকেন্দ্রিক কর্মসূচি এই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত করতে পারবে।
নিজস্ব গুদাম সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। টিসিবি প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন অতিরিক্ত মজুত সক্ষমতা তৈরি করতে চায়, যাতে ভাড়ার গুদামের ওপর নির্ভরতা কমে।
আরও পড়ুন: হাম উপসর্গে আরও ৩ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১,৩৯৬
তিনি বলেন, "পণ্য ক্রয় বাড়ানো এবং বাজারে হস্তক্ষেপের পরিধি বাড়াতে হলে লজিস্টিক সক্ষমতা জোরদার করা গুরুত্বপূর্ণ।"
ভবিষ্যৎ কৌশল সম্পর্কে টিসিবির চেয়ারম্যান বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মান বজায় রেখে সাশ্রয়ী দামে তা ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং সরাসরি ভোক্তার চাহিদার ভিত্তিতে পণ্যের তালিকা বাড়ানোই সংস্থাটির লক্ষ্য।
তিনি বলেন, "নতুন কোনো পণ্য চালুর আগে আমরা জরিপ করি। ভোক্তারা যদি জানান কোন পণ্য তাদের প্রয়োজন, তাহলে আমরা তা সরবরাহের চেষ্টা করি। আমাদের উদ্দেশ্য মানুষের জীবনকে সহজ করা।"
নতুন যুক্ত হওয়া পণ্য কেনা বাধ্যতামূলক নয় বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, "পণ্যের মানের সঙ্গে আমরা কোনো আপস করব না।"
আরও পড়ুন: রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ এমপি মনিরুলের
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন