০৯:০৭ এম
বাংলাদেশের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী? এর উত্তরে অনেকেই অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা করতে বলবেন, কেউবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির কথা বলবেন। কিন্তু আমাদের সকলের অলক্ষ্যে বর্তমানে একটি নতুন হুমকি দানা বাঁধছে। আমরা এই নতুন হুমকির বিষয়টি অনুভব করছি প্রতিটি মুহূর্তে। এই নতুন আপদ আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ এবং পারিবারিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে, অথচ আমরা এ সংকট থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজে পাচ্ছি না। আমরা মনে করছি, এটি আমাদের নিয়তি হয়ে গেছে। এই নতুন হুমকির মূল বিষয় হল সোশ্যাল মিডিয়ায় বটবাহিনীর সক্রিয়তা। ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা কারণে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। এই ডিজিটাল দুনিয়া এখন শুধুমাত্র মতপ্রকাশের ক্ষেত্রই নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, জনমত নির্মাণ, বাণিজ্যযুদ্ধ এবং এমনকি চরিত্রহননের এক নতুন ক্ষেত্রে রূপান্তরিত হয়েছে। সম্প্রতি, প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ দাবি করেছেন, দেশের সাইবার জগতের মোট ট্রাফিকের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই বট বা কৃত্রিম কার্যকলাপের দ্বারা সংকলিত। তিনি বলেন, এ বাস্তবতা না বুঝে সাইবার বুলিং বা অনলাইন প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ঝুঁকি থেকে যায়। সাম্প্রতিক সময়ের অনলাইন ট্রাফিক বিশ্লেষণের তথ্যে দেখা যায়, অনলাইনে মন্তব্য, প্রতিক্রিয়া এবং ইন্টারঅ্যাকশনের বড় অংশই প্রকৃত ব্যবহারকারীর নয়। অর্গানিক বনাম নন-অর্গানিক ট্রাফিক আলাদা করে চিহ্নিত করতে না পারলে সমস্যা মূল জায়গা চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমানে, এ বটবাহিনী এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে, তারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আক্রমণ হচ্ছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এবং ভালো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভুয়া জনমত তৈরি করছে। যেকোনো স্বনামধন্য ব্যক্তির বিরুদ্ধে পরিকল্পিত মিথ্যা অপপ্রচার করে তার ভাবমূর্তি নষ্ট করছে এবং নারীদের অবমাননা করে তাদের জীবন বিপন্ন করছে। এরা সংখ্যা খুব বেশি নয়, কিন্তু তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার করে তারা নিজেদের পক্ষে একটা বায়বীয় অনুগত বাহিনী তৈরি করেছে, যা জনগণ নয় বরং বট বা রোবট। বট আসলে কী? বট কথাটি এসেছে রোবট থেকে। এটি মূলত একটি সফটওয়্যার প্রোগ্রাম, যা ইন্টারনেটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষের মতো আচরণ করার জন্য তৈরি করা হয়। যখন কয়েক হাজার বা লক্ষাধিক ভুয়া প্রোফাইলকে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তখন তাকে বলা হয় বট আর্মি বা বটবাহিনী। যেমন, নির্দিষ্ট কাউকে গালি দেওয়া, প্রোপাগান্ডা ছড়ানো বা কারো প্রশংসা করা। এরা মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে। একটি হল অটোমেটেড এবং অপরটি হল হিউম্যান ট্রল আর্মি। অটোমেটেড বা স্বয়ংক্রিয় প্রকারের বটগুলো হলো সম্পূর্ণ কম্পিউটারচালিত। যখনই তারা নির্দিষ্ট যে কোনো কি-ওয়ার্ড দেখবে, তখনই তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মন্তব্য করে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা দেশের নাম লিখে পোস্ট করেন, তাহলে প্রোগ্রাম করা বটগুলো সঙ্গে সঙ্গে সেখানে গিয়ে আগে থেকে সেট করা মন্তব্য পেস্ট করে দেবে। বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাথে যুক্ত বটগুলো আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। তারা কেবল কপি-পেস্ট নয়, বরং মানুষের মতো করে এসে প্রাসঙ্গিক এবং আলাদা আলাদা মন্তব্য লিখতেও সক্ষম। অপরদিকে, হিউম্যান ট্রল আর্মি আসলে মানুষ, কিন্তু তারা ভুয়া আইডি ব্যবহার করে। এদের টাকা দিয়ে বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নিয়োগ করা হয়ে থাকে। একেকজন মানুষ ১০-২০টি আইডি নিয়ন্ত্রণ করে। যখন নির্দেশ পেয়ে যায়, তখন তারা নির্দিষ্ট লিংকে গিয়ে দল বেঁধে আক্রমণে লিপ্ত হয়। প্রযুক্তিগতভাবে এরা বট না হলেও সাধারণ মানুষের কাছে এরা বটবাহিনী নামেই অধিক পরিচিত। এই বটবাহিনী সাধারণত তিনটি কৌশলে কাজ করে। প্রথমত, যেকোনো একটি ঘটনা ঘটার পর জনমত কোন দিকে যাবে, তা এরা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। শত শত পজিটিভ বা নেগেটিভ মন্তব্য করে সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। দ্বিতীয়ত, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্মানহানি করতে এদের লেলিয়ে দেওয়া হয়। যখন হাজার হাজার ভুয়া আইডি থেকে একই ভাষায় গালি বা অপবাদ দেওয়া হয়, তখন সাধারণ মানুষ সেটিকে সত্যি বলে মনে করে। তৃতীয়ত, কোনো পেজ বা আইডি বন্ধ করে দেওয়ার জন্য এরা একসঙ্গে হাজার হাজার রিপোর্ট করে। ফলে ফেসবুক বা অন্য মাধ্যমের অ্যালগরিদম বিভ্রান্ত হয়ে গিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইডিটি ব্লক করে দেয়। মেটা বা ফেসবুকের ভাষায় এ ধরনের কাজকে কোঅর্ডিনেটেড ইনঅথেনটিক বিহেভিয়ার বলা হয়। তাহলে কীভাবে বট চেনা যায়? বট শনাক্ত করার কিছু পেশাদার উপায় রয়েছে। যেমন, কোনো নিউজ বা পোস্ট যখন পাবলিশ হওয়ার মাত্র ৫ সেকেন্ডের মধ্যে যদি ১০০ বা তার বেশি মন্তব্য চলে আসে, তবে যেনে নেওয়া যায় যে এটি বটের কাজ। কেননা একজন রক্তমাংসের মানুষের পক্ষে এত দ্রুত পড়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়। আবার ১০-১৫ জন আলাদা মানুষের মন্তব্য যদি হুবহু একই রকম থাকে, তখন বুঝতে হবে তা বটের কাজ। এর বাইরে, বটদেও আইডিতে সাধারণত কোনো ব্যক্তিগত জীবন বা আসল পরিচয় থাকে না। প্রোফাইল পিকচার হয়ে থাকে কোনো সেলিব্রিটির ছবি, ফুল অথবা পাখির ছবি। টাইমলাইনে নিজের কোনো পোস্টের পরিবর্তে কেবল শেয়ার করা পোস্ট থাকে এবং আইডির ফলোয়ার বা ফ্রেন্ডলিস্টে অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। দেশের জন্য হুমকি- বটবাহিনী গণতন্ত্রের জন্য বর্তমানে বড় হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে। তারা সত্যকে মিথ্যা ও মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রচার করতে সক্ষম। সরকারের কোনো ভালো সিদ্ধান্ত তারা পরিকল্পিতভাবে বিতর্কিত করতে পারে। সরকারের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির উক্তি তারা বিকৃত করে প্রচার করে জনগণের কাছে তার মর্যাদা হত্যার চেষ্টা করতে পারে। কোনো রাজনৈতিক ঘটনা, আন্দোলন বা সংবেদনশীল সংবাদ প্রকাশের পর মুহূর্তেই হাজার হাজার অভিন্ন মন্তব্য, একই ধরনের ভাষা ও একই সুরের প্রচারণা দেখা যায়। এতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের অনেকেই মনে করেন, যেন পুরো সমাজ একটি নির্দিষ্ট মতের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছে। অথচ বাস্তবে এ জনমতের ঢেউয়ের একটি বড় অংশই কৃত্রিম সেটি। বিশেষ কাউকে বা প্রতিষ্ঠানের সম্মানহানি করার জন্য এদের লেলিয়ে দেওয়া হয়। যখন হাজার হাজার ভুয়া আইডি থেকে একই ভাষায় গালিগালাজ বা অপবাদ দেওয়া হয়, তখন সাধারণ মানুষ অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়ে সেটিকে সত্যি মনে করে। এটি অনেক সময় ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার বা তথ্যযুদ্ধ হিসেবে পরিচিত। আমাদের সমাজে ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি বা তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি এখনো দুর্বল কারণে বটনির্ভর প্রচারণা খুব সহজেই মানুষের আবেগ, রাজনৈতিক বিশ্বাস ও সামাজিক বিভাজনকে প্রভাবিত করতে পারে। এই বটবাহিনীর উল্লেখযোগ্য শক্তি কেবল প্রযুক্তি নয়, বরং মানুষের মনস্তত্ত্ব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন শত শত অভিন্ন মন্তব্য দেখা যায়, তখন সাধারণ ব্যবহারকারীর মনে এমন ধারণা তৈরি হয় যে এটি হয়তো সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট’। রাজনৈতিক যোগাযোগের ভাষায় এর নাম ‘অ্যাস্ট্রোটার্ফিং’; অর্থাৎ কৃত্রিমভাবে এমন পরিবেশ তৈরি করা, যাতে মনে হয় এটি স্বতঃস্ফূর্ত জনমত। প্রকৃতপক্ষে, এটি একধরনের ডিজিটাল প্রতারণা। এমনকি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মব তৈরির আগে সোশ্যাল মিডিয়াতে তাকে বিতর্কিত বা হত্যাযোগ্য করার কাজটিও বটের মাধ্যমে করা হয়। বাংলাদেশের বটবাহিনীর দাপট- বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই কৌশল বর্তমানে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রথমে ডিপফেক বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট উৎপন্ন করা হচ্ছে, পরে সেটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে বট ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় পরিণত হচ্ছে, যেখানে তথ্যের চেয়ে প্রোপাগান্ডা অধিক প্রভাবশালী। এই বট সংস্কৃতি সমাজে বিষাক্ততা বাড়াচ্ছে, মতপ্রকাশের পরিবেশ সংকুচিত করছে এবং তথ্যের প্রতি মানুষের আস্থা ধ্বংস করছে। গণতন্ত্র শুধুমাত্র ভোটের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; এটি দাঁড়িয়ে আছে মুক্ত মতপ্রকাশ, সত্য তথ্য এবং সচেতন নাগরিকের ওপর। হরতাল, সহিংসতা বা প্রতিপক্ষের কণ্ঠরোধ যেভাবে গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর, ঠিক একইভাবে কৃত্রিম জনমত তৈরির এই ডিজিটাল সংস্কৃতিও সমান বিপজ্জনক। কারণ এটি মানুষের স্বাধীন চিন্তাশক্তিকে প্রভাবিত করে এবং বিভ্রান্তিকে সত্যের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। এই সংকট মোকাবেলার জন্য কয়েকটি একটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, মেটা, গুগলসহ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে বাংলা ভাষা ও স্থানীয় বাস্তবতায় বোঝার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। বাংলাদেশের জন্য এখনই মেটা, গুগলসহ সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়ার প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে। তারা যেন বাংলাদেশে অফিস কার্যক্রম শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, সংঘবদ্ধ ডিজিটাল অপপ্রচার ও ট্রল ফার্মের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। অবিলম্বে এই আইনগুলো প্রণয়ন করা দরকার। এরপরেও যদি এই ব্যবস্থা করা না হয়, তবে দেশের গণতন্ত্র ক্ষতির শিকার হবে। জনমত প্রতিষ্ঠার পন্থাগুলো বাধাগ্রস্ত হলে আইন ও বিচার খুবই দুর্বল হয়ে পড়বে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি। দেশের স্কুল ও কলেজগুলোতে থেকেই তথ্য যাচাই, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং দায়িত্বশীল অনলাইন আচরণের শিক্ষা দিতে হবে। সরকারকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, দেশের জনগণের অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে, নাকি বটবাহিনীর কাছে জিম্মি হয়ে থাকবে তথ্য অধিকার।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন