০৮:২৬ এম
বছরের পর বছর ধরে চলা যুদ্ধের ফলে ইসরাইলজুড়ে অবিস্ফোরিত বোমা ও গোলাবারুদ ছড়িয়ে রয়েছে। এই বিস্ফোরকগুলোর প্রাণঘাতী প্রকৃতি আবারও প্রমাণিত হয়েছে দেশের উত্তরাঞ্চলে একটি শিক্ষাসফরের ঘটনায়।
সোমবার (১২ অক্টোবর) লেবানন সীমান্তের কাছে একটি বনাঞ্চলে হিজবুল্লাহর নিক্ষিপ্ত ক্লাস্টার বোমার অবিস্ফোরিত অংশ বিস্ফোরিত হয়ে এক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ২৪ জন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।
টাইমস অব ইসরাইলের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইসরাইলের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ধারণা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘর্ষের ফলে পড়ে থাকা শত শত, এমনকি হাজার হাজার অবিস্ফোরিত অস্ত্র রয়েছে।
আরও পড়ুন: আমাজন রেইনফরেস্টে প্রায় ১২ হাজার ৬০০ বছরের প্রাচীন শিলাচিত্র, আট মাইল বিস্তৃত ‘প্রাচীনকালের সিস্টিন চ্যাপেল’
ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের সময় হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরাইলে বেশ কয়েকটি বিআরবি১ (এ-০৯ নামেও পরিচিত) সাবমিউনিশন বহনকারী গ্র্যাড রকেট নিক্ষেপ করেছে। এই রকেটগুলো বিস্তীর্ণ এলাকায় ক্লাস্টার বোমার অংশ ছড়িয়ে দেয়, যা অনেক সময় মাটিতে আঘাত করার পরও বিস্ফোরিত হয় না।
সোমবারের ঘটনার ছবি দেখে ধারণা করা হচ্ছে, লেবানন সীমান্তের কাছে রামিম রিজ এলাকায় নাফতালি মাউন্টেনস ফরেস্টের একটি প্রাকৃতিক পথ ধরে হাঁটার সময় ওআরটি মাআলত স্কুলের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের একটি দল এমন একটি বোমার মুখোমুখি হয়েছিল। কর্তৃপক্ষ এ পথটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল।
হাঁটার সময় এক শিক্ষার্থী পথের ওপর বা কাছাকাছি পড়ে থাকা হিজবুল্লাহর একটি সাবমিউনিশন দেখতে পায় এবং সেটি তুলে নেয়। একপর্যায়ে বোমার ছোট অংশটি বিস্ফোরিত হয়, যার ফলে নবম শ্রেণির ১৩ বছর বয়সি শিক্ষার্থী নিহত হন এবং আরও ২৪ জন আহত হন, তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।
হিজবুল্লাহ ছাড়াও ইরান ও তাদের ইয়েমেনভিত্তিক মিত্রগোষ্ঠী হুথি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্লাস্টার বোমার ওয়ারহেডযুক্ত শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলে নিক্ষেপ করেছে। এসব বোমার কিছু অংশ মাটিতে পড়ার পরও বিস্ফোরিত হয়নি, ফলে সেগুলোর সামনে পড়ে যাওয়া মানুষের জন্য বিপদ থেকে যায়। তবে সোমবারের মতো প্রাণঘাতী বিস্ফোরণের ঘটনা বিরল।
আরও পড়ুন: ইরানে কবে হামলা চালাবে যুক্তরাষ্ট্র, জানা গেল ৯ নভেম্বর তারিখ
স্থলমাইনের মতো না হলেও এসব বোমা গোলান মালভূমি ও পশ্চিম তীরে এখনো বিপদ সৃষ্টি করছে। অবিস্ফোরিত ক্লাস্টার বোমার ওয়ারহেড পড়ে থাকতে পারে এমন এলাকা কর্তৃপক্ষের পক্ষে বেড়া দিয়েও ঘিরে রাখা সম্ভব নয়। এসব অস্ত্র বছরের পর বছর অচেনা অবস্থায় পড়ে থাকতে পারে, পরে কোনো ব্যক্তি অসতর্কভাবে সেগুলোর সংস্পর্শে এলে বিপদ ঘটতে পারে। এই হুমকি কতটা বিস্তৃত, তা নির্ভরযোগ্যভাবে নিরূপণের কোনো উপায় নেই।
অবিস্ফোরিত অস্ত্রের বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। কিছু অস্ত্রকে রকেট, গ্রেনেড বা শঙ্কু আকৃতির ওয়ারহেড হিসেবে চেনা গেলেও অন্যগুলো বিভিন্ন আকৃতির ছোট ধাতব পাত্রের মতো অতি সাধারণ দেখাতে পারে। অস্ত্রের ধরন অনুযায়ী বিস্ফোরণের শক্তি ব্যাপকভাবে ভিন্ন হয়। তবে ক্লাস্টার বোমার ওয়ারহেড থেকে বের হওয়া ছোট বোমার অংশও প্রাণঘাতী আঘাত হানতে সক্ষম।
এমন ঘটনা নতুন নয়
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবিস্ফোরিত অস্ত্রের কারণে বেসামরিক মানুষের নিহত বা আহত হওয়ার ঘটনা সোমবারের বিস্ফোরণই প্রথম নয়। আগস্টে উত্তরাঞ্চলীয় শহর মেতুলার কাছে একটি কৃষিজমিতে পুরোনো বিস্ফোরক বিস্ফোরিত হলে ছয় বিদেশি শ্রমিক আহত হন। গত তিন বছরে ওই এলাকায় ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে।
আরও পড়ুন: পারস্য উপসাগরে ট্যাংকারে হামলা, নিহত ১ নাবিক
একইভাবে, ২০২৪ সালের অক্টোবরে উত্তরাঞ্চলীয় কিবুতজ ইরোনের কাছে একটি বাগানে হিজবুল্লাহর আগে নিক্ষেপ করা একটি অস্ত্র বিস্ফোরিত হলে থাইল্যান্ডের ২৭ বছর বয়সি এক শ্রমিক নিহত হন এবং আরেকজন আহত হন। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে জর্ডান উপত্যকায় একটি সামরিক প্রশিক্ষণক্ষেত্রের কাছে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) আগে নিক্ষেপ করা অবিস্ফোরিত অস্ত্রের বিস্ফোরণে এক ফিলিস্তিনি শিশু নিহত এবং আরও দুই শিশু আহত হন।
ইসরাইলে অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণের দায়িত্ব তিনটি সংস্থার মধ্যে ভাগ করা হয়েছে। সেগুলো হলো- প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল মাইন অ্যাকশন অথরিটি, সামরিক বাহিনী ও পুলিশ। ২০১১ সালের মাইনফিল্ড ও অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণ আইন অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই সংস্থার দায়িত্ব হলো মাইনফিল্ড ও অবিস্ফোরিত অস্ত্র থাকা এলাকা অপসারণের পরিকল্পনা করা এবং অপসারণ কার্যক্রম পরিচালনা করা।
পাশাপাশি নিরাপদ আচরণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো ও ঝুঁকি কমাতে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া, পরিকল্পনা করা ও পরিচালনা করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রমের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া তাদের দায়িত্ব।
সংস্থাটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি নথিতে এর উদ্দেশ্য বলা হয়েছে। তা সত্ত্বেও, মঙ্গলবার আর্মি রেডিও জানায়, প্রাণঘাতী এই ঘটনার দায় নিতে অস্বীকার করেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, ‘শত্রুপক্ষের গোলাবর্ষণের ফলে পড়ে থাকা অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণ করা এই কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নয়- এটি পুলিশের কাজ।’
আরও পড়ুন: ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন কংগ্রেসম্যানের হিন্দুত্ববাদের ‘দ্ব্যর্থহীন নিন্দা’
সোমবারের প্রাণঘাতী বিস্ফোরণের ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ইসরাইল পুলিশের কমিশনার ড্যানি লেভি। তবে অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণে পুলিশের দায়িত্বের বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, শিক্ষা সফরটির জন্য সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেয়া হয়েছিল।
সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানায়, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মধ্যে বাস্তুচ্যুত বেসামরিক মানুষকে বাড়িতে ফিরতে দেয়ার জন্য উত্তর ইসরায়েলের প্রায় ৪০টি জনপদে বিস্তৃত অভিযান চালানো হয়েছে। এর লক্ষ্য ছিল- সামরিক সরঞ্জাম সরানো, বর্জ্য পরিষ্কার করা এবং অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণ করা। তবে এ বছর লেবাননের এই গোষ্ঠীর সঙ্গে সর্বশেষ দফার লড়াইয়ের পর একই ধরনের কোনো অভিযান চালানোর ঘোষণা দেয়নি আইডিএফ।
ইসরাইল ট্রেইল ধরে তিন দিনের শিক্ষা সফরটির অনুমোদন দিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অথচ ওই এলাকায় ইহুদি জাতীয় তহবিল কেকেএল-জেএনএফের টাঙানো একটি সাইনবোর্ডে যুদ্ধের ক্ষতি সম্পর্কে সতর্ক করে বন ও ক্যাম্পসাইটে প্রবেশে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছিল। ২০২৫ সালের মে মাসে কেকেএল-জেএনএফের ওয়েবসাইটেও একই ধরনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
মঙ্গলবার আর্মি রেডিওকে কেকেএল-জেএনএফের চেয়ারম্যান আইয়াল অস্ট্রিনস্কি বলেন, পথটি বন্ধ ছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কেন সেখানে শিক্ষা সফরের অনুমোদন দিয়েছিল, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তিনি বলেন, ইসরাইল সোসাইটি ফর দ্য প্রোটেকশন অব নেচারের পরিচালিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অপারেশনস রুমকে আগেই জানানো হয়েছিল যে এলাকাটি বন্ধ।
আরও পড়ুন: ৭ শর্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের পারমাণবিক প্রস্তাব পাঠানো
এক বিবৃতিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, শিক্ষা সফরের অনুমোদিত পথটি কোনো নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করেনি। এতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়, দলটি হয়তো নির্ধারিত পথ থেকে সরে গিয়েছিল।
মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, সফরের অনুমোদন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে স্পষ্ট নিরাপত্তা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ বা অবিস্ফোরিত অস্ত্র স্পর্শ করার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং এ ধরনের কোনো বস্তু দেখামাত্র তা জানানোর নির্দেশনাও ছিল।
অবিস্ফোরিত অস্ত্রের প্রকৃত সংখ্যা অজানা। বিশেষ করে জনসাধারণের হাঁটাচলার জন্য উন্মুক্ত বনাঞ্চল কিংবা কৃষিশ্রমিকদের কাজের মাঠে এসব অস্ত্রের উপস্থিতি এবং সীমিত অপসারণ কার্যক্রমের কারণে একই ধরনের ট্র্যাজেডি ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে ইসরাইল। এছাড়া বহুদিন পড়ে থাকার কারণে মাটির নিচে চলে যাওয়ায় অনেক সময় হাঁটাচলায় চোখে পড়ে না অস্ত্রগুলো। ফলে বড় ধরনের প্রাণঘাতী ঝুঁকির মধ্যে দিয়েই দিন পার করছে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার ইসরাইলিরা।
সূত্র: টাইমস অব ইসরাই
আরও পড়ুন: অমাবস্যার অন্ধকারে ইরানে হামলার পরিকল্পনা ট্রাম্পের
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন