১১:৫১ এম
দেশের বেশ কয়েকটি এলাকা থেকে সম্প্রতি জব্দ করা বোমা ও বেامাসদৃশ বস্তুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে মতিঝিল, আশুলিয়া, সাভার ও কেরানীগঞ্জ থেকে পাওয়া বোমাগুলোতে 'টাইমার' যুক্ত ছিল।
সমস্ত বোমা ছিল ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি)। দৈনিক সমকালের একটি প্রতিবেদন থেকে পুলিশের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
গত বুধবার সাভারের শ্যামপুরে বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধার সংক্রান্ত ঘটনায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা ৬-৭ জনকে আসামি করে সাভার থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশের পোশাকশিল্প: সংকট ও উত্তরণের জন্য জাতীয় কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজন
মামলায় গ্রেপ্তার মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরান প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, তিনি নব্য জেএমবির মতাদর্শে বিশ্বাসী হলেও বোমা তৈরিতে যুক্ত নন। তিনি কেবল সেগুলো বহন করতেন। গতকাল বৃহস্পতিবার ইমরানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ছয় দিনের হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। তবে মামলাটি অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটে (এটিইউ) হস্তান্তর করা হয়েছে।
এদিকে, সাভারের সাধাপুর এলাকায় প্রেশার কুকার বোমা জব্দের ঘটনায় গতকাল মামলা করা হয়েছে।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, মঙ্গলবার রাত ১টার দিকে স্থানীয় একজন ব্যক্তি দেখেন, অপরিচিত ৬-৭ জন ঘোরাঘুরি করছেন। আশপাশের লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা দ্রুত পালিয়ে যান। পরবর্তীতে সেখানে প্লাস্টিকের ড্রামের ভেতর প্রেশার কুকার বোমাটি উদ্ধার করা হয়। পরদিন সেটি নিষ্ক্রিয় করে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল।
কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) সূত্রে জানা গেছে যে, বর্তমানে সরকার জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে পরিস্থিতি অনুযায়ী তুলনামূলকভাবে 'সফট পদ্ধতি' অনুসরণের চেষ্টা করছে।
আরও পড়ুন: আজ ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায়
ডির্যাডিক্যালাইজেশন বা উগ্রবাদ থেকে বের করে আনার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আইনগত প্রক্রিয়া ও পুনর্বাসনমূলক পদ্ধতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশের দাবি, নব্য জেএমবির সদস্যরা অর্থ লেনদেন ও যোগাযোগের জন্য বিভিন্ন ধরনের অ্যাপ ব্যবহার করতেন। 'প্রটেক্টেড টেক্সট' ধরনের অ্যাপের মাধ্যমে তারা অর্থ লেনদেন করতেন। নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য আরেকটি অ্যাপ ব্যবহারের তথ্যও পুলিশ পেয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, তাদের মতাদর্শে বিশ্বাসী অনেকেই ব্যাগ বহন করতেন এবং এতে ছোট আকারের ককটেল রাখতেন। পাশাপাশি বাসা ভাড়া নিয়ে সেখানে বোমা তৈরির রাসায়নিক দ্রব্য ও বিভিন্ন সরঞ্জাম সংরক্ষণ করার তথ্য মিলেছে।
সিটিটিসি সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ডিসেম্বরে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ এবং সাভারে বোমা বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থল থেকে ট্রাইঅ্যাসিটোন ট্রাইপারঅক্সাইড (টিএটিপি) পাওয়া যায়। এটি একটি বিপজ্জনক ও শক্তিশালী জৈব পারঅক্সাইড বিস্ফোরক। এ ছাড়া হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড, নাইট্রিক অ্যাসিডসহ প্রায় ১০ কেজি গুঁড়া পাউডার ও বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: তেল-সার-গার্মেন্টসকে কেন্দ্র করে ষড়যন্ত্র চলছে: ত্রাণমন্ত্রী
গত ৩০ জুলাই ঢাকার আশুলিয়ার চারাবাগ এলাকায় জয়ী জেনারেল স্টোরের সামনে থেকে স্কচটেপে মোড়ানো প্রেশার কুকার সদৃশ একটি বোমা উদ্ধার করা হয়। এতে আইইডির উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, প্রেশার কুকারকে সন্দেহজনক মনে না হওয়ায় এটি বোমা তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রেশার কুকারের ওপরের বাষ্প বা গ্যাস বের হওয়ার অংশটিও বোমার কাঠামোর অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
সিটিটিসি সূত্রে জানা যায়, বিস্ফোরণের পর বোমাগুলোতে বল, বিয়ারিং ও অ্যান্টেনার মতো বিভিন্ন উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এসব আলামত থেকে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, বোমাগুলো দূরনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে বিস্ফোরণের উপযোগী করে তৈরি করা হতে পারে। তাদের মতে, এ ধরনের বোমা যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বোমা তৈরিতে আধুনিক প্রযুক্তি ও রাসায়নিক ব্যবহারের আলামত পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক হতে পারে বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
সিটিটিসি সূত্রে আরও জানা যায়, বোমাসদৃশ কোনো বস্তু পাওয়া গেলে সেগুলো বিস্ফোরণের আগেও দূরনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে বিস্ফোরিত হতে পারে। তাই উদ্ধার ও নিষ্ক্রিয় করার পুরো প্রক্রিয়াটি ঝুঁকিপূর্ণ। বোমা নিষ্ক্রিয় করার সময় পর্যাপ্ত ফাঁকা জায়গা প্রয়োজন হয়। কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সাধারণ মানুষের উপস্থিতির কারণে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। সাভারে বোমা বিস্ফোরণের পর তদন্তকারীরা ধারণা পাচ্ছেন, এসব বোমা কতটা শক্তিশালী হতে পারে।
সিটিটিসির তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, মতিঝিল, আশুলিয়া ও সাভারের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, তারা সবাই নব্য জেএমবির সদস্য। কেরানীগঞ্জের আল-আমিন, মামুন, রাব্বি ও যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত রাকিব একই মতাদর্শে বিশ্বাসী বলে তদন্তে জানা গেছে।
আরও পড়ুন: জাতীয় নাগরিক পার্টি থেকে সামান্তা শারমিনের পদত্যাগ
এদিকে বরিশাল জেলা ও দায়রা জজ আদালতপাড়ায় বুধবার বিস্ফোরণ ঘটানো বিস্ফোরকটি সেখানে আগে পুঁতে রাখা হয়েছিল নাকি নিক্ষেপ করা হয়েছে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পরেও এ বিষয়ে পুলিশের স্পষ্ট তথ্য মেলেনি। এমনকি বিস্ফোরকের ধরন ও প্রকৃতি সম্পর্কে পুলিশ এখন পর্যন্ত সুস্পষ্ট ধারণা পায়নি। এসব নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তোলা হলে পুলিশের দায়িত্বশীলরা উত্তর দিচ্ছেন, 'তদন্ত ও ফরেনসিক প্রতিবেদন ছাড়া কিছু বলা যাবে না।'
জানা গেছে, বুধবার বিকেলে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সভাকক্ষে কয়েক ঘণ্টা রুদ্ধ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সকল বিচারক ও মহানগর পুলিশ কমিশনারসহ সকল ইউনিটের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সভায় উপস্থিত ছিলেন।
সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে, বিস্ফোরকটি আগেই পুঁতে রাখা হয়েছিল। গত কয়েকদিনে আদালত এলাকায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং হয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকলে সিসি ক্যামেরা কার্যকর থাকে না। ধারণা করা হচ্ছে, লোডশেডিং চলাকালে বোমাসদৃশ বস্তু পুঁতে রাখা হতে পারে।
পুলিশের বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার তদন্ত করছে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট। ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: ৭ নভেম্বর পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে বিজিএমইএ
ক্রাইম সিন ইনচার্জ খলিলুর রহমান জানান, ঘটনাস্থল থেকে কাচের গুঁড়া, প্লাস্টিকের টুকরা ও বারুদের উপকরণ সংগ্রহ করা হয়েছে। সিআইডির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা ব্যাপক বিধ্বংসী কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তবে বিস্ফোরণের ধরন ও ব্যবহৃত উপাদান পরীক্ষার আগে এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো মন্তব্য করা যাবে না।
কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আল মামুন উল ইসলাম সমকালকে জানান, আদালত চত্বরে বিস্ফোরণের ঘটনায় কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক মো. কামরুল হায়দার রুবেল বাদী হয়ে বুধবার রাতে মামলা দায়ের করেছেন। তবে এতে নাম উল্লেখ করে কাউকে আসামি করা হয়নি।
বিস্ফোরকটি ঘটনাস্থলে আগেই পুঁতে রাখা হয়েছিল, নাকি নিক্ষেপ করা হয়েছে–এ প্রশ্নে ওসি বলেছেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাবে না। বরিশাল মহানগর পুলিশ কমিশনার আবু রায়হান মোহাম্মদ সালেহ বলেন, সিসিটিভি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা মতে ধারণা করা হচ্ছে, বাইরে থেকে বিস্ফোরক দ্রব্যটি কেউ ছুড়েছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাবে না। পুলিশ কমিশনারের দাবি, বিস্ফোরকটি পটকা জাতীয় কিছু হবে। ভীতি সৃষ্টির জন্য কে বা কারা আদালতপাড়ায় বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে।
আরও পড়ুন: ঢাকা মেট্রোরেলসহ তিন প্রকল্পে কোরিয়ার অর্থায়ন চায় বাংলাদেশ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন