১২:২০ পি.এম
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত যখন ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে, তখন এই পরিস্থিতিতে নতুন নতুন সামরিক প্রযুক্তি ও অস্ত্রের সক্ষমতা সামনে আসছে। এ প্রেক্ষাপটে ইরানের তৈরি ‘খেইবার শেকান’ ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে মার্কিন সামরিক মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের প্রকাশিত দাবির ভিত্তিতে, এই ক্ষেপণাস্ত্রটির কৌশলগত সক্ষমতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম এশিয়ায় মোতায়েন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এটি যথেষ্ট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি, মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’র প্রতিবেদনে একজন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ইরান মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলার কৌশলে পরিবর্তন করেছে। এর মধ্যে খেইবার শেকানসহ বিভিন্ন ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে তেহরান। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার হিসাবে, এই ক্ষেপণাস্ত্রটি লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি গমন করার সময় গতিপথ পরিবর্তন করার সক্ষমতা রাখে, যা প্রচলিত ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে একটি নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠছে।
কী এই খেইবার শেকান?
আরও পড়ুন: নিকাহ রেজিস্ট্রারদের অধিকার নিশ্চিতের জন্য ৫ দফা দাবি উত্থাপন
ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ক্ষেপণাস্ত্র বহরে ২০২২ সালে খেইবার শেকান যুক্ত হয়েছিল। এটি কঠিন জ্বালানিচালিত স্বল্প থেকে মধ্যপাল্লার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। বিভিন্ন পশ্চিমা ও প্রতিরক্ষা সূত্র অনুযায়ী, এর পাল্লা প্রায় ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার বা তারও বেশি হতে পারে।
এই ক্ষেপণাস্ত্রটির নামের সঙ্গে ইসলামের ইতিহাসের একটি প্রসঙ্গ রয়েছে। ‘খেইবার’ নামটি সৌদি আরবের ঐতিহাসিক খাইবর অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত। ইরানের ভাষ্যমতে, নামটি ঐতিহাসিক সামরিক বিজয়ের প্রতীক হিসেবে ভূমিকা পালন করে।
খেইবার শেকানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর কঠিন জ্বালানি প্রযুক্তি। তরল জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এই ধরনের অস্ত্র দ্রুত উৎক্ষেপণ করা সম্ভব এবং দীর্ঘ সময় ধরেও প্রস্তুত অবস্থায় রাখা অনেক বেশি সহজ। এ কারণে যুদ্ধক্ষেত্রে এগুলোকে মোতায়েন ও দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করার সুবিধা রয়েছে।
কেন মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য এটি একটি চ্যালেঞ্জ?
আরও পড়ুন: দেবিদ্বারে বিএনপির পাল্টাপাল্টি সভা, এমপি রাশেদা বেগম হীরার গাড়িবহরে হামলা
ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সাধারণত একটি নির্দিষ্ট গতিপথ অনুসরণ করে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগোয়। এজন্য প্যাট্রিয়ট বা থাডের মতো আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাডারের মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ শনাক্ত করে সেটিকে এ সময়ে ধ্বংস করার চেষ্টা করতে পারে।
কিন্তু কিছু আধুনিক ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শেষ পর্যায়ে গিয়ে গতিপথ পরিবর্তন বা কৌশলগত ম্যানুভার করতে সক্ষম। খেইবার শেকানের ক্ষেত্রেও এমন একটি সক্ষমতা রয়েছে বলে দাবি করেছেন ইরানি কর্মকর্তারা এবং কিছু প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক।
মার্কিন সামরিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইরান কখনো কখনো ড্রোনের পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালায়। এতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর একসাথে একাধিক লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত এবং প্রতিহত করার চাপ সৃষ্টি হয়।
কঠিন জ্বালানির সুবিধা
আরও পড়ুন: নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানের জন্য পিকেএসএফ-এর ২,৫০০ কোটি টাকা বিতরণ
খেইবার শেকানের কঠিন জ্বালানি প্রযুক্তি ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সুবিধা তৈরি করেছে। তরল জ্বালানি ব্যবহারকারী ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের জন্য জ্বালানি ভরার প্রয়োজন হয়, যা প্রস্তুতির সময় বৃদ্ধি করে এবং সরঞ্জাম ও জনবলের প্রয়োজনও বেশি হয়।
অন্যদিকে, কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র তুলনামূলক দ্রুত উৎক্ষেপণ করা সম্ভব। একইসাথে এগুলো মোবাইল লঞ্চারের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর করাও সহজ। ফলে শত্রুপক্ষের গোয়েন্দা নজরদারি এড়িয়ে অবস্থান পরিবর্তন করার সুযোগ বাড়ে।
খরচের লড়াইও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে শুধুমাত্র সামরিক সক্ষমতার দিক দিয়ে নয়, অর্থনৈতিক হিসাবও একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের দাম অনেক বেশি হতে পারে।
আরও পড়ুন: হাসিনার কাছে জানতে চাইলেন রিজভী
প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ফলে অপেক্ষাকৃত কম খরচের আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
চীনা প্রযুক্তি নিয়ে মার্কিন উদ্বেগ
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় চীনা প্রযুক্তি বা স্যাটেলাইটভিত্তিক নেভিগেশন ব্যবস্থার ব্যবহার নিয়ে পশ্চিমা মহলে আলোচনা রয়েছে। তবে ইরানের খেইবার শেকান ক্ষেপণাস্ত্রের নির্ভুলতা সরাসরি চীনের বেইদু ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল—এমন দাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য সীমিত।
একইভাবে ইরানকে চীন থেকে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ এবং পাকিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করে এসব অস্ত্র ইরানে পৌঁছানোর যে দাবি বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে, সেগুলোর অনেকটিই স্বাধীনভাবে নিশ্চিত নয়।
আরও পড়ুন: গুগল ওয়াইওমিংয়ে ১৭ বিলিয়ন ডলারে ডেটা সেন্টার নির্মাণ করছে
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে নতুন সমীকরণ
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে মার্কিন উদ্বেগের পেছনে অতিরিক্ত একটি কারণ হলো দেশটির দীর্ঘদিনের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি। ড্রোন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বিত ব্যবহার ইরানের হামলার কৌশলকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোতে প্যাট্রিয়ট, থাডসহ বিভিন্ন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে। কিন্তু প্রতিটি হামলা প্রতিহত করতে ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করতে হলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে মজুদ ও অর্থ—দুই দিক থেকেই চাপ বাড়তে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে, খেইবার শেকান শুধু একটি ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে আক্রমণ ও প্রতিরক্ষার ব্যয়ের হিসাব পরিবর্তন করার একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবেও অবহিত হচ্ছে। তথ্যসূত্র: দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
আরও পড়ুন: ইসরাইলের প্রতি অন্ধ সমর্থনেই রিপাবলিকানদের ভরাডুবি: জেডি ভ্যান্স
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন