১০:৩২ এম
গত ১২ মাসের মধ্যে, বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম স্বর্ণ বিক্রেতা দেশে পরিণত হয়েছে রাশিয়া। রাশিয়া বাজেটের ওপর বাড়তে থাকা চাপ সামাল দিতে নগদ অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করছে। দেশটি ২০২৬ সালে তার স্বর্ণ রিজার্ভের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিক্রি করেছে। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এই বিক্রি অগত্যা রাশিয়ার আসন্ন আর্থিক সংকটের লক্ষণ নয়।
বাড়তি বাজেট ঘাটতি মেটাতে নগদ অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্যে ক্রেমলিন চলতি বছর স্বর্ণ রিজার্ভের একটি বড় অংশ বিক্রি করেছে। জুলাইয়ের শুরুতে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, স্বর্ণ রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৭ কোটি ৩৪ লাখ ট্রয় আউন্স বা ২ হাজার ২৮২ মেট্রিক টন। ২০২৬ সালের শুরু থেকে এই পরিমাণ প্রায় ৪৩ দশমিক ৫ মেট্রিক টন কমেছে। বর্তমানে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন শুরুর পর রাশিয়ার স্বর্ণ রিজার্ভ সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে স্বর্ণের দাম রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছিল। বছরের প্রথম চার মাসে গড় দাম প্রতি আউন্স প্রায় ৪ হাজার ৮০০ ডলার (৪ হাজার ২১০ ইউরো) ছিল। পরে, দাম কমে এখন প্রায় ৪ হাজার ডলারে নেমেছে। মস্কোর এই বিক্রি থেকে সম্ভবত ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হয়েছে।
আরও পড়ুন: জিয়া পরিবার ঐক্যের রাজনীতিকে ধারণ করে দেশকে এগিয়ে নিচ্ছে: পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী
পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ এলিনা রিবাকোভা ডিডব্লিউকে জানান, রাশিয়া স্বর্ণ বিক্রি করছে কারণ দেশটির অন্যান্য সহজে নগদে রূপান্তরযোগ্য সম্পদ কমে আসছে। বাজেট ঘাটতির পাশাপাশি সেই ঘাটতি মেটানোর উৎসগুলোর ওপরেও চাপ তৈরি হচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ইউক্রেনের যুদ্ধে এই অর্থের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে, যার ফলে দেশটির বাজেটের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে ফিনান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছিল, রাশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় মন্ত্রিসভাকে একটি চিঠিতে সতর্ক করেছে যে, ২০২৬ সালে যুদ্ধের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় কমপক্ষে ২৮ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। ২০২৭ ও ২০২৮ সালেও অতিরিক্ত ব্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
২০২১ সাল থেকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যয় চারগুণের বেশি বেড়েছে। ২০২৫ সালে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ১৬ ট্রিলিয়ন রুবল বা ২০৪ বিলিয়ন ডলার। মস্কোভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাক্রো-অ্যাডভাইজরির আর্থিক বিশ্লেষক ক্রিস উইফার ডিডব্লিউকে জানান, রাশিয়ার স্বর্ণ বিক্রি উল্লেখযোগ্য হলেও এটিকে আতঙ্কিত হয়ে সম্পদ বিক্রি বলা যাবে না।
তিনি বলেন, পরিস্থিতিটি অসাধারণ হলেও এটি তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক একটি প্রবণতা। রাশিয়া যে স্বর্ণ বিক্রি করেছে, তার বেশিরভাগই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিবর্তে দেশের অর্থ মন্ত্রণালয় জাতীয় কল্যাণ তহবিলের (এনডব্লিউএফ) মাধ্যমে বিক্রি করেছে।
আরও পড়ুন: ম্যাকাওয়ের প্রথম জাতীয় নিরাপত্তা মামলায় সাবেক আইনপ্রণেতা আউ কাম সানকে ১২ বছরের কারাদণ্ড
২০২২ সালের শুরু থেকে স্বর্ণ জাতীয় কল্যাণ তহবিলের কেনার যোগ্য সম্পদগুলোর একটি। ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে মার্কিন ট্রেজারি ও বন্ড তাদের জন্য সহজলভ্য ছিল না। উইফার বলেন, স্বর্ণ তহবিলটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তরল সম্পদে পরিণত হয়েছে।
জাতীয় কল্যাণ তহবিলের স্বর্ণ বিক্রির মূল উদ্দেশ্য হলো এর তথাকথিত তরল সম্পদ পুনরায় পূরণ করা। উইফারের অনুমান, তহবিলটির মোট মূল্য প্রায় ১৫০ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারকে ‘তরল’ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তিনি বলেন, ক্রেমলিন চায় না এই নিরাপত্তা বলয় আরও কমে যাক। কারণ এতে রাশিয়ার আর্থিক সংকট বা অর্থনৈতিক দুর্বলতা নিয়ে জল্পনা বাড়তে পারে আর দেশটির ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানও দুর্বল হতে পারে। নিজেকে স্থিতিশীল ও শক্তিশালী দেশ হিসেবে তুলে ধরতে চায়। সম্ভবত ৫০ বিলিয়ন ডলারের তরল সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছে।
আরেকটি বিষয়ও রাশিয়াকে সুবিধা দিচ্ছে। রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম বড় স্বর্ণ উৎপাদক। ফলে দেশীয় উৎপাদকদের কাছ থেকে কিনে তুলনামূলকভাবে দ্রুত বিক্রি করা স্বর্ণের মজুত পুনরায় পূরণ করতে পারে। বিশ্বে রাশিয়ার কাছে পঞ্চম বৃহত্তম স্বর্ণের মজুত রয়েছে।
আরও পড়ুন: ঢামেকে কারাবন্দি মো. শামিমের মৃত্যু
দেশটির মজুতের পরিমাণ চীন, ফ্রান্স ও ইতালির প্রায় সমান। তবে জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের মজুতের তুলনায় তা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। রিবাকোভা মনে করেন, নিজস্ব স্বর্ণ উৎপাদন রাশিয়াকে বড় সুবিধা দিচ্ছে। নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগের সময় বিনিয়োগের অংশ স্বর্ণ কেনায় ব্যয় করা হয়েছিল।
বিশ্বের অন্যতম বড় স্বর্ণ বিক্রেতা হয়ে উঠতে রাশিয়ার বাজেট ঘাটতি ও বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে রাশিয়ার ফেডারেল বাজেট ব্যয় ও ঘাটতি সরকারি পরিকল্পনার চেয়ে ১ ট্রিলিয়ন রুবলের বেশি ছাড়িয়ে যেতে পারে। খরচ বাড়তে থাকলে রাশিয়ার বাজেটের চাপ বাড়বে।
তবে ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায়, তেল ও গ্যাস থেকে রাজস্ব বেড়েছে। ফলে ২০২৬ সালে বাজেটের চাপ সামাল দিতে মস্কো সক্ষম হয়েছে। রিবাকোভা মনে করছেন, তেল ও গ্যাস থেকে পাওয়া মূল্য ও রাজস্বই রাশিয়ার অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তিনি বলেন, সবকিছুই তেলের দামের ওপর নির্ভর করছে। তেলের দাম বেশি থাকলে রাশিয়া বেশি রাজস্ব পায়, ঋণ নেওয়া সহজ হয় এবং দেশের অভ্যন্তরীণ আর্থিক ব্যবস্থা শক্তিশালী থাকে। কিন্তু তেলের দাম ৬০ বা ৪০ ডলারে নেমে আসলে দ্রুত সংকট তৈরি হতে পারে।
আরও পড়ুন: অভাবের কারণে স্ত্রীকে ভাড়া দিলেন মিজান, আটক দম্পতি
রিবাকোভা ও উইফার দুজনেই সতর্ক করেছেন, রুশ অর্থনীতিতে স্পষ্ট কিছু সমস্যা দেখা দিলেও যুদ্ধের অর্থায়ন চালিয়ে যেতে পারবে।
বর্তমানে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বছর বছর যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম হতে পারেন। সামনের সারিতে হয়তো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নাও হতে পারে, কিন্তু ইউক্রেনের যুদ্ধে সম্পদ ঢালার সক্ষমতা মস্কোর থাকবে।
উইফার বলেন, বাজেট ঘাটতি চলতে থাকলেও রাশিয়া অর্থের জোগান দিতে পারবে। আগামী ১২ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে দেশটি কোনো বড় ধরনের আর্থিক সংকট বা দুর্বল ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানে পড়বে না।
তবে রাশিয়ার অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন উইফার। তার মতে, যুদ্ধের ব্যয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিকৃতি তৈরি করছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
আরও পড়ুন: নিকাহ্ রেজিস্ট্রারদের কর্মএলাকা অবসর পর্যন্ত বহাল রাখার দাবি
এতে সরকারের মধ্যেও মতবিরোধ সৃষ্টি হচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে ক্রেমলিনের মধ্যে বিভেদ তৈরি হচ্ছে। তাদের বক্তব্য হলো, বর্তমান অর্থনৈতিক পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না।
স্বর্ণ বিক্রি এখন রাশিয়ার আর্থিক সংকটের চূড়ান্ত সংকেত নয়। তবে এটি দেশটির বাজেটের ওপর বাড়তে থাকা চাপ এবং যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য ক্রমেই বাড়ছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন