১০:১৭ এম
রাশিয়ার একটি অন্যতম পরিচিত স্বাধীন সংবাদপত্র ‘নোভায়া গেজেতা’ বন্ধ হতে চলেছে। পত্রিকাটি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে এবং আগামী ৯ নভেম্বর তারা তাদের কার্যালয় ত্যাগ করবে এবং সার্ভার বন্ধ করে দেবে। সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, রুশ কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তা সংস্থার চাপের কারণে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, যা সরকারের সমালোচনা, দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য পরিচিত।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) কার্যালয়ের জিনিসপত্র গুছিয়ে সরানোর কাজ চলছিল। চারপাশে পিচবোর্ডের বাক্স এবং প্লাস্টিকের ব্যাগ ছড়িয়ে ছিল। মস্কোর এই কার্যালয়টি প্রায় ৩০ বছর ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। অনুসন্ধানী সাংবাদিক আনা পলিতকভস্কায়ার স্মৃতির জিনিসপত্রও সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যিনি ২০০৬ সালে নিজের অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে গুলিতে নিহত হন।
পত্রিকাটির সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী দিমিত্রি মুরাতভ বলেছেন, কর্তৃপক্ষ তাদের কাজ বন্ধ করে দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে। তিনি বলেন, “কাউকে হত্যা করার অনেক উপায় আছে। তারা আমাদের শ্বাসরোধ করে মারার পথ বেছে নিয়েছে।” পত্রিকাটির অভিযোগ, প্রথমে তাদের ওয়েবসাইট বন্ধ করা হয়, এরপর ছাপা পত্রিকার প্রকাশনা নিষিদ্ধ করা হয় এবং গণমাধ্যমের নিবন্ধন বাতিল করা হয়। সাংবাদিকদের ‘বিদেশি এজেন্ট’ হিসেবে ঘোষণা করার ঘটনাও ঘটেছে।
আরও পড়ুন: চীনে প্রতিষ্ঠানের ঋণচাপে সংকট
নোভায়া গেজেতা জানিয়েছে, পাঠকদের অনুদান গ্রহণের ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে সংবাদমাধ্যমটির আয় করার পথ সংকুচিত হয়েছে। কার্যালয় ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশের পাশাপাশি আর্থিক সহায়তার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে পত্রিকাটির সম্পাদকীয় দল।
২০২১ সালে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় অবদানের জন্য মুরাতভ নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। তবে ২০২৩ সালে রুশ কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘বিদেশি এজেন্ট’ হিসেবে ঘোষণা করে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে নোভায়া গেজেতাকেও একই পরিচয় দেওয়া হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, রাশিয়ায় সরকারের সমালোচক সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে এই পরিচয় ব্যবহার করা হচ্ছে।
নোভায়া গেজেতা দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সরকারি কর্মকর্তা ও আমলাদের ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। পত্রিকাটির দাবি, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাদের ছয়জন সহকর্মী নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে আনা পলিতকভস্কায়া অন্যতম। চেচনিয়ার যুদ্ধ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য পরিচিত এই সাংবাদিককে ২০০৬ সালের অক্টোবরে হত্যা করা হয়।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার হামলা শুরু হওয়ার পর দেশটিতে স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর চাপ আরও বেড়েছে। যুদ্ধ ও সরকারের সমালোচনাকারীদের শাস্তি দেওয়ার সুযোগ রেখে আইন প্রণয়ন করা হয়। ওই বছরের মার্চে নোভায়া গেজেতা রাশিয়ায় ছাপা সংস্করণের প্রকাশনা স্থগিত করে। পরে পত্রিকাটির অনেক সাংবাদিক দেশ ছেড়ে যান এবং লাটভিয়ায় ‘নোভায়া গেজেতা ইউরোপ’ নামে একটি আলাদা সংবাদমাধ্যম গড়ে তোলেন, যা রাশিয়ার বাইরে থেকে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: ইরান: যুক্তরাষ্ট্রেকে একতরফা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মনোভাব বাদ দিতে হবে
চলতি বছরের এপ্রিলে পত্রিকাটির কার্যালয়ে তল্লাশি চালিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিক ওলেগ রলদুগিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত তথ্য বেআইনিভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছে। পরে পত্রিকাটির বর্তমান প্রধান সম্পাদক সের্গেই সোকোলভের বাড়িতেও তল্লাশি চালানো হয় এবং তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পত্রিকাটির মতে, এসব পদক্ষেপ তাদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ আরও সীমিত করেছে।
নোভায়া গেজেতা তাদের বিদায়ী বিবৃতিতে বলেছে, রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য করেছে। সংবাদমাধ্যমটি অভিযোগ করেছে, দেশে মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রচেষ্টাকে অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে রুশ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
পত্রিকাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও মুরাতভ বলেছেন, তাঁরা নিজেদের মূল্যবোধ ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। তাঁর মতে, মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার ও মানবাধিকার রাষ্ট্রের অধিকারের চেয়ে বড়। নোভায়া গেজেতার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া রাশিয়ায় স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর চাপ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে চলমান উদ্বেগকে আরও সামনে এনেছে। তথ্যসূত্র: বিবিসি
আরও পড়ুন: মালদ্বীপে সার্ক সম্মেলনে বাংলাদেশের ৩১ প্রতিনিধি অংশগ্রহণ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন