০৩:২১ এম
প্রবাসে ভারতীয়রা কীভাবে বৈষম্য ও বর্ণবাদের শিকার হন, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দীর্ঘ পোস্ট লিখেছিলেন আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন প্রবাসী ভারতীয় লেখক নিবেদিতা শুক্লা। কিন্তু সেই পোস্টের শেষ অংশে এক পাকিস্তানি নাগরিকের প্রতি নিজের চরম বৈষম্যমূলক ও অমানবিক আচরণের কথা প্রকাশ করার পর, ইন্টারনেটে তিনি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। এই লেখিকার পরিচিতি ‘দ্য মোমেন্টোস অব রুনঝ’ বইয়ের লেখিকা হিসেবে।
জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দর থেকে নিজের ১০ ঘণ্টার ট্রানজিটের অভিজ্ঞতার কথা এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে শেয়ার করেন নিবেদিতা। তিনি লেখেন, বিমানবন্দরে তিনি এমন এক ব্যক্তিকে দেখেন, যাকে দেখে তিনি মনে করেন আর্থিকভাবে অসচ্ছল। সহানুভূতিশীল হয়ে, নিজের সঙ্গে থাকা খাবার নিয়ে ওই ব্যক্তির দিকে এগিয়ে যান।
আরও পড়ুন: প্রযুক্তি জায়ান্টদের ইউক্রেনীয়দের রক্তের বিনিময়ে ব্যবসার অভিযোগ
কথোপকথনের শুরুতে, নিবেদিতা হিন্দিতে জিজ্ঞেস করেন, তিনি ডাবলিন থেকে এসেছেন কিনা। ব্যক্তি ইতিবাচক উত্তর দেন। এরপর যখন নিবেদিতা জানতে চান, তার গন্তব্য কোথায়, তখন ব্যক্তিটি উত্তর দেন— ‘করাচি, পাকিস্তান!’ লেখিকার দাবি অনুযায়ী, এই উত্তর শোনার পরই তিনি খাবার না দিয়েই ঘুরে দাঁড়ান এবং নিজের আসনে ফিরে আসেন। শুধু তাই নয়, নিজের এক্স পোস্টটি তিনি শেষ করেন ‘যা মর’ (যাও, গিয়ে মরো) নামক একটি চরম আপত্তিকর এবং নিষ্ঠুর হিন্দি বাক্যাংশ দিয়ে।
নিজে প্রবাসে পাসপোর্ট বা নাগরিকত্বের কারণে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন—এমন অভিযোগ দিয়ে পোস্টটি শুরু করলেও, পাকিস্তানি নাগরিকের প্রতি তার এমন আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন খোদ ভারতীয় নেটিজেনরাই। বর্ণবাদী আচরণের জন্য মন্তব্যকারীরা নিবেদিতাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন।
এক ভারতীয় ব্যবহারকারী লেখেন, ‘আপনি তিনটি প্যারাগ্রাফ ধরে এই নিয়ে আক্ষেপ করলেন যে মানুষ আপনার পাসপোর্ট দেখে আপনাকে বিচার করে। আর পরের মুহূর্তে আপনি একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে তার পাসপোর্ট দেখে বিচার করলেন! এই গল্পে আপনি বৈষম্যের শিকার নন, বরং আপনি নিজেই বৈষম্যের একটি নিকৃষ্ট উদাহরণ।’
অন্য একজন ব্যবহারকারী ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণকে দায়ী করে বলেন, ‘এই ধরনের মানসিকতার কারণেই আজ বিশ্বজুড়ে আমাদের (ভারতীয়দের) ঘৃণা ও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। চরমপন্থী রাজনৈতিক প্রচার বা পারিবারিক শিক্ষার কারণে আপনার মতো বহু ভারতীয়র মনে এখন এই ঘৃণা বিষের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।’
আরও পড়ুন: আন্তর্জাতিক ই-কমার্সে রিমার্কের শক্ত অবস্থান, বিশ্ববাজারে যাচ্ছে হাজারো পণ্য
আরেকজন মন্তব্যকারী সরাসরি বলেন, ‘আপনি যে মনোভাব এবং মানসিকতা আপনার টুইটে দেখিয়েছেন, ঠিক এই মানসিকতার কারণেই আপনাকেও হয়তো অন্য কোথাও অবহেলা করা হয়।’ কেই কেউ বিষয়টিকে মনোস্তাত্ত্বিক ‘প্রোজেকশন’ হিসেবে উল্লেখ করে লেখেন, ‘আপনার প্রতিটি অভিযোগই আসলে আপনার নিজের চরিত্রের স্বীকারোক্তি।’
ঘটনাটিতে পাকিস্তানি নাগরিকেরাও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এক পাকিস্তানি ব্যবহারকারী লেখেন, ‘আমি কখনো কোনো পাকিস্তানিকে একজন ভারতীয়র সঙ্গে এমন আচরণ করতে দেখিনি বা শুনিনি। আপনার মন এতটা কলুষিত কেন?’ আরেকজন লেখেন, ‘আপনি প্রমাণের চেষ্টা করলেও আসলে পাকিস্তান সফরকারী কোনো ভারতীয়র সঙ্গে এখানে এমন আচরণ করা হয় না।’
প্রবাসী জীবনের প্রেক্ষাপট টেনে অন্য একজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, ‘বাইরে বের হলে এই সংকীর্ণ মানসিকতাগুলো পেছনে ফেলে আসা উচিত। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আমরা সবাই সমমানের যাত্রী। আমি নিজেই এমন অনেক ভারতীয় দেখেছি যারা আমার ক্ষতি করেছে, আবার অনেক পাকিস্তানিকে পেয়েছি যারা আমাকে সাহায্য করেছে।’
নিজের দেশের মানুষই এই বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে, এক নেটিজেন লেখেন, ‘আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে আপনার নিজের দেশের এবং ধর্মের মানুষই আপনার এই বর্ণবাদী ও ঘৃণ্য কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে।’
আরও পড়ুন: ভ্যান্সকে গালিবাফের খোঁচা: বসকে এসব বলছেন না কেন?
তীব্র সমালোচনার মুখে পড়া এই পোস্টটি বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৈষম্য, মানবিকতা, ও জাতীয়তাবাদী সংকীর্ণতার একটি বড় বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন