০৭:১৫ পি.এম
ঢাকা, ১২ আগস্ট, ২০২৬ : বাণিজ্য ও বিনিয়োগ উন্নয়নের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলাদেশে নতুন শহর উন্নয়ন এবং অবকাঠামো খাতে আরো বড় ভূমিকা রাখতে চায় কোরিয়া ট্রেড-ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন এজেন্সি (কোটরা)। এ লক্ষ্যে অবকাঠামো প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, স্মার্ট সিটি সমাধান এবং কোরীয় প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান কাজে লাগানোর ওপর জোর দিচ্ছে সংস্থাটি।
ঢাকায় কোটরার উপপরিচালক লি সাং-হুন (ড্যানিয়েল লি) বাসস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বাংলাদেশে অবকাঠামো ও নতুন শহর উন্নয়ন প্রকল্পে কোরীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরিতে কোটরা কাজ করছে।
গত মার্চে বাংলাদেশে নতুন শহর উন্নয়নে সহায়ক ছয়টি অবকাঠামো প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য কোটরা প্রায় ৩৫ লাখ মার্কিন ডলারের একটি সরকারের উন্নয়ন সহায়তা (ওডিএ) প্রকল্প চালু করেছে। আগামী তিন বছর এ প্রকল্পের কার্যক্রম চলবে।
আরও পড়ুন: ইসরাইলে নির্বাচন: ৮৫ শতাংশ ভোট গণনা শেষ, চূড়ান্ত ফলাফল দুই দিনে আসবে
লি বলেন, কোরিয়ার অর্থনৈতিক উদ্ভাবন অংশীদারত্ব কর্মসূচির (ইআইপিপি) আওতায় ন্যাশনাল স্পেশাল ইকোনমিক জোনের (এনএসইজেড) স্মার্ট সিটি উন্নয়নের জন্য পানি সরবরাহ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ই-লজিস্টিকস ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ খাত চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ উদ্যোগের মাধ্যমে অবকাঠামো, স্মার্ট সিটি, পরিবহন, রেলপথ, বন্দর, পানি ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) সহ উদীয়মান খাতে বাংলাদেশে কোরীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সংযোগ তৈরিতে কোটরার ভূমিকা আরো বাড়ছে।
‘আমরা কোরিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে ব্যবসা উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করি’Ñ এই মন্তব্য করেন লি। তিনি বলেন, কোরীয় কোম্পানির জন্য ক্রেতা খুঁজে বের করা, ব্যবসায়িক বৈঠকের আয়োজন, অবকাঠামো ও আইসিটি প্রকল্পের দরপত্রে অংশগ্রহণে সহায়তা ও বাংলাদেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে পরামর্শ দেয় কোটরা।
কোটরা এখনো বাংলাদেশে নিজস্ব কার্যালয় নেইÑ এমন কোরীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের ব্যবসা পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের বাজার পরিচালনার উদ্দেশ্যে শাখা কার্যালয় সেবাও দিয়ে থাকে বলে জানান তিনি।
আরও পড়ুন: ইসরায়েলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা: সরকার গঠনের তিন সম্ভাব্য পথ
সম্প্রতি নেওয়া একটি উদ্যোগের কথা তুলে ধরে লি বলেন, জুনে কোটরা ঢাকা এবং ঢাকায় নিযুক্ত কোরিয়া প্রজাতন্ত্রের দূতাবাস যৌথভাবে অবকাঠামো ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক একটি প্রদর্শনী ও মতবিনিময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে প্রায় ৪০টি কোরীয় কোম্পানি এবং বাংলাদেশের ২২টি সরকারি সংস্থা ও সরকারি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়।
উক্ত আয়োজনে পরিবহন, বিদ্যুৎ, পানি, স্মার্ট সিটি, ডিজিটাল সরকারব্যবস্থা, শিল্পের আধুনিকায়ন এবং তৈরি পোশাক খাতে বিধিবিধান মেনে চলাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
লি বলেন, এ ধরনের কর্মসূচির লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশের উন্নয়ন চাহিদার সঙ্গে কোরিয়ার প্রযুক্তি, বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ও বিনিয়োগ সক্ষমতার সমন্বয় ঘটানো।
তিনি জানান, কার্বন নিঃসরণ কমানো ও সবুজ প্রকল্পের পাশাপাশি নতুন শহর উন্নয়ন-সংশ্লিষ্ট সরকারি উন্নয়ন সহায়তা (ওডিএ) উদ্যোগ নিয়েও কোটরা কাজ করছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে টেকসই এবং প্রযুক্তিনির্ভর নগরায়নে কোরিয়ার বৃহত্তর আগ্রহের প্রতিফলন ঘটছে।
আরও পড়ুন: নির্বাচনে হারের মুখে আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগ লিকুদ পার্টির
বাংলাদেশে কোটরার কার্যক্রমের শিকড় তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশের সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করেন লি। তিনি স্মরণ করেন, ১৯৭৮ সালে কোরিয়ার দেউ কর্পোরেশন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি পোশাক খাতে প্রবেশ করে।
তখন বাংলাদেশের শ্রমিকরা কোরিয়ার উৎপাদনকেন্দ্রে গিয়ে সেলাইয়ের কৌশল ও কারখানা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন। পরে দেশে ফিরে তারা অর্জিত জ্ঞান স্থানীয় শিল্পে ছড়িয়ে দেন।
লির ভাষায়, এটিই ‘কোরিয়া এবং কোটরার বাংলাদেশে রেখে যাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার’। তার মতে, জ্ঞান এবং দক্ষতা হস্তান্তরের ওই প্রক্রিয়া বাংলাদেশে তৈরি পোশাকশিল্পের ভিত্তি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং দেশটিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হওয়ার পথ তৈরি করে।
পরবর্তী সময়ে তৈরি পোশাক খাতে কোরীয় বিনিয়োগ আরো বৃদ্ধি পায়। ইয়াংওয়ান কর্পোরেশনও যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগ করে এবং বাংলাদেশকে বড় ধরনের পোশাক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে অবদান রাখে।
আরও পড়ুন: শামা ওবায়েদের স্পেন ও ইইউর সহযোগিতার প্রশংসা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায়
চট্টগ্রামের কোরিয়ান রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (কেইপিজেড) কথাও উল্লেখ করেন লি। তিনি বলেন, প্রায় ৯৯২ হেক্টর এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা এই শিল্পাঞ্চল একটি স্থায়ী শুল্কমুক্ত শিল্পাঞ্চল।
‘বাংলাদেশে নিজ নামে একটি বিশেষ শিল্পাঞ্চল রয়েছে, এমন একমাত্র দেশ কোরিয়া’Ñ এই মন্তব্য করেন লি। তার মতে, কেইপিজেড দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রতীক।
বর্তমানে বাংলাদেশে কোটরার কার্যক্রম ভোক্তা পণ্য, সরকারি ক্রয়, সড়ক, পরিবহন, রেলপথ, বন্দর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, সবুজ ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রকল্প এবং সরকারি উন্নয়ন সহায়তা (ওডিএ)-সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন উদ্যোগসহ বিস্তৃত খাতে ছড়িয়ে পড়েছে।
লি বলেন, ব্যবসার সুযোগ চিহ্নিত করা, বাংলাদেশি ক্রেতা ও সরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি, ব্যবসায়িক বৈঠকের আয়োজন, স্থানীয় প্রদর্শনীতে কোরীয় প্যাভিলিয়ন পরিচালনা এবং বাংলাদেশে বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে কোরীয় কোম্পানিগুলোকে সহায়তা করে কোটরা।
আরও পড়ুন: "অসহিষ্ণু বক্তব্য রাজনীতিকে ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’-এ নিয়ে যেতে পারে": সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স
গত জুনে যমুনা ফিউচার পার্কে অনুষ্ঠিত ‘কে-গুডস ফিয়েস্তা ২০২৬’-এর উদাহরণ তুলে ধরেন তিনি। ওই আয়োজনের মাধ্যমে কোরিয়ার ভোক্তা পণ্য সরাসরি বাংলাদেশের ভোক্তা, আমদানিকারক ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পরিচিত করা হয়।
বাংলাদেশে কোরিয়ার অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার পরিমাণ কয়েকশ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ক্রমপুঞ্জীভূত বিনিয়োগ এবং শতাধিক কোরীয় কোম্পানির কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিফলিত হচ্ছে বলে জানান লি।
তবে তার মতে, দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের মূল্যায়ন শুধু বিনিয়োগের অঙ্ক দিয়ে করা উচিত নয়।
লি বলেন, ‘আমরা বরং এটিকে বেশি মূল্য দিই যে, কোরিয়া এই দেশে একটি পুরো শিল্পের ভিত্তি গড়ে উঠতে সহায়তা করেছে এবং আজও আমরা প্রতিবছর নতুন নতুন খাতে একই কাজ করে চলেছি।’
আরও পড়ুন: আনোয়ারায় কেইপিজেড ও চায়না ইকোনমিক জোন পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী
বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভবিষ্যতেও নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র চিহ্নিত করা এবং কোরীয় কোম্পানি ও প্রযুক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ তৈরিতে কোটরা কাজ করে যাবে বলে জানান তিনি। বিশেষ করে অবকাঠামো, নতুন শহর উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং সবুজ প্রকল্পকে এ ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন