০৫:১৬ পি.এম
চীনের সামাজিক ক্রেডিট ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের ফলে নাগরিকদের ওপর ব্যাপক নজরদারির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ ব্যবস্থা সরকারের ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি তথ্যের অস্বচ্ছ ব্যবহার, বৈষম্য ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের কারণও হতে পারে। চীনের এক আইন গবেষকের গবেষণায় এ আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে। খবর সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
গত মাসে ‘জার্নাল অব সিচুয়ান নরমাল ইউনিভার্সিটি’ সাময়িকীতে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়। এর লেখক লিন জিয়ানশিং সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের একজন ডক্টরাল গবেষক। সিচুয়ান প্রদেশে সামাজিক শাসনব্যবস্থার মডেল ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্ভাবন নিয়ে পরিচালিত একটি সরকারি অর্থায়নপুষ্ট প্রকল্পের আওতায় এ গবেষণা করা হয়েছে।
লিনের মতে, সামাজিক মূল্যায়নব্যবস্থায় বিগ ডেটা ও অ্যালগরিদম ব্যবহার করে নাগরিকদের অনলাইন ও অফলাইন কর্মকাণ্ডকে পরিমাপযোগ্য স্কোরে রূপান্তর করা হয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তির সম্ভাব্য আচরণ ও ঝুঁকি সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়া এবং তার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।
আরও পড়ুন: সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়াতে চলছে নীরব কূটনীতি
গবেষক সতর্ক করে বলেছেন, এআইনির্ভর এমন প্রশাসনিক ব্যবস্থা ঝুঁকি মূল্যায়ন ও স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা বাড়ালেও এর ফলে তথ্যের অস্বচ্ছতা, ব্যাপক নজরদারি ও বৈষম্যের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবা ও ঋণ পাওয়ায় প্রভাব
লিনের গবেষণায় বলা হয়েছে, সামাজিক মূল্যায়নব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তির স্কোর বেশি বা কম হওয়ার বিষয়টি সরাসরি তার অধিকার ও দায়িত্বে প্রভাব ফেলছে বলে মনে না-ও হতে পারে। তবে বাস্তবে স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ পাওয়া এবং সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির সঙ্গে কেমন আচরণ করা হবে, তা এ মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করতে পারে।
গবেষকের আশঙ্কা, নাগরিকদের বিভিন্ন ধরনের তথ্য বিশ্লেষণ করে তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত প্রোফাইল তৈরি করা হলে এ ব্যবস্থা একপর্যায়ে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার থেকে আচরণগত নজরদারির মাধ্যমে পরিণত হতে পারে।
আরও পড়ুন: যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফিরে যাওয়া উচিত : র্যাচেল রিভস
এ ক্ষেত্রে তথ্যের গুণগত মান এবং স্কোর নির্ধারণের জন্য ব্যবহৃত অ্যালগরিদমের নির্ভরযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ। সংগৃহীত ব্যক্তিগত তথ্যের মান, মডেল তৈরির পদ্ধতি এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমের ধরন—সবকিছুই এ ব্যবস্থার কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন লিন।
তার মতে, কঠোর তথ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ও কার্যকর তদারকি না থাকলে নাগরিকদের ডিজিটাল কর্মকাণ্ডের তথ্য অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হবে।
চীনের সামাজিক ক্রেডিট ব্যবস্থা কেমন
চীনের সামাজিক ক্রেডিট ব্যবস্থা পশ্চিমা বিশ্বে প্রায়ই নাগরিকদের আচরণ পর্যবেক্ষণ ও স্কোরের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের একটি বিস্তৃত কাঠামো হিসেবে আলোচিত হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে গত বছর প্রকাশিত একটি নিবন্ধে এ ধারণার ভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ‘সংবিধানের চেয়ে বড় নন মোদি-শাহ’, দিল্লির সমাবেশে রাহুল গান্ধী
নিবন্ধ অনুযায়ী, চীনের সামাজিক ক্রেডিট ব্যবস্থা একক ও কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত কোনো অভিন্ন নেটওয়ার্ক নয়। বরং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার পরিচালিত একাধিক উদ্যোগ ও পরীক্ষামূলক ব্যবস্থার সমন্বয়ে এটি গড়ে উঠেছে।
এসব ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে গুরুতর আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় কালো তালিকাভুক্ত করা, আর্থিক ঋণসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিবেদন তৈরি এবং বিভিন্ন শহরের স্থানীয় সরকারের পরিচালিত মূল্যায়নব্যবস্থা। কিছু স্থানীয় ব্যবস্থায় নাগরিকদের আচরণসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি পুরস্কার ও শাস্তির বিধানও রয়েছে।
স্ট্যানফোর্ডের নিবন্ধে বলা হয়েছে, চীনের অল্পসংখ্যক শহরে এ ধরনের স্থানীয় ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এ ছাড়া সাধারণ নাগরিকদের তুলনায় সরকারি কর্মচারীদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও সামাজিক ক্রেডিট কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সরকারি সেবায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়াচ্ছে চীন
আরও পড়ুন: লন্ডনের মেয়র সাদিক খান তুরস্ক সফরে গিয়ে আয়া সোফিয়ায় নামাজ পড়তে চান
চীনের সরকার সামাজিক শাসনব্যবস্থায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। গত বছর দেশটির রাষ্ট্রীয় পরিষদ প্রকাশিত একটি কর্মপরিকল্পনায় সরকারি খাতে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খলভাবে এআইয়ের ব্যবহার এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়।
এর লক্ষ্য হলো এমন একটি জনসেবাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে মানুষের প্রয়োজন যথাযথভাবে শনাক্ত করা, আগাম সেবার পরিকল্পনা করা এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত ও কার্যকরভাবে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
এর উদাহরণ হিসেবে চীনের মধ্যাঞ্চলীয় আনহুই প্রদেশের একটি সামাজিক সহায়তা পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর তথ্যভান্ডার তৈরি এবং বিভিন্ন সরকারি বিভাগের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে সামাজিক সেবার কার্যকারিতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করা হয়েছে।
লিনের মতে, সামাজিক মূল্যায়নব্যবস্থা নাগরিকদের প্রয়োজন শনাক্ত করা, সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়া এবং প্রশাসনিক সম্পদ বণ্টনে সরকারকে সহায়তা করতে পারে। তবে এ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে তথ্যের মান, নির্ভরযোগ্য অ্যালগরিদম এবং প্রশাসনিক সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ডে সুনির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ জরুরি।
আরও পড়ুন: হরমুজ স্বাভাবিক না হলে ভিন্ন পথে হাঁটার হুঁশিয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের
তার গবেষণায় মূলত সতর্ক করা হয়েছে, যথাযথ নীতিমালা ও তদারকি ছাড়া সামাজিক মূল্যায়নব্যবস্থায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়ালে জনসেবা উন্নত করার প্রযুক্তি নাগরিকদের আচরণ পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন