০৮:৩৭ পি.এম
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ এবং ভেঙে পড়া শান্তি উদ্যোগের মধ্যে পাকিস্তান আবারও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় সক্রিয় হয়েছে। ইসলামাবাদ এবার ইরানের দুই শীর্ষ নেতাকে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন হলো, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে গভীর অবিশ্বাসের এই সময়ে পাকিস্তান কি সত্যিই শান্তি আলোচনার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবে?
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার রাতে এক বিবৃতিতে জানায়, উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার টেলিফোনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাকে ‘সুবিধাজনক সময়ে যত দ্রুত সম্ভব পাকিস্তান সফরের’ আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ১৪ পয়েন্টে নাশকতার পরিকল্পনা আ.লীগের
সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, জাতীয় পরিষদের স্পিকার আয়াজ সাদিকও ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে ইসলামাবাদ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
কিন্তু রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দুই ইরানি কর্মকর্তা কবে পাকিস্তান সফরে যাবেন, সে বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
এদিকে পাকিস্তানের এ কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হলো, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আবারও শান্তি আলোচনা নিয়ে ‘প্রতারণামূলক আচরণের’ অভিযোগ তুলেছেন।
তিনি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, “তারা বৈঠকের অনুরোধ করে, কেউ কেউ বলবে অনুনয় করে। আলোচনা শুরু হয়, এবং আবারও বৈঠকের সময় নির্ধারিত হয়। এরপর তারা প্রকাশ্যে বলে, কোনও আলোচনা চলছে না।”
আরও পড়ুন: হুথিদের সউদী আরবের তেলক্ষেত্র, রিয়াদ বিমানবন্দর ও সেনাক্যাম্পে হামলার দাবি
পরবর্তীতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প ইরানকে আবারও ‘শেষ সুযোগ’ দিতে বলেন। তিনি বলেন, একটি ‘ভালো চুক্তিতে’ সই না করলে তেহরানকে ‘শিরশ্ছেদমূলক হামলার’ মুখোমুখি হতে হবে। একই সাথে তিনি আগের মতোই ‘চুক্তি অথবা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ’—এই দুই বিকল্পের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই স্পষ্টভাবে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বর্তমানে কোনও সরাসরি আলোচনা চলছে না।
তিনি বলেন, কেবল ওমানের মধ্যস্থতায় হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল পুনরায় চালু করার প্রযুক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বাঘাই আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপের ক্ষেত্রে পাকিস্তানই এখন প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। প্রয়োজন হলে কাতারও সহযোগিতা করবে।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলী উল্লেখ করে বলা যায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পাকিস্তান উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শন এবং কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছে।
আরও পড়ুন: ‘দার–এ–নিজাত’ ধারাবাহিকের ২৩ পর্বে ১৭০ কোটি ভিউ, পাকিস্তানের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড
এ বছরের চলতি মাসের এপ্রিল মাসে ইসলামাবাদে কয়েক দশকের মধ্যে প্রথম সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠকের আয়োজন করে পাকিস্তান। পরে জুন মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপস্থিতিতে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক সই হয়।
কিন্তু সেই সমঝোতার পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি কয়েক দিনের মধ্যেই ভেঙে পড়ে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করে। পরে নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলার মধ্যে সমঝোতা স্মারকও কার্যত অকার্যকর হয়ে যায়।
তবুও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানাচ্ছে, ওই সমঝোতাই এখনও শান্তি প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
আরও পড়ুন: রাজধানীতে আবারও যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিকাণ্ড
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সম্প্রতি বলেছেন, ইসলামাবাদ সমঝোতাই ভবিষ্যতে ইরানের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে থাকবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা এক বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, “শত্রুপক্ষকে তাদের স্বাক্ষরিত অঙ্গীকার মেনে চলতে বাধ্য করতে হবে। এই সমঝোতা আমাদের দেশ, অঞ্চল এবং মিত্রদের নিরাপত্তা আরও জোরদার করবে।”
কিন্তু বিশ্লেষকরা ভিন্ন মত পোষণ করছেন। পাকিস্তানে সাবেক ইরানি রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি মনে করছেন, ইসলামাবাদ সমঝোতা এখনও কার্যকর একটি ভিত্তিপ্রস্তর।
আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, “পাকিস্তান কেবল মধ্যস্থতার সুযোগ করে দিতে পারে এবং তারা আন্তরিকভাবেই সেটি করেছে। আন্তর্জাতিক মহলও সেই আন্তরিকতার স্বীকৃতি দিয়েছে।”
আরও পড়ুন: কংগ্রেস হাতছাড়া হতেই বিপাকে ট্রাম্প, ছেলে-জামাইয়ের দুর্নীতির তদন্ত শুরুর পথে ডেমোক্র্যাটরা
অন্যদিকে জার্মান মার্শাল ফান্ডের জ্যেষ্ঠ গবেষক গ্রেস ওয়ারমেনবোলের মতে, বারবার যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়া প্রমাণ করে যে, উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য প্রয়োজনীয় আস্থার ঘাটতি রয়েই গেছে।
কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেহরান কামরাভা মনে করেন, সমস্যার মূল কারণ পাকিস্তানের মধ্যস্থতা নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের সুস্পষ্ট কৌশলের অভাব।
তার ভাষায়, “যুক্তরাষ্ট্রের কোনও নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই, যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে তারও স্পষ্ট ধারণা নেই। তারা বারবার লক্ষ্য পরিবর্তন করছে।”
অন্যদিকে, তেহরানভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক সাইয়্যেদ মোজতবা জালালজাদেহ বলছেন, বারবার ব্যর্থতার কারণে পাকিস্তানের ভূমিকা এখন ‘সমাধানকারী মধ্যস্থতাকারী’ থেকে ‘যোগাযোগ সহজকারী’ পর্যায়ে নেমে এসেছে।
আরও পড়ুন: জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে ইবি ইউট্যাবের শ্রদ্ধা নিবেদন
তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, “পাকিস্তান যদি নিজের সক্ষমতার চেয়ে বেশি প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তার কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
এছাড়া, বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে সংকট নিরসনে পাকিস্তান একা কাজ করছে না।
হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করতে ইরান ও ওমান পৃথকভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইতিমধ্যেই সতর্ক করে বলেছেন, এমন কোনও সমঝোতা করা উচিত নয়, যাতে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি দায়িত্ব বণ্টনেরই অংশ।
হরমুজ প্রণালির প্রযুক্তিগত ও সামুদ্রিক বিষয়গুলো ওমান ও ইরান দেখছে। অন্যদিকে পাকিস্তান ও কাতার যুদ্ধবিরতি, নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তার মতো রাজনৈতিক বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো- তারা আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে পারে, চুক্তি করাতে পারে; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে সেই চুক্তি বাস্তবায়নে বাধ্য করার ক্ষমতা তাদের নেই।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের একের পর এক পরস্পরবিরোধী বক্তব্য নিয়েও মতভেদ রয়েছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে।
কেউ মনে করেন, এটি দরকষাকষির কৌশল; আবার কেউ বলছেন, এটি সুস্পষ্ট কৌশলের অভাবের প্রতিফলন।
গ্রেস ওয়ারমেনবোলের মতে, ট্রাম্প একই সঙ্গে সামরিক চাপ ও কূটনৈতিক আলোচনার পথ অনুসরণ করলেও এখনও পর্যন্ত কোনও ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য সাফল্য পাননি।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ জনপ্রিয় নয়। পাশাপাশি যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয়ও বাড়ছে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন এখন সংঘাতের প্রকৃত চিত্র আড়াল করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকদের অভিমত হলো, এমন বাস্তবতায় পাকিস্তানের নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ শান্তির সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তবে অবিশ্বাস দূর না হলে স্থায়ী সমাধান এখনও অনেক দূরের পথ হয়ে থাকবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন