০৭:২৭ পি.এম
ইরান সামরিক সংঘর্ষের পরিবর্তে ধাপে ধাপে চাপ বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করেছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের শর্তে সমঝোতায় নিয়ে আসা যায়। উপসাগরের কর্মকর্তারা এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানের লক্ষ্য সরাসরি যুদ্ধ জেতার ব্যাপারে নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথগুলো, নৌপথ এবং জ্বালানি অবকাঠামোগুলোকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের জন্য সংঘাতের খরচ ক্রমেই বাড়িয়ে দেওয়া।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান 'পরিমিত উত্তেজনা বৃদ্ধি' কৌশল অনুসরণ করছে, যার ফলে সংঘাত ধীরে ধীরে বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে; তবে এটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে না। তাদের ভাষ্যমতে, তেহরানের মূল লক্ষ্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও তাৎপর্যপূর্ণ মিত্রদের বোঝানো যে, হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরানের দাবিগুলো মেনে নেওয়া সংকট জোর করে নিয়ন্ত্রণে রাখার তুলনায় অনেক কম ব্যয়বহুল।
ইরান আরও ইঙ্গিত দিচ্ছে, ওয়াশিংটন যদি হরমুজে তেহরানের বৃহত্তর ভূমিকাকে স্বীকার না করে, তবে সংঘাত পারস্য উপসাগরের বাইরেও ছড়িয়ে যেতে পারে। বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী, যেখানে যুদ্ধের আগে বৈশ্বিক তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো। এই রুটে নৌ চলাচল ব্যাহত করার ক্ষমতা প্রদর্শনের পরে, ইরান বলেছেন যে, শুধু হরমুজ নয়, অন্য কোনও গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথও তাদের কৌশলের আওতায় পড়তে পারে।
আরও পড়ুন: কংগ্রেসকে পরজীবী ও রাহুলকে ব্যর্থ পণ্য আখ্যা দিলেন নরেন্দ্র মোদি
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, লোহিত সাগর এবং সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোর প্রতি ইরানের উত্তেজনা প্রবণতা প্রমাণিত করে যে, বৈশ্বিক বাণিজ্য সুরক্ষার খরচ বাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্র কতোটা অস্থিরতা সহ্য করতে পারে, তা যাচাই করাই এখন তেহরানের লক্ষ্য।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল নাইটস জানান, ইরান শুরু থেকেই উত্তেজনা এভাবে বাড়িয়েছে যাতে প্রতি সপ্তাহে নতুন কোনও কৌশল সামনে আনা সম্ভব হয়। কখনও নতুন ভৌগোলিক এলাকা, কখনও নতুন অস্ত্র, আবার কখনও নতুন লক্ষ্যবস্তু। তার ভাষ্য, “ইরানের সবচেয়ে বড় সুবিধা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে ক্ষতিগ্রস্ত করা নয়; বরং উপসাগরীয় দেশগুলো এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি চাপের মুখে ফেলা।”
একজন উপসাগরীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর কমান্ডাররা বিশ্বাস করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়াতে চাইবেন না। সূত্রটি জানাচ্ছে যে, ইরানের বিশ্বাস হলো, যুদ্ধ যত বেশি বিস্তৃত হবে এবং চাপ যত বেশি বাড়বে, শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প একটি সমঝোতায় বাধ্য হতে হবে। উল্টো ট্রাম্প মনে করেন, কঠোর সামরিক চাপ প্রয়োগ করলে ইরান আলোচনায় ফিরে আসবে। তবে, তাদের ধারণা হলো, তেহরান এই চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না।
এই মূল্যায়ন বর্তমানে ইরানের আলোচনার কৌশলের ভিত্তি বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন যে, হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে ইরানের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু তেহরান জানিয়ে দিয়েছে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা চলছেই না।
আরও পড়ুন: পাকিস্তানের গোয়াদরে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে নিহত ৩ সন্ত্রাসী
ইরানের একটি জ্যেষ্ঠ সূত্র দাবি করেছে, অতীতে নমনীয় অবস্থান নেওয়ার পরও ওয়াশিংটনের চাপ বেড়ে গেছে। এজন্য তেহরান এখন শক্ত অবস্থানে থেকে কার্যকর আলোচনা শুরুর জন্য নিজেদের দর-কষাকষির শক্তি স্থাপন করতে চায়। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল সিং বলেন, ইরান এখনও মনে করছে যে, কৌশলগত উদ্যোগ তাদের হাতেই রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন কতদূর পর্যন্ত সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত, সেই বিষয়ে অনিশ্চয়তা আছে।
ইরানের লক্ষ্য শুধুমাত্র হরমুজ প্রণালীর ওপর সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা নয়, বরং ওই জলপথে পরিচালনাভিত্তিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাও। সংকটের এই মূল প্রশ্ন এখন হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ প্রশাসন। আঞ্চলিক সূত্রগুলো দাবি করছে, ওমান উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থনে ইরানের কাছে একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে যাতে স্বেচ্ছাভিত্তিক ব্যবহার ফি আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে, ইরান চাইছে হরমুজের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং ওই পথ ব্যবহারকারী জাহাজসমূহ থেকে সেবা ফি আদায় করার ক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্র এ প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের অবস্থান হচ্ছে, হরমুজ একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ এবং এটি কোনওভাবেই ইরানের নিয়ন্ত্রণে যেতে পারে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের কৌশলের একটি বড় প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। বর্তমানে আঞ্চলিক ও পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের উপর চাপ বাড়ানোর পরিবর্তে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ এবং জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। সম্প্রতি সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত সামুদ্রিক নিরাপত্তা উদ্যোগ মূলত বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দেওয়া, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ সচল রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এই জোটের উদ্দেশ্য হচ্ছে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে জড়ানো না হওয়া। মাইকেল নাইটস এই উদ্যোগের তুলনা করেছেন লোহিত সাগরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের 'অ্যাসপিডেস' মিশনের সঙ্গে, যার প্রধান উদ্দেশ্যও ছিল বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সামরিক শক্তিতে পাল্লা দেওয়ার সক্ষমতা ইরানের নেই। তবে প্রতিবার নতুন একটি নৌপথ বা জ্বালানি স্থাপনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বিপুল সম্পদব্যয় করতে বাধ্য করতে পারে। যদি হরমুজ, বাব আল-মান্দেব বা অন্য কোনও গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, তাহলে বৈশ্বিক বাণিজ্য সচল রাখতে আরও অনেক নৌবাহিনী, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অর্থ ব্যয় করতে হবে।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের লড়াই বদলে দিচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট
বিশ্লেষকদের মতে, এটিই হচ্ছে ইরানের প্রকৃত কৌশল- একটি দীর্ঘস্থায়ী চাপের লড়াই, যেখানে তেহরান বিশ্বাস করে যে, তারা অর্থনৈতিক চাপ যতদিন সহ্য করতে পারবে, তার থেকে কম সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন জোটকে বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা মোকাবেলা করতে হবে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিক এবং ইরান বিশেষজ্ঞ অ্যালান আইয়ার বলছেন, ইরানের বর্তমান কৌশলের উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রকে অবরোধ প্রত্যাহার এবং সামরিক হামলা বন্ধ করতে বাধ্য করা। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের জ্যেষ্ঠ ফেলো রে তাকেইহ মনে করেন, ইরান আলোচনায় বসলে নিজেদের শর্ত প্রতিষ্ঠা করতে চাইবে। তিনি বলেছেন, “যদি আলোচনা হয়, তাহলে শর্ত নির্ধারণে উভয় পক্ষই চাইবে। এখন উভয়েই পাল্টাপাল্টি উত্তেজনা বাড়ানোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে।” বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, ওয়াশিংটন এবং তেহরান কেউই আপাতত পিছু হটার লক্ষণ দেখাচ্ছে না। এর ফলে চাপের এই কৌশল নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে এমন এক সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষেরও নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন