০৯:০২ পি.এম
জোর করে বাসে যাত্রী তোলা, রোগীবাহী যান আটকে দেওয়ার অভিযোগ; ক্ষোভে দুই দিন ধরে বন্ধ বাস চলাচল
বরিশালের চরকাউয়া রুটে দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে বাস মালিক সমিতির একচ্ছত্র আধিপত্য, খামখেয়ালিপনা ও কথিত পরিবহন সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। নিজেদের বাস ছাড়া অন্য কোনো যানবাহনে যাত্রী পরিবহনে বাধা দেওয়া, অটোরিকশা কিংবা রিকশা থেকে জোরপূর্বক যাত্রী নামিয়ে বাসে তুলতে বাধ্য করা এবং জরুরি প্রয়োজনে অসুস্থ রোগী বহনকারী যানবাহন আটকে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে চরকাউয়া বাস মালিক সমিতির সদস্য ও সংশ্লিষ্ট বাস শ্রমিকদের বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এই রুটে পরিবহন ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে রেখেছে। সাধারণ মানুষ কোথায় যাবেন, কোন যানবাহনে যাতায়াত করবেন, এমনকি জরুরি প্রয়োজনে কীভাবে রোগী নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছাবেন, সেসব ক্ষেত্রেও বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। ফলে জনসাধারণের স্বাভাবিক চলাচলের অধিকার নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চরকাউয়া রুটে বাস মালিক সমিতির সদস্যরা নিজেদের বাস ছাড়া অটোরিকশা, মাহিন্দ্রা, রিকশা ও ভ্যানসহ অন্যান্য যানবাহনে যাত্রী পরিবহনে বাধা দেন। কোনো যাত্রী নিজস্ব প্রয়োজন, সুবিধা কিংবা সময় বাঁচানোর জন্য এসব যানবাহনে উঠলে তাকে জোরপূর্বক নামিয়ে বাসে উঠতে বাধ্য করা হয়।
এমন পরিস্থিতিতে যাত্রীরা চাইলেও নিজেদের পছন্দ ও প্রয়োজন অনুযায়ী যানবাহন নির্বাচন করতে পারছেন না। বিশেষ করে স্বল্প দূরত্বের যাত্রী, নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং অসুস্থ মানুষকে নিয়ে চলাচলকারীদের বাড়তি ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি নির্দিষ্ট রুটে বাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকলেই কি অন্য বৈধ যানবাহনে যাত্রী পরিবহনের পথ বন্ধ করে দেওয়া যায়? পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব কোনো সমিতিকে দেওয়া হলেও সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার তাদের কে দিয়েছে?
*রোগীবাহী যানবাহন আটকে দেওয়ার অভিযোগ, মানবিকতা নিয়েও প্রশ্ন*
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ উঠেছে অসুস্থ রোগী পরিবহন নিয়ে। ভুক্তভোগীদের দাবি, জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য ভাড়া করা ভ্যান, রিকশা কিংবা অটোরিকশাকেও চরকাউয়া খেয়াঘাট পর্যন্ত যেতে বাধা দেওয়া হয়।
একজন অসুস্থ মানুষকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলেও যদি যানবাহন আটকে দেওয়া হয়, তাহলে তা শুধু পরিবহনসংক্রান্ত বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং জনস্বাস্থ্য ও মানবিক দায়িত্ববোধের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয়দের মতে, রোগীর জীবন রক্ষার প্রয়োজনীয়তা কোনো পরিবহন সমিতির স্বার্থের চেয়ে বড়। সেখানে রোগীবাহী যানবাহন আটকে দেওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
*প্রতিবাদ করলেই অপমান-অপদস্থ ও মারধরের অভিযোগ*
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গেলেই অটোরিকশাচালক ও সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়। কখনো রাস্তায় আটকে অপমান-অপদস্থ করা হয়, আবার কখনো শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও মারধরের ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চরকাউয়া বাস স্টাফদের কথিত সিন্ডিকেটের প্রভাব এতটাই বিস্তৃত যে তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতেও অনেকে ভয় পান। কেউ অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে তাকে বিভিন্নভাবে হেনস্তার শিকার হতে হয় বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
এমন অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বিরোধ নয়, বরং সড়কে আইন প্রয়োগ, নাগরিক অধিকার এবং জননিরাপত্তার বিষয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
একটি পরিবহন সমিতি কিংবা তার সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের চলাচলের অধিকার নিজেদের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ থাকার কথা নয়। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চলার অভিযোগ স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়িয়ে তুলছে।
দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, পরিবহনসংক্রান্ত বিরোধ এবং কথিত সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের প্রতিবাদে গত দুই দিন ধরে চরকাউয়া থেকে বিভিন্ন রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন অটোরিকশা শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা বিভিন্ন স্থানে গাছ ফেলে সড়ক অবরোধ করে বাস চলাচল বন্ধ করে দেন। এতে সংশ্লিষ্ট রুটে বাস চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে।
দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এই অবরোধের ঘটনা সামনে এসেছে। তবে বাস চলাচল বন্ধ থাকায় সাধারণ যাত্রীরাও নতুন করে দুর্ভোগে পড়েছেন। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ীসহ প্রতিদিন যাতায়াতকারী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে বিকল্প পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
পরিবহন ব্যবস্থার এমন অচলাবস্থায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। একদিকে বাস চলাচল বন্ধ, অন্যদিকে বিকল্প যানবাহন চলাচল নিয়েও দীর্ঘদিনের অভিযোগ। সব মিলিয়ে চরকাউয়া রুটে স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যবস্থা কার্যত সংকটের মুখে পড়েছে।
আরও পড়ুন: নান্দাইলে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটে ট্রাকে আগুন, শহর বিদ্যুৎহীন
স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রায় দুই দশক ধরে যদি একটি রুটে পরিবহন নিয়ন্ত্রণ, যাত্রী হয়রানি, অন্য যানবাহনে বাধা এবং রোগীবাহী যান আটকে দেওয়ার মতো অভিযোগ চলতে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কোথায়?
পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সড়কে বৈধ যানবাহনের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষের। কোনো সমিতি বা গোষ্ঠীর প্রভাবের কারণে সাধারণ মানুষ যেন তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষ করে রোগীবাহী যানবাহন চলাচলে বাধা দেওয়ার অভিযোগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি যাত্রীদের জোরপূর্বক বাসে উঠতে বাধ্য করা, অটোরিকশাচালকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং মারধরের অভিযোগগুলোও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।
চরকাউয়া রুটের ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিনের কথিত পরিবহন সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের দাবি, কোনো নির্দিষ্ট সমিতি বা গোষ্ঠীর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী সব বৈধ যানবাহনের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে রোগীবাহী যানবাহন আটকে দেওয়া, যাত্রীদের জোরপূর্বক বাসে উঠতে বাধ্য করা, অটোরিকশাচালকদের হেনস্তা ও মারধরের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
ভুক্তভোগীদের প্রত্যাশা, প্রশাসন দ্রুত সরেজমিনে তদন্ত করে চরকাউয়া রুটের প্রকৃত পরিস্থিতি উদ্ঘাটন করবে এবং দীর্ঘদিনের এই পরিবহন সংকটের স্থায়ী সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
সাধারণ মানুষের চলাচলের অধিকার কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা পরিবহন সমিতির ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণাধীন হতে পারে না। জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চরকাউয়া রুটে আইনসম্মত, নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি এখন স্থানীয়দের।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন