০২:২১ পি.এম
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের 'বাংলাদেশি' তকমা দিয়ে বিভিন্ন সীমান্তের মাধ্যমে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে ভারত। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়ার এই ঘটনার বিষয়ে নাগরিকত্ব যাচাইয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সমন্বয় করার জন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে।
বুধবার (১৭ জুন) সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এবং বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) এর পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে অনেক পরিবার সীমান্তের 'জিরো লাইনে' মানবেতর পরিস্থিতিতে পড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি মাসের ১ জুন থেকে বাংলাদেশে দুই শতাধিক মানুষকে ঠেলে দেওয়ার অন্তত ২১টি চেষ্টা প্রতিহত করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে।
আরও পড়ুন: পদ্মা সেতু হয়ে রূপপুরে ইউরেনিয়াম পরিবহন, শ্রমিক আন্দোলনের শঙ্কা
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সম্প্রতি দাবি করেছেন, তার সরকারের 'ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট' নীতির আওতায় শত শত 'বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে' আটক করা হয়েছে।
এই ঘটনার কারণে প্রায় ৫ হাজার মানুষকে 'ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে'।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের উপ-পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, 'ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরিবারগুলোকে নির্মমভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে কিংবা সীমান্তে ফেলে রাখছে, যা তাদের মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। সরকারকে অবিলম্বে এসব ঠেলে পাঠানো বন্ধ করতে হবে এবং নাগরিকত্ব যাচাইয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।'
সংস্থাটি আরো জানিয়েছে, তারা অন্তত নয়জন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেছে, যারা দেখেছেন বিএসএফ সদস্যরা গভীর রাতে বিভিন্ন দলকে কাঁটাতারের বেড়া কেটে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঠেলে পাঠিয়ে দেয়।
আরও পড়ুন: ত্রিশাল ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ২০ বছরেও নিয়োগ হয়নি জনবল
বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলায় গত ৫ জুন ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হলে প্রায় ৭৫ ঘণ্টার অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল হোসেন জানান, ওই ব্যক্তিদের জিরো লাইনে খোলা আকাশের নিচে বৃষ্টি ও বজ্রপাতের মধ্যে রাত কাটাতে হয়েছে। একাধিক পতাকা বৈठকের পর বিএসএফ শেষ পর্যন্ত তাদের ভারতে ফিরিয়ে নেয়।
একইভাবে ৬ জুন ঠাকুরগাঁও সীমান্তে দুইটি পরিবারের ছয় সদস্য এবং ৮ জুন এক গর্ভবতী নারী ও তার শিশুসহ ১১ জন প্রায় ৪৮ ঘণ্টা জিরো লাইনে আটকা ছিলেন। পরে বিএসএফ তাদেরও ফিরিয়ে নেয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে মার্চের নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে ভোটার তালিকা সংশোধনের মাধ্যমে ৯০ লাখেরও বেশি মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়। এরপর অনেকের বিরুদ্ধে আটক ও বহিষ্কারের আশঙ্কা তৈরি হয়।
পঞ্চগড় সদর ইউনিয়নের এক জনপ্রতিনিধি হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানান, পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির একটি পরিবার, যাদের কাছে ভারতের আধার কার্ড ছিল এবং যারা একাধিকবার ভোট দিয়েছেন, তাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার পর পুলিশ আটক করে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করে। পরে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
আরও পড়ুন: মালয়েশিয়ার পাহাংয়ে পর্যটন মেলায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সরব উপস্থিতি
ভারতের আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বারবার বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের 'অবৈধ অভিবাসী' হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সম্প্রতি তিনি বলেন, 'আমরা তাদের সীমান্তের কাছাকাছি নিয়ে যাই এবং আক্ষরিক অর্থেই সীমান্তের ওপারে ঠেলে দিই।'
মানবাধিকার সংস্থাটি বলছে, এ ধরনের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থি।
বাংলাদেশ সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, আইনি প্রক্রিয়া ও নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়া সীমান্তে কাউকে ঠেলে দিলে তাদের গ্রহণ করা হবে না। প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে দুই দেশের বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নাগরিকত্ব যাচাই এবং নাগরিক প্রত্যাবাসনের জন্য প্রতিষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে আটকা পড়ে মানবিক সংকটে পড়ছেন।
আরও পড়ুন: নেলসন ম্যান্ডেলাকে বন্দি রাখা সেই কারাগার পরিদর্শন করলেন ড. ইউনূস
মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, কোনো মানুষ, তার নাগরিকত্ব যাই হোক না কেন, দুই দেশের সশস্ত্র সীমান্তরক্ষীদের মাঝখানে খোলা মাঠে রাত কাটাতে পারে না। ভারতকে এই নির্মম ঠেলে পাঠানো বন্ধ করতে হবে এবং উভয় দেশকে নিশ্চিত করতে হবে; সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নামে মানবিক মর্যাদা যেন কখনো ক্ষুণ্ন না হয়।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন