শুক্রবার, ৩০শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং
০৪:২৮ পি.এম
চট্টগ্রাম, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ : সমাজকল্যাণ এবং নারী ও শিশু বিষয়কমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন আজ চট্টগ্রাম সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এই পরিদর্শনের সময় তিনি সমাজের অবহেলিত ও অধিকার বঞ্চিত শিশুদের সমাজের মূল ধারায় পুনর্বাসনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো- অবহেলিত, অধিকার বঞ্চিত, পরিত্যক্ত, পিতামাতাহীন- এই সমস্ত বাচ্চাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং দিনশেষে তাদেরকে সমাজে পুনর্বাসন করা।’
শুক্রবার বেলা সাড়ে ১০টার দিকে তিনি চট্টগ্রামের সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রটি পরিদর্শন করেন। এ সময় ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানান, তিনি এখানে বাচ্চাদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের অবস্থা দেখতে এসেছেন।
পথশিশু ও ভিক্ষাবৃত্তি করা শিশুদের পুনর্বাসনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পথশিশু ও ভিক্ষাবৃত্তি করা শিশুদের পুনর্বাসনের জন্য তাদেরকে সবার আগে সাইকোসোশ্যাল মোটিভেশনের আওতায় আনতে হবে। এছাড়া তাদের পুনর্বাসন করা সম্ভব না। সে লক্ষ্যে আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করছি।’
এর আগে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে একটি পেয়ারা গাছ রোপণ করেন। পরে হলরুমে শিশুদের আঁকা দেয়ালিকার ১২তম সংখ্যা ‘আলোকবর্তিকা’ উন্মোচন করেন তিনি।
এ সময় বালক-বালিকারা বাংলাদেশের পতাকার রঙের পোশাক পরে ‘রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি-বাংলাদেশের নাম’সহ কয়েকটি গানের নৃত্য পরিবেশন করেন।
চট্টগ্রাম সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রের উপপ্রকল্প পরিচালক জেসমিন আক্তার জানান, এখানে পথশিশু, শ্রমজীবী শিশু, গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশু, পিতামাতাহীন শিশু, পরিত্যক্ত শিশু, পাচার থেকে উদ্ধারকৃত শিশু, আইনের সংস্পর্শে আসা শিশু ও প্রতিবন্ধী শিশুসহ ১৬ ধরণের শিশু অবস্থান করছে।
তিনি বলেন, আমরা তাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, জীবনমান উন্নয়ন, কারিগরি প্রশিক্ষণ ইত্যাদি সেবার মাধ্যমে সমাজের মূল ধারায় পুনর্বাসনের চেষ্টা করছি।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন- বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক, হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মুমিন ও চট্টগ্রাম সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রের উপ-প্রকল্প পরিচালক জেসমিন আক্তারসহ আরও অনেকেই।
চট্টগ্রাম সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১২ সালের ১২ আগস্ট। এরপর থেকে এ পর্যন্ত কেন্দ্রটি থেকে ২ হাজার ২৪টি শিশু সেবা নিয়েছে। এরমধ্যে ১ হাজার ৩৭৮টি শিশু বিভিন্নভাবে পুনর্বাসিত হয়েছে এবং ৫০০টি শিশুকে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে কেন্দ্রটিতে ১০০ জন বালক এবং ১০৪ জন বালিকা শিশু রয়েছে। তাদের বয়স সর্বনিম্ন ৬ থেকে সর্বোচ্চ ১৮ পর্যন্ত।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের ১৫৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বরিশালে এক দিনব্যাপী সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিক এবং অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর অবদানকে স্মরণ করা হয়।
শুক্রবার (আজ) সকাল ১০টায় বরিশালের বিভাগীয় সরকারি গণগ্রন্থাগার সম্মেলন কক্ষে ‘বাংলাদেশী সাংস্কৃতিক জোট’ এর উদ্যোগে এই সম্মেলনের উদ্বোধন করা হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংগঠনের আহ্বায়ক এস এম সাব্বির নেওয়াজ সাগরের সভাপতিত্বে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
দিনব্যাপী এই সম্মেলনে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলার কবি, সাহিত্যিক এবং বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা অংশগ্রহণ করেন। সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলা এই আয়োজনে সাহিত্যচর্চা, কবিতা পাঠ এবং বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের বর্ণাঢ্য জীবন ও রাজনৈতিক কর্ম নিয়ে আলোচনা করা হয়।
সম্মেলনের সমাপনী পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এর চেয়ারম্যান, কবি আবদুল হাই শিকদার। সমাপনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় কবিতা পরিষদ বরিশাল শাখার সভাপতি কবি মুস্তফা হাবীব।
আয়োজকরা জানান, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের স্মৃতি এবং সাহিত্য-সংস্কৃতিতে তাঁর অসামান্য অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং সাহিত্যচর্চাকে আরও বেগবান ও সমৃদ্ধ করাই ছিল এই সম্মেলনের মূল লক্ষ্য।
এদিকে, অনুষ্ঠানে ‘শেরেবাংলা স্মৃতিপদক ২০২৬’-এর জন্য গৌরনদী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. মোসলেম উদ্দিন শিকদারকে মনোনীত করা হয়েছে।
— এমএইচ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সহযোগিতা চুক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে। জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান এই চুক্তি সম্পর্কে মন্তব্য করে বলেন, "চুক্তি করে বাংলাদেশ-জাপান, আর স্বাগত জানায় ভারত।" তিনি উল্লেখ করেন যে, মাতারবাড়ি সমুদ্রবন্দর জাপানের সহযোগিতায় মূলত ভারতের সেভেন সিস্টার্সের জন্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে একটি করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
শুক্রবার দুপুরে ‘ভারতে মুসলিম নিধন ও মসজিদ আক্রমণের প্রতিবাদে’ জাগপা আয়োজিত পল্টনের বিক্ষোভ মিছিল শেষে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রাশেদ প্রধান আরও বলেন, "ভারতের আবদার রক্ষা করতে গিয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনা থেকে চীনকে বাদ দেওয়া হয়েছে।" তিনি আরও জানান, মেট্রোরেল প্রকল্পের সব কাজ ভারত পেয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতবিরোধী নাটকীয় স্টেটমেন্ট দিলেও বাস্তবে তারা সমঝোতা করে চলেছে। তিনি অভিযোগ করেন, "উগ্র হিন্দুত্ববাদী মোদী সরকারের সাথে দেশ বিক্রির চুক্তি করা হয়েছে।"
জাগপা সহ-সভাপতি ভারত সরকারের মুসলিম নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে বলেন, "আসামে ও দিল্লিতে মুসলিমদের ঘরবাড়ি ভেঙে উচ্ছেদ করা হয়েছে, আল্লাহর ঘর পবিত্র মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছে।" তিনি আরও বলেন, গোটা ভারতে মাইকে আজান দেওয়ায় ও নামাজ পড়ায় বাধা দেওয়া হচ্ছে। মুসলিম নারীদের হিজাবকে জঙ্গি আখ্যা দেওয়া হচ্ছে এবং মাদ্রাসার সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবার বাতিল করা হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, "গরু পাচারের অপবাদে মুসলিমদের বাছাই করে হাঁটুর নিচে গুলি করে পঙ্গু বানানো হচ্ছে, মুসলিমদের পুশ-ইন করে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে।" তিনি বলেন, "যে ভারত আমাদের সম্প্রীতির সবক দেয়, তারা নিজ দেশে উগ্র হিন্দুত্ববাদের রূপ ধারণ করে মুসলিম নিধনে লিপ্ত।"
সমাবেশে জাগপা ছাত্র কাফেলার সভাপতি আব্দুর রহমান ফারুকী সঞ্চালনা করেন। এতে আরও বক্তব্য রাখেন— জাগপার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইকবাল হোসেন, প্রেসিডিয়াম সদস্য আসাদুর রহমান খান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহিদুর রহমান বাবলা, ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক নাদিম মাহমুদ, শ্রম বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান বাবুল, যুব জাগপা সভাপতি নজরুল ইসলাম বাবলু, ঢাকা মহানগর সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান, পঞ্চগড় জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক মো. কামাল হোসেন এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি আরিয়ান শরীফ ও সাধারণ সম্পাদক মাহবুব হোসেন প্রমুখ।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
প্রায় অর্ধ যুগের বেশি সময় ধরে নিষিদ্ধ গ্লুকোজ জেলি, সয়াবিন তেল, কস্টিক সোডা ও চিনি মিশিয়ে ভেজাল বা নকল দুধ উৎপাদন করে আসছিলেন পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার আবুল বাশার (৪৫)। তিনি ভাঙ্গুড়া সদর ইউনিয়নের কৈডাঙ্গা গ্রামে নিজের বাড়িতে স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রতিদিন সহস্রাধিক লিটার নকল দুধ তৈরি করতেন। এই বিষাক্ত দুধ রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন নামকরা কোম্পানি ও আটঘরিয়ার ‘ফারুক ডেইরি’র মাধ্যমে বাজারজাত করা হতো।
অবশেষে তিনবার নামমাত্র সাজা ও জরিমানা দেওয়ার পর চতুর্থবারের অভিযানে আবুল বাশারকে ১ বছরের কারাদণ্ড এবং ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ভাঙ্গুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুরাইয়া মমতাজ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এই দণ্ড প্রদান করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুধের রাজধানী খ্যাত ভাঙ্গুড়ায় এক দশক আগে প্রতিদিন লাখ লাখ লিটার খাঁটি দুধ উৎপাদিত হতো। এই খ্যাতির সুযোগ নিয়ে প্রায় ৮-৯ বছর আগে সঞ্জয় কুমার নামের এক ব্যবসায়ী প্রথম নকল দুধ তৈরি শুরু করেন। তৎকালীন ইউএনও’র হাতে একবার কারাদণ্ড ভোগ করার পর প্রভাবশালী মহলের মদদে তিনি আরও বড় পরিসরে এই কারবার শুরু করেন। পরবর্তীতে তার সঙ্গে আবুল বাশার যুক্ত হন। কালক্রমে তারা পুরো এলাকায় একটি শক্তিশালী নকল দুধের সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।
জানা যায়, আবুল বাশার বাইরে থেকে প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকার নিষিদ্ধ গ্লুকোজ জেলি আমদানি করে স্থানীয় কারবারিদের কাছে বিক্রি করতেন। এর আগেও বাশারের বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযান পরিচালিত হলেও তিনি নামমাত্র শাস্তিতে বেঁচে যান।
২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বর ভাঙ্গুড়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিজানুর রহমান বাশারের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকার নিষিদ্ধ গ্লুকোজ জেলি ও নকল দুধ জব্দ করলেও মাত্র ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল একটি ট্রান্সপোর্টের মাধ্যমে আমদানিকৃত প্রায় ৮০০ লিটার নিষিদ্ধ গ্লুকোজ জেলি জব্দ করা হলেও রহস্যজনকভাবে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এরপর চলতি মাসের ৮ তারিখ জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ জেলি ও নকল দুধ পাওয়ার অপরাধে তাকে ১ লাখ টাকা জরিমানা ও বাড়ি সিলগালা করে। কিন্তু সিলগালা উপেক্ষা করে বাশার তার অবৈধ কারবার চালিয়ে যান।
অবশেষে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুরাইয়া মমতাজের নেতৃত্বে প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী পরিচালিত অভিযানে বাড়িটি থেকে ২ হাজার ৭০০ লিটার গ্লুকোজ জেলি, ২০০ লিটার সয়াবিন তেল, ৩২০ লিটার নকল দুধ ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি জব্দ করে ধ্বংস করা হয়।
এই অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালত আবুল বাশারকে ১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো ৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। এ ছাড়া তার সহযোগী একই গ্রামের সবুজের ছেলে সবুজকে ৬ মাসের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো ১ মাস কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. হালিমা খানম লিমা জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই নকল দুধ পান করলে মানুষের শরীরে ক্যান্সার, শারীরিক বিকলাঙ্গতা ও শিশুদের বিকাশগত মারাত্মক সমস্যা দেখা দিতে পারে, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।
অভিযানের সত্যতা নিশ্চিত করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুরাইয়া মমতাজ জানিয়েছেন, জনস্বার্থ রক্ষায় এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
একসময় ক্রেতাদের জন্য দোকানের শাটার খোলার অপেক্ষায় থাকতেন ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দোকান খোলা রেখেও ক্রেতার দেখা পান না তারা। দুপুর গড়িয়ে গেলেও অনেক দোকানে দিনের প্রথম বিক্রি হয় না। পণ্য বিক্রি না হওয়ায় দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতন এবং সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। কিছু ব্যবসায়ী ঋণ নিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছেন, আবার অনেকে দোকান ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা করছেন।
রাজধানীর একসময়ের অভিজাত ও জমজমাট শপিংমলগুলোর অবস্থা এখন এমন। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, রাপা প্লাজা, ইস্ট প্লাজা, প্লাজা এয়ার এবং অর্কিড পয়েন্টের মতো বিপণিবিতানে ক্রেতাসংকটের কারণে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের আশঙ্কা, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আরো কিছু শপিংমল একে একে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
ব্যবসায়িক মন্দা, ক্রেতাসংকট এবং আর্থিক সংকটের কারণে রাজধানীর শান্তিনগর-কাকরাইলের কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স বন্ধ হয়ে গেছে। ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া এই বিপণিবিতানটি গত ১ অক্টোবর থেকে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন দোকানমালিকেরা। ক্রেতা কমে যাওয়া, লোকসান এবং বকেয়া বিলের চাপ সামলাতে না পেরে তারা এ সিদ্ধান্ত নেন।
রাজধানীর রাপা প্লাজায় ২৬ বছর ধরে ব্যবসা করছেন নূর নবী। তিনি জানিয়েছেন, দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় অনেক উত্থান-পতন দেখেছেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন মনে করছেন। নূর নবী বলেন, ‘অবস্থা এমনিতেই খারাপ। তবে রাপা প্লাজার অবস্থা আরো খারাপ। একসময় আমরা শাটার খোলার অপেক্ষা করতাম, কখন ক্রেতা আসবেন। ক্রেতারা বলতেন, আমার পণ্যটা দিয়ে তারপর শাটার বন্ধ করেন। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেও ক্রেতা পাই না।’
তিনি আরো বলেন, অনেক দিন দুপুর গড়িয়ে গেলেও বিক্রি শুরু হয় না। দোকানে পণ্য সাজানো থাকলেও ক্রেতা না থাকায় ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। একই মার্কেটের এক নারী ব্যবসায়ীও হতাশার কথা জানান। সকাল ১১টার দিকে দোকান খুললেও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তার কোনো বিক্রি হয়নি বলে জানান তিনি।
ওই নারী ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমাদের পুরো পরিবার ব্যবসার আয়ের ওপর নির্ভরশীল। দোকানের আয় দিয়ে বাসাভাড়া, খাওয়াদাওয়া, পণ্য কেনা ও কর্মচারীদের বেতন দিতে হয়। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এত খারাপ যে সব খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’
২০ টাকার পণ্যও বিক্রি হচ্ছে না
রাপা প্লাজার মতো একই চিত্র দেখা যাচ্ছে রাজধানীর অন্য কয়েকটি শপিংমলেও। একসময় কেনাকাটার জন্য পরিচিত ছিল ইস্ট প্লাজা। সেখানকার ব্যবসায়ীরাও এখন ক্রেতাসংকটে ভুগছেন। এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমাদের দোকানে ২০ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দামের পণ্য রয়েছে। তারপরও সারা দিন কোনো ক্রেতা পাই না। সোমবারও কোনো বিক্রি হয়নি, আজও হয়নি। এভাবে চলতে থাকলে দোকানভাড়া দেওয়া সম্ভব হবে না।’
তিনি বলেন, কয়েক মাস দোকানভাড়া দিতে না পারলে দোকান ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। মাসে কয়েক দিন বিক্রি হলেও বাকি দিনগুলোতে আয় না থাকায় ব্যবসার খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে। অর্কিড পয়েন্টের ব্যবসায়ীরাও একই ধরনের আশঙ্কা করছেন। তাদের একজন জানান, মঙ্গলবার মার্কেটটি বন্ধ ছিল। ব্যবসার অবস্থা খারাপ হওয়ায় কিছু দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। আবার কিছু নতুন ব্যবসায়ী এসেছেন। তবে সামগ্রিকভাবে বিক্রি বাড়ছে না।
ওই ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা দোকানভাড়া, সার্ভিস চার্জ ও কর্মচারীদের বেতন দিয়ে ব্যবসা করি। অন্যদিকে ফুটপাতে কম খরচে পণ্য বিক্রি হচ্ছে। অনলাইনে অনেক পণ্য তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়। এসব কারণে আমাদের ব্যবসায় প্রভাব পড়ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আগে ভাড়ার দোকানে ব্যবসা করতাম। পরে সেখানে দোকান না পেয়ে এই মার্কেটে এসেছি। কিন্তু এখানেও ব্যবসার অবস্থা ভালো নয়।’
ঋণের বোঝা বাড়ছে ব্যবসায়ীদের
ব্যবসায় মন্দার কারণে অনেক ব্যবসায়ী ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। দোকানে লাখ লাখ টাকার পণ্য থাকলেও বিক্রি না হওয়ায় নগদ অর্থের সংকট কাটছে না। একপর্যায়ে পণ্য কেনার টাকা, দোকানভাড়া এবং কর্মচারীদের বেতন জোগাড় করাও কঠিন হয়ে উঠছে। এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘গত আড়াই বছরে আমার প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা ঋণ হয়েছে। দোকানে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার পণ্য থাকলেও ক্রেতা না থাকলে কী হবে? সংসার চালাতে হচ্ছে একজনের কাছ থেকে ধার করে আরেকজনের দেনা শোধ করে।’
আরেক ব্যবসায়ী জানান, তার পরিচিত এক দোকানির প্রায় ৩০ লাখ টাকার পণ্য রয়েছে। কিন্তু তার দেনার পরিমাণ প্রায় ৫০ লাখ টাকা। বিক্রি না হওয়ায় পণ্য থাকা সত্ত্বেও দেনা পরিশোধ করতে পারছেন না তিনি।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, প্রতিদিন দোকান খোলা রাখার জন্য বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীদের বেতন, ভাড়া এবং অন্যান্য খরচ বহন করতে হয়। অথচ বিক্রি না থাকায় এসব ব্যয় মেটানোর মতো অর্থ হাতে থাকছে না। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে দোকান বন্ধ করে দিচ্ছেন।
অনলাইন কেনাকাটা ও ফুটপাতের প্রতিযোগিতা
ব্যবসায়ীরা বলেন, ক্রেতাসংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। অনলাইনে কেনাকাটার প্রবণতা বৃদ্ধি, ফুটপাতের দোকানে কম দামে পণ্য পাওয়া, ক্রেতাদের পরিবর্তিত অভ্যাস এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কেনাকাটায় সতর্কতা—সব মিলিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা।
এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘অনলাইনে অনেক কম দামে পণ্য পাওয়া যায়। ক্রেতারা সেখান থেকে কেনাকাটা করেন। আবার ফুটপাতেও কম দামে পণ্য বিক্রি হয়। কিন্তু আমাদের দোকানভাড়া, সার্ভিস চার্জ ও কর্মচারীদের বেতন দিতে হয়। ফলে একই দামে পণ্য বিক্রি করা কঠিন।’
তবে অনলাইন কেনাকাটা বা ফুটপাতের ব্যবসাকেই একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছেন না ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, মানুষের হাতে খরচ করার মতো অর্থ কমে গেলে কেনাকাটাও কমে যায়। প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর অনেকেই পোশাক বা অন্যান্য পণ্য কেনা পিছিয়ে দিচ্ছেন।
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি কি সতর্কবার্তা?
রাজধানীর শান্তিনগর-কাকরাইল মোড়ে অবস্থিত কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি একসময় অভিজাত বিপণিবিতান হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া এই শপিং কমপ্লেক্সে একসময় ১৯৮টি দোকান ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ক্রেতা কমতে থাকায় ব্যবসায়িক কার্যক্রম সংকুচিত হয়ে আসে। শেষ পর্যন্ত গত ১ অক্টোবর থেকে বিপণিবিতানটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির পরিণতি নিয়ে উদ্বিগ্ন অন্য শপিংমলের ব্যবসায়ীরা। তাদের আশঙ্কা, ক্রেতা না ফিরলে এবং বিক্রি না বাড়লে একই পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে আরো কিছু বিপণিবিতান।
ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন, দোকানভাড়া ও অন্যান্য খরচ বাড়লেও বিক্রি না থাকলে তারা কত দিন ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারবেন? অনেকের কাছে এখন ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চেয়ে ঋণের বোঝা না বাড়ানোই বড় চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে রাজধানীর একসময়ের অভিজাত শপিংমলগুলোতে ক্রেতাসংকট ব্যবসায়ীদের অস্তিত্বের সংকটে ফেলেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা, কেনাকাটার পরিবেশ এবং ব্যবসার ব্যয়—সব দিকেই নজর দেওয়ার প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, ক্রেতারা আবার ফিরবেন, বাড়বে বিক্রি। তা না হলে একসময় জমজমাট এসব বিপণিবিতানের অনেকগুলোই হয়তো ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ