০৮:৫৮ এম
আজম উদ্দিন স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি বগুড়া সিটি করপোরেশনের জলেশ্বরীতলার একটি বাসায় পরিবারসহ বসবাস করেন। এই এলাকা অভিজাত হিসেবে পরিচিত। গত শনিবার রাতে জ্বর অনুভব করেন আজম উদ্দিন। একই সঙ্গে তাঁর স্ত্রী মৌসুমি আক্তার এবং মেয়ে আরাফি জান্নাতও জ্বরে আক্রান্ত হন। পরদিন পরীক্ষা করার পর তিনজনের শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। এরপর সবাই ভর্তি হন সরকারি মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে।
গতকাল সোমবার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১৯ ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে এই তিনজন একই পরিবারের সদস্য। আজম উদ্দিন অভিযোগ করেন, ‘আমি অভিজাত এলাকায় বসবাস করি। অথচ সেখানেই এডিস মশার উপদ্রব!’ তিনি বলেন, মশা নিধনে নিয়োজিত কর্মীরা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করেন না। গত এক সপ্তাহে তাঁর এলাকায় মশা নিধনের জন্য কাউকে দেখা যায়নি।
একই হাসপাতালে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি ছিলেন নগরীর মালতিনগরের নাসিমা আক্তার ও শয়ন কুমার, সূত্রাপুরের সাথী আক্তার। নাসিমা জানান, বাসার পাশে খোলা নালা রয়েছে। সেখানে মশার জন্ম হচ্ছে, কিন্তু মশা নিধনের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
আরও পড়ুন: সার ও বীজে কারসাজি করলে কঠোর ব্যবস্থা, কর্মকর্তাদের বাজার মনিটরিংয়ের নির্দেশ ঝালকাঠির জেলা প্রশাসকের
গত রোববার সরকারি মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের ১৯ জন ছাড়াও শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে ৩৮ জন, টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৩ জন, শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৭ জন এবং ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৬ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। সব মিলিয়ে এই সংখ্যা ৯৩।
শজিমেক হাসপাতালে সর্বাধিক রোগী ভর্তি হয়েছেন। গত মে মাস থেকে রোববার পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৭১৩ জন। তাদের মধ্যে দুজন মারা গেছেন। উপজেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেশি ধুনট ও শেরপুরে। একই সময়ে ধুনটের ২২২ জন এবং শেরপুরে ১৮৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
শেরপুরের খন্দকারপাড়ার বাসিন্দা সাধন কুমার জানান, তাঁর এলাকায় ৫ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে মশা নিধনে পৌর কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ছে না।
শেরপুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর নিমাই ঘোষ বলেন, উপজেলা পর্যায়ের পৌরসভায় মশা নিধনে বরাদ্দ থাকে সামান্য। এ অর্থে বছরে দু-একবার কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব।
আরও পড়ুন: কক্সবাজারে ড্যাবের বিভাগীয় সাংগঠনিক টিমের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত
মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের আরএমও ডা. রাশেদুল ইসলাম রনি জানান, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখানে ডেঙ্গু কর্নার খোলা হয়েছে। হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হচ্ছে। কিন্তু বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগী আসছে। এসব এলাকায় মশা নিধনে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, বগুড়া নগরীর জলেশ্বরীতলা, মালতিনগর, সূত্রাপুর, রহমাননগর, মফিজ পাগলার মোড়, পিটিআই মোড় এলাকা থেকেই রোগী বেশি আসছে। এ কারণে এসব এলাকাকে ডেঙ্গুর হটস্পট বলা যায়।
জানা গেছে, সিটি করপোরেশন এবার মশা নিধনে ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ করেছে। কিন্তু সে তুলনায় কার্যক্রম নেই। বাসিন্দাদের অভিযোগ, মশা নিধনকর্মীরা ডিসি-এসপিসহ সরকারি কর্মকর্তাদের বাসভবনে কাজ করেন। ২১ নম্বর ওয়ার্ডের মানিকচক এলাকার আনোয়ার হোসেন জানান, তাদের এলাকা সিটি করপোরেশনে পড়লেও কোনোদিন মশা নিধন কার্যক্রম দেখেননি। এই ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর লুৎফর রহমানের দাবি, ‘আমরা পৌরসভার দায়িত্বে থাকাকালে একাধিকবার বলেছি বর্ধিত এলাকায় মশা নিধনের উদ্যোগ নিতে। কিন্তু আমাদের কথা রাখা হয়নি।’
সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, বছরে তারা অন্তত ২৫০ লিটার মশার ওষুধ ব্যবহার করেন। ২১টি ওয়ার্ডে ওষুধ ছিটাতে ফগার মেশিন রয়েছে ৫০টি। মশক নিধন কার্যক্রমের সময় প্রতি ওয়ার্ডে তিন লিটার বরাদ্দ হয়। প্রয়োগের জন্য ওয়ার্ডপ্রতি বরাদ্দ হয় ৩০০ লিটার ডিজেল ও ১০০ লিটার অকটেন। ওয়ার্ডপ্রতি দায়িত্ব পালন করেন তিনজন কর্মচারী। সম্প্রতি সবকিছুর পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। গত অক্টোবরে ফগার মেশিনের জন্য ২৩ লাখ টাকার ওষুধ কেনা হয়েছে। তবে ৫০টি ফগার মেশিনের মধ্যে ২০টি নষ্ট হয়ে গেছে। ৬০টি হ্যান্ড মেশিনের মধ্যে ২২টি নষ্ট।
মশা নিধনে নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হয় বলে দাবি করেন সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য পরিদর্শক আবু বক্কর সিদ্দিক। তিনি জানান, সিটি করপোরেশন হওয়ার পর থেকে মশা নিধন কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে যেসব কর্মী কাজে গাফিলতি করবেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন: রংপুরে ভূমিহীনদের খাসজমির অধিকার আদায়ের দাবি
ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় কয়েকটি হাসপাতালের যথেষ্ট সক্ষমতা আছে বলে জানান জেলার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. ফারজানুল ইসলাম। তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগী যাতে না বাড়ে, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। উপজেলা পর্যায়েও মশা নিধন ব্যবস্থায় গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এমআর ইসলাম স্বাধীন সমকালকে বলেন, ‘আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। মশা নিধনে বাজেটও বাড়ানো হয়েছে। নাগরিকরা যত্রতত্র ময়লা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখলে মশা উৎপাদন হবে। এ বিষয়ে সবারই সচেতন হতে হবে।’
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন