১২:২০ পি.এম
ইরান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারককে সরাসরি 'পিছু হটা' হিসেবে উপস্থাপন না করে বরং 'রাজনৈতিক প্রতিরোধ ও কৌশলগত বিজয়' হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ইরান সরকারের এ অবস্থান এমনভাবে গঠন করা হচ্ছে যাতে বোঝানো যায় যে, চাপের মুখে নয়, বরং নিজেদের শর্তে তারা এই পর্যায়ে এসেছে। তবে বাস্তবতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এই ব্যাখ্যাকে আরও জটিল করে তুলছে।
বর্তমানে ইরান একটি যুদ্ধ-পরবর্তী কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। সাম্প্রতিক সংঘাতে দেশটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, অর্থনীতি ব্যাপক সংকটে পড়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে। একইসঙ্গে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক বিভাজনও তীব্র হয়ে উঠেছে।
ক্ষমতাসীন ইসলামি সরকারটির ভেতরের একটি অংশে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সমঝোতার বিরোধিতা চলতে থাকছে। এই বিভক্ত বাস্তবতার মধ্যেই তেহরান চুক্তিটিকে 'গ্রহণযোগ্য সাফল্য' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ইতোমধ্যে চুক্তির পক্ষে ইতিবাচক বার্তা দিতে শুরু করেছে। পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ এই সমঝোতাকে চূড়ান্ত বিজয়ের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
আরও পড়ুন: পুষ্টি ও গবেষণায় সহযোগিতা বাড়াতে বাকৃবি-নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনালের সমঝোতা
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই চুক্তিকে 'সম্ভাব্য রূপান্তরকারী' হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এটি কার্যকর হলে ইরানের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের অনেকাংশই কমে যেতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও পরিবর্তন আসতে পারে। সরকারের এই অবস্থানের পেছনে বড় একটি যুক্তি হলো যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের ঘোষিত সব লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। ইরানের দাবি অনুযায়ী, তাদেরকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায়নি, দেশে সরকার পরিবর্তন ঘটানো যায়নি এবং দেশের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করাও সম্ভব হয়নি।
তবে এই 'সাফল্যের বর্ণনা' ইরানের ভেতরেই সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। কট্টরপন্থি রাজনৈতিক শিবিরের কিছু সদস্য এমনকি চুক্তির খসড়াকে 'মার্কিন প্রভাবাধীন কাঠামো' বলে আখ্যা দিচ্ছেন। জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির এক ডেপুটি চেয়ারম্যানের মন্তব্য অনুযায়ী, এটি ইরানকে কার্যত ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে।
গত কয়েক মাস যাবত পার্লামেন্টের কট্টরপন্থি অংশ, রাষ্ট্রসমর্থিত গণমাধ্যম এবং কিছু রাজনৈতিক সমাবেশে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান আরো দৃঢ় হয়েছে। তাদের প্রধান যুক্তি হলো ওয়াশিংটনকে বিশ্বাস করা যায় না, এবং অতীতের আলোচনাগুলো কৌশলগত প্রতারণার অংশ ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কট্টর বিরোধিতা কিছুটা কমেছে, যা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে ইঙ্গিত দেয় যে চুক্তিটি শীর্ষ পর্যায়ের অনুমোদন পেয়েছে। যদিও এর মানে এই নয় যে দেশের ভেতরে পূর্ণ ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও ইরানকে আলোচনার পথে ঠেলে দিচ্ছে। দীর্ঘ যুদ্ধ, কঠোর নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সীমাবদ্ধতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দেশটিকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছে। সাধারণ মানুষের প্রধান উদ্বেগ এখন রাজনৈতিক স্লোগান নয় বরং দ্রব্যমূল্য, আয় এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা।
আরও পড়ুন: নিউইয়র্ক টাইমস: ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বলেছেন, ইরান সরাসরি অর্থ না পেলেও যদি নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়, তবে তারা বিপুল অর্থনৈতিক প্রবেশাধিকার পেতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তেহরান চুক্তিটিকে 'নির্ভরতা' নয় বরং পুনর্গঠন ও বিনিয়োগের সুযোগ হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে। তবে আলোচনা এখনও অনেক জটিল বিষয় রয়েছে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সীমা, যাচাই প্রক্রিয়া, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের শর্ত এবং আঞ্চলিক ইস্যু- এসব কিছুই এখনও চূড়ান্ত হয়নি। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে নতুন দফার আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাও পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত করে রেখেছে। ইসরায়েল ও লেবাননের পরিস্থিতি, গাজা-সংক্রান্ত উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান- সব মিলিয়ে এই সমঝোতার ভবিষ্যৎ এখনো ঝুঁকির মধ্যে রয়ে গেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই- এই সমঝোতা কি সত্যিই একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান হয়ে উঠবে, নাকি এটি কেবল আরেকটি সাময়িক বিরতি হিসেবে ইতিহাসে জায়গা পাবে।
আরও পড়ুন: চিনা স্যাটেলাইটে ধরা পড়লো ইরান ঘিরে ৩ মার্কিন রণতরী
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন