০৭:৪৭ পি.এম
ঢাকা, ১ নভেম্বর, ২০২৬ : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং নতুন প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির ফলে সৃষ্ট সাইবার ঝুঁকি মোকাবেলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এআইভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
এ উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করেছে। দেশের আর্থিক খাতের পরিবর্তিত সাইবার নিরাপত্তার চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এই নীতিমালা তৈরি করা হবে।
প্রস্তাবিত নীতিমালায় তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোকে শক্তিশালী করা, সাইবার হামলা শনাক্ত করার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং জটিল সাইবার আক্রমণ মোকাবেলায় নিরাপত্তাব্যবস্থা হালনাগাদ করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর উদ্যোগে সাইবার নিরাপত্তা সেমিনার অনুষ্ঠিত
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জাকির হাসান বাসসকে জানান, ‘আমরা শিগগিরই নীতিমালাটি প্রণয়ন করে তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেব। ওই নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা হালনাগাদ করবে।’
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক বিস্তারিত নির্দেশনা জারি করেছে। এই নির্দেশনা অনুসারে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে।
জাকির হাসান বলেন, সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি পর্যবেক্ষণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞ দল রয়েছে। সাইবার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা একটি চলমান প্রক্রিয়া। এর জন্য সার্বক্ষণিক সতর্কতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার নিয়মিত হালনাগাদ প্রয়োজন।
তিনি উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক সাইবার নিরাপত্তা উদ্বেগ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তবে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো সমস্যার সম্মুখীন হয়নি।
আরও পড়ুন: জবি দিবসে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, চার প্লাটুন পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা মোতায়েন
বাংলাদেশ ব্যাংক গত ২৯ মার্চ ‘সাইবার সিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্ক, ভার্সন ১.০ (২০২৬)’ জারি করেছে। এই কাঠামোর আওতায় তফসিলি ব্যাংক, ফাইন্যান্স কোম্পানি, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রদানকারী, পেমেন্ট সার্ভিস প্রদানকারী এবং পেমেন্ট সিস্টেম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি অভিন্ন সাইবার নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকসহ নিয়ন্ত্রণাধীন আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এই কাঠামো বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করেছে।
এই কাঠামোতে সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও নিয়ন্ত্রণ, তথ্য ও প্রযুক্তি অবকাঠামোর সুরক্ষা, সাইবার হুমকি পর্যবেক্ষণ, নিরাপত্তাজনিত ঘটনা মোকাবিলা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, তৃতীয় পক্ষের সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও আউটসোর্সিং কার্যক্রমের ঝুঁকি মোকাবিলা, নিরাপত্তা নিরীক্ষা এবং নির্দেশনা পরিপালন পর্যবেক্ষণের বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
আরও পড়ুন: পোশাক শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা ও উৎপাদন-রপ্তানি সচল রাখতে হবে : প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ
কাঠামোটি ছয়টি মূল কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। এগুলো হলো—ঝুঁকি ও দুর্বলতা শনাক্ত করা, সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা, হুমকি শনাক্ত করা, আক্রমণ মোকাবিলা করা, স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধার করা এবং প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন তৈরি করা। এর মাধ্যমে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাইবার হামলার আগেই প্রস্তুতি নেওয়া, হামলার সময় সম্ভাব্য ক্ষতি সীমিত রাখা এবং হামলার পর দ্রুত স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে আসার সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
আর্থিক খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বৃদ্ধির সাথে সাথে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তায় নানা চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি হচ্ছে। এআইভিত্তিক প্রযুক্তি বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ, লেনদেনের অস্বাভাবিক ধরন শনাক্ত এবং সন্দেহজনক কার্যক্রম চিহ্নিত করতে সহায়তা করতে পারে। অন্যদিকে, সাইবার অপরাধীরা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বাসযোগ্য ভুয়া বার্তা তৈরি, স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাইবার হামলা পরিচালনা, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় নকল এবং গ্রাহকদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলতে পারে। এমনকি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশের চেষ্টাও হতে পারে।
এ কারণে ব্যাংকগুলোকে প্রযুক্তিগত সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি দক্ষ জনবল, কার্যকর ব্যবস্থাপনা, সফটওয়্যারের সময়মতো হালনাগাদ এবং সাইবার হামলা মোকাবিলার সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে। প্রস্তাবিত নীতিমালার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বিদ্যমান প্রযুক্তি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে পারবে। তবে নীতিমালার সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো কমিটির সুপারিশ ও চূড়ান্ত নীতিমালার ওপর নির্ভর করবে।
সাইবার নিরাপত্তা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা গত ২২ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘটনায় আরও স্পষ্ট হয়েছে। আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা সতর্কতার পরিপ্রেক্ষিতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ওই দিন ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আরও পড়ুন: বাবার কাঁধে চড়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে আসা জিন্নাত এইচএসসিতে উত্তীর্ণ
ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন তৈরিতে বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপির কয়েকটি গুরুতর নিরাপত্তা দুর্বলতা নিয়ে এ সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। গত ২১ অক্টোবর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর যৌথ সতর্কবার্তায় বলা হয়, এসব দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে সাইবার অপরাধীরা আক্রান্ত সার্ভারে ক্ষতিকর কোড চালাতে পারে। দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদ করা সম্ভব না হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি দল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করার পর গত ২৫ অক্টোবর সকাল ৮টায় ওয়েবসাইটটি আবার চালু করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান ওই সময় বাসসকে বলেন, কোনো ব্যাংকের ওয়েবসাইট হ্যাক হয়নি। ডিজিটাল লেনদেনসহ ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনায়ও কোনো ঝুঁকি নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইবার হামলার ঘটনা নিশ্চিত না হলেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, সময়মতো নিরাপত্তা হালনাগাদ এবং সার্বক্ষণিক নজরদারির গুরুত্ব তুলে ধরেছে ওয়েবসাইট সাময়িক বন্ধ রাখার এ ঘটনা।
আরও পড়ুন: রাজউকের প্লট দুর্নীতিতে শওকত আজিজ রাসেল কারাগারে
এদিকে, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স (এসবিএসি) ব্যাংক পিএলসির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসারে তাদের ব্যাংক সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা আমাদের সাইবার নিরাপত্তা অবকাঠামো শক্তিশালী করছি। এ ক্ষেত্রে ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং গ্রাহকদের তথ্য সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অন্যান্য প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সাইবার হুমকি আরও জটিল হয়ে উঠছে। তাই ব্যাংকগুলোকে সব সময় সতর্ক থাকতে হবে এবং নিয়মিত নিরাপত্তাব্যবস্থা হালনাগাদ করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু উন্নত প্রযুক্তি থাকলেই হবে না; দক্ষ জনবল, নিয়মিত কর্মী প্রশিক্ষণ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।
আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘সাইবার নিরাপত্তা এককালীন কোনো উদ্যোগ নয়, এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। ব্যাংকগুলোকে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে হবে, সম্ভাব্য দুর্বলতা চিহ্নিত করতে হবে এবং সন্দেহজনক কার্যক্রমের বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যাংকিং সেবার নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষায় আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
আরও পড়ুন: রাশেদের ‘আমার দেশ’ পত্রিকা ছেঁড়ার ঘটনায় মানবাধিকার পরিষদের তীব্র নিন্দা
সাইবার নিরাপত্তা জোরদার, প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি বাড়ানো এবং নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন ডিজিটাল আর্থিক সেবা নিশ্চিত করতে উদীয়মান ঝুঁকি সম্পর্কে তথ্য বিনিময়ে ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশের আর্থিক খাত ক্রমেই ডিজিটাল ব্যাংকিং, মোবাইল আর্থিক সেবা, অনলাইন পেমেন্ট এবং পরস্পর সংযুক্ত প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। এসব সেবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষা, লেনদেনের নিরাপত্তা এবং আর্থিক কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বড় ধরনের সাইবার হামলায় ব্যাংকিং সেবা ব্যাহত হতে পারে, সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস হতে পারে এবং ডিজিটাল আর্থিক সেবার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে। তাই পুরো আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, সাইবার হামলা মোকাবিলা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কার্যক্রম পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
এআইভিত্তিক নতুন সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা এবং বিদ্যমান সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো দেশের আর্থিক খাতকে দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল ঝুঁকির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও একটি পদক্ষেপ। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার ধারাবাহিক উন্নয়নের ওপর।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অন্যান্য নতুন প্রযুক্তি আর্থিক সেবার ধরন বদলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ, স্থিতিশীল ও আস্থাশীল ডিজিটাল ব্যাংকিং পরিবেশ গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন