০৮:৫৬ এম
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতার বিরোধিতার জন্য একাধিকবার প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে দেওয়া ক্ষমা চাওয়ার ইঙ্গিত দিলেও, দলগতভাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অনুশোচনা প্রকাশ’ বা ‘ক্ষমা প্রার্থনা’ করেনি। স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থান এবং হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগে দলটির ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও জনপরিসরে অনেক দিন ধরেই বিতর্ক উঠেছে।
বাংলা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যের পর এই বিষয়টি নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার জন্য জামায়াতের জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল।’ এর জবাবে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘আমরা অপরাধ করিনি, ক্ষমা চাইব কেন?’
এদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিভিন্ন দলের নেতারা মনে করছেন, জামায়াতের অতীতের দায়, ক্ষমা প্রার্থনা, বিচার এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ—সবকিছুই পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। কেউ বলছেন, নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা জরুরি; আবার কেউ মনে করছেন, শুধু ক্ষমা নয়, বিচারও হতে হবে। কেউ কেউ বলছেন, দলটির নামই তাদের ঐতিহাসিক দায় বহন করছে।
আরও পড়ুন: দেশে সারের সংকট নেই, ভবিষ্যতেও হবে না : কৃষিমন্ত্রী
জাতীয় সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বিএনপি নিয়ে সমালোচনার আগে আপনাদের নিজেদের দিকে একবার ফিরে তাকানো দরকার। এজন্য তাকানো দরকার যে ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য একবারও তো ক্ষমা প্রার্থনা করলেন না। জাতির সামনে আপনাদের ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত ছিল। এটা করলে কিন্তু আজকের এই সমস্যা হয় না।’
তিনি বলেন, ‘আপনারা নিজেদের দিকে তাকান, আর বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করুন। জামায়াতের নেতা প্রফেসর গোলাম আজম তখন বলেছিলেন, ১৯৭১ সালে আমরা ভুল করিনি। আমার মনে হয় এখনো সময় আছে। আপনারা এখনো ভাবতে পারেন। বাংলাদেশ সম্পর্কে আপনাদের ধারণাটা পরিষ্কার করে আমাদের জানানো উচিত, বাংলাদেশকে জানানো উচিত। আমি এর বেশি যেতে চাই না। কারণ বারবার আপনারা এই কথাগুলো বলতেই থাকেন।’
তার ভাষ্য, ‘১৯৭১ সম্পর্কে আপনাদের ধারণা খুব পরিষ্কার করে আপনারা বলেন না। আমি আজ পর্যন্ত শুনিনি। এই কথাটা আমরা এজন্য বলছি যে, আজ যদি আপনারা এটা স্বীকার করে নেন, তাহলে আপনাদের জন্য রাজনীতি অনেক সহজ হয়ে যাবে।’
মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা ইস্যুতে বিএনপির মহাসচিবের বক্তব্যের সমালোচনা করে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও এগারো দলীয় জোটের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘আয়নায় নিজের চেহারা দেখুন। ক্ষমা আপনার বাবাকে কবর থেকে চাইতে বলেন।’
আরও পড়ুন: বেরোবিতে ৩য় বার্ষিক তাঁবু বাস ও দীক্ষা অনুষ্ঠান-২০২৬ শুরু
তার মতে, ‘অতীতে বিভাজনের রাজনীতির কারণে সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। বর্তমান সরকারও সেই বিভাজনের রাজনীতি শুরু করেছে। বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, স্বাধীনতার বিরোধিতার জন্য জামায়াত ক্ষমা চায়নি। ফ্যাসিবাদীরা যে সুরে কথা বলেছে, সেটি বাংলাদেশের জনগণ জুলাই আন্দোলনের সময় রিজেক্ট (বাতিল) করে দিয়েছে। পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ হবে না।’
হামিদুর রহমান আযাদের বলেন, ‘আমরা অপরাধ করি নাই, ক্ষমা চাইবো কেন? সেই হিসেবে আপনার বাবাও অপরাধী। তাই আপনাদের কথা সতর্কভাবে বলা উচিত।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা বলেন, ‘জামায়াত বিভিন্ন সময় বক্তব্য দিয়েও আনুষ্ঠানিকভাবে দলের পক্ষ থেকে একাত্তরের ভূমিকা সম্পর্কে স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি।’
তার ভাষ্য, ‘পাকিস্তানের হানাদারদের তারা রাজনৈতিক সহায়ক ছিল, সামরিক সহায়ক ছিল এবং হত্যাকাণ্ডেও তাদের সহায়ক ভূমিকার একটি প্রামাণিক ইতিহাস বা দলিলপত্র রয়েছে, যা মানুষ জানে। সুনির্দিষ্টভাবে এই অপরাধের সহায়তার ব্যাপারে এবং গণহত্যার সহায়ক হিসেবে বা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে তাদের যে অবস্থান, এটি যে ভুল ছিল, অন্যায় ছিল, তার জন্য যে ক্ষমা প্রার্থনা করা—এটার কোনো “যদি-কিন্তু” দেওয়া যাবে না। নিঃশর্তভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে।’
আরও পড়ুন: ডিসেম্বরেই মালয়েশিয়ায় বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ফ্লাইট চালু হবে: আরিফুল হক
সাইফুল হক মনে করেন, শুধু ক্ষমা প্রার্থনা করলেই বিষয়টির সমাপ্তি হবে না। তার মতে, এরপর কীভাবে দলটি প্রায়শ্চিত্ত করবে, সেটিও তাদের নির্ধারণ করতে হবে। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের প্রশ্ন যেমন উঠেছে, তেমনি জামায়াতেরও বিচারের প্রশ্ন রয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি মানুষের বিচারের মুখোমুখিও তাদের হতে হবে।
তার ভাষায়, ‘এর মাধ্যমে একাত্তরকে ধারণ করা, লালন করার একটি বিষয় রয়েছে। এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়ার প্রশ্ন নয়। জামায়াতের বিচারের প্রশ্নটি কোনো শোধ-প্রতিশোধের বিষয় নয়। এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন।’
বর্তমান নেতৃত্বের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মের অনেক নেতা ব্যক্তিগতভাবে ওই সময়ের অপরাধে যুক্ত ছিলেন না। তবে তাদের বহু আগেই দলীয়ভাবে এ বিষয়ে পরিষ্কার অবস্থান নেওয়া উচিত ছিল।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স মনে করেন, জামায়াতের ক্ষেত্রে শুধু ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্ন তুলে বিষয়টিকে সীমাবদ্ধ করা ঠিক নয়।
আরও পড়ুন: গত আট মাসে জ্বালানি আমদানিতে ৪৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি : বিদ্যুৎমন্ত্রী
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আলবদর ও আলশামস বাহিনীর মাধ্যমে যে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার সঙ্গে জামায়াতের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তাই শুধু ক্ষমা চাইলেই হবে না, বিচারও চলমান রাখতে হবে। জামায়াত যদি রাজনৈতিকভাবে এই যুক্তিতে একমত হয় যে পাকিস্তানকে রাখার পক্ষে তারা সংগ্রাম করেছিল, এইটি যদি তাদের ভুল ছিল—তাহলে ভুল স্বীকারের প্রশ্ন আসবে। তখন কিভাবে বলবে, না বলবে, তা সরকার এবং রাষ্ট্র নির্ধারণ করবে।
তিনি বলেন, ‘যে মনে করে না, হত্যা করেছে, জোর-জুলুম করেছে, তাহলে শুধু ক্ষমা চাইলে তো হবে না।’
রুহিন হোসেন প্রিন্স আরও বলেন, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিলে ‘উইথ দেয়ার অল অক্সিলারি ফোর্স’ উল্লেখ ছিল, যার মধ্যে আলবদর ও আলশামস অন্তর্ভুক্ত। তার মতে, সেই বিবেচনায় জামায়াতে ইসলামীর বাংলাদেশে রাজনীতি করার অধিকার নেই। তিনি বলেন, জনগণ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত রাজনৈতিকভাবে এই শক্তিকে মোকাবিলার পথ খুঁজে বের করা।
রাজনীতি বিশ্লেষক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, জামায়াত নামটাই দলটির সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক দায়।
আরও পড়ুন: পোশাকশিল্পে অস্থিরতায় অর্থায়নের অভিযোগ, ২০৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ
তিনি বলেন, ‘জামায়াত নামটা তো ওই যে পাকিস্তানপন্থীদের পক্ষ নিয়েছে, সেইরকম ইতিহাস। জামায়াত নামটা যতদিন থাকবে, ততদিন তাদের এই দায় বহন করে যেতেই হবে। যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে যুক্ত অনেকের বিচার হয়েছে, অনেকের শাস্তিও হয়েছে। কিন্তু দল হিসেবে অতীতের দায় থেকে মুক্তি পেতে চাইলে নিজেদের নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে।’
তার ভাষ্য, ‘তাদের তো রি-ইনভেন্ট করতে হবে নিজেদের। তারা যদি একাত্তরের দায়মুক্ত হতে চায়, জামায়াত নাম যতদিন থাকবে, একাত্তরের সেই দায় তারা এড়াতে পারবে না।’
আলোচনা শেষে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতার কারণে জামায়াত সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে বলেও মনে করেন কবি নজরুল কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী সামিয়া আক্তার। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে জামায়াতের আমিরকে বলতে শোনা গেছে, ‘আমাদের ক্ষমা করে দিন, আমাদের একটি সুযোগ দিন।’ কিন্তু তার মতে, ক্ষমা চাইতে হলে আগে স্পষ্টভাবে ভুল স্বীকার করতে হয়।
সামিয়া বলেন, ‘আমি আজ পর্যন্ত কোনো জামায়াতের পক্ষ থেকে অকপটে বলতে দেখিনি বা শুনিনি যে, ১৯৭১ সালে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ভুল ছিল বা তারা জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। অনেক নেতাকর্মী ও সমর্থককে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস, শহীদের সংখ্যা বা যুদ্ধকালীন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলতে দেখা যায়। এতে মানুষের মনে ধারণা তৈরি হয় যে দলটি এখনো অতীতের অবস্থান থেকে স্পষ্টভাবে সরে আসেনি।
আরও পড়ুন: ৭ নভেম্বর যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের আহ্বান বিরোধীদলীয় নেতার
তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষমা চাওয়ার প্রথম শর্ত হলো সত্য স্বীকার করা। আর সত্য স্বীকার না করে শুধু “ক্ষমা করে দিন” বলা রাজনৈতিক বক্তব্য হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত অনুশোচনা নয়।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন