০৬:৫৩ পি.এম
সড়কটির ঘন বনাঞ্চল হারিয়ে যাচ্ছে। গত ১৫ দিনে জামালগঞ্জ-সুনামগঞ্জ সড়কের এক হাজারেরও বেশি গাছ কাটা হয়েছে। রবিবার সকালে সড়কের নিয়ামতপুর এলাকায়।
সড়কজুড়ে রয়েছে সবুজের ছায়া। দুই পাশে স্ট্রাকচারালি বড় গাছগুলি ছিল। দীর্ঘকাল ধরে এসব গাছ সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ (সাচনা বাজার) সড়কটিকে বিশেষ সৌন্দর্য প্রদান করেছিল।
আরও পড়ুন: ফটিকছড়িতে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে যুবক জিসান নিহত, আহত ৪
তবে সড়কটির সেই সবুজের বড় অংশ এখন আর নেই। একটানা একের পর এক গাছ কেটে দেওয়া হচ্ছে। গত ১৫ দিনের মধ্যে কাটা হয়েছে এক হাজারের বেশি গাছ, এর ফলে অবশিষ্ট গাছগুলোর গায়েও পড়েছে কাটার চিহ্ন।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) এবং বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের আব্দুজ জহুর সেতু থেকে জামালগঞ্জ উপজেলার প্রাণকেন্দ্র সাচনা বাজার পর্যন্ত সড়কটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৯ কিলোমিটার। এই সড়কটির দুই পাশে রয়েছে গৌরারং, ইচ্ছারচর, বেড়াজালি, ইসলামগঞ্জ, আহমদাবাদ, নিয়ামতপুর, শালমারা, কলায়া, দুলবারচর, সংগ্রামপুর, শেরমস্তপুর, নজাতপুর, কুকড়াপশী, ভরতপুরসহ আরও বেশ কিছু এলাকা।
সরকারি নথির অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ সড়কের দুই পাশে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের মোট সংখ্যা চার হাজার ৮৮৪। এর বাইরে জ্বালানি কাঠ হিসেবে ২২৬টি গাছের উল্লেখ রয়েছে।
বন বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ২০০৩-২০০৪ সালে সামাজিক বনায়নের আওতায় এসব গাছের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তা কাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অনেক গাছ মারা যাচ্ছে এবং নিয়ম অনুযায়ী পরিপক্ব গাছ নিলামে বিক্রি করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: বাকেরগঞ্জে ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও ড্রেন পরিষ্কার কার্যক্রম
এদিকে গাছ কাটার এই কারণ নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। বন বিভাগের পক্ষ থেকে সড়ক সম্প্রসারণের কথা বলা হলেও সওজের পক্ষ থেকে উল্লিখিত সড়ক সম্প্রসারণের কোনো চলমান প্রকল্পের কথা জানানো হয়নি। ফলে গাছ কাটার পেছনে প্রকৃত কারণ কী তা নিয়ে চলছে আলোচনা।
স্থানীয় উপকারভোগীদের অভিযোগ, কয়েক কোটি টাকার সম্পদ বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম দামে বিক্রি করা হয়েছে। তারা বলছেন, গাছগুলো আরো কয়েক বছর জায়গায় রাখলে সরকারি সম্পদ থেকে বেশি রাজস্ব পাওয়া সম্ভব ছিল। একই সঙ্গে সামাজিক বনায়ন বিধিমালা অনুযায়ী উপকারভোগীরাও বেশি অর্থ পেতে পারতেন।
জানা গেছে, গাছ কাটার উদ্যোগ এই প্রথম নয়। ২০২৪ সালের মার্চে সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ সড়কের গাছ কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ওইসময় গাছের গায়ে লাল কালিতে নম্বর দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। গাছ বিক্রির জন্য দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা হয়েছিল, কিন্তু স্থানীয়দের প্রতিবাদ ও গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর সেই উদ্যোগ স্থগিত করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এবারের উদ্যোগে কৌশল পরিবর্তন করে সুনামগঞ্জ জেলা শহরের অংশ বাদ দিয়ে জামালগঞ্জ-ধর্মপাশা উপজেলায় সংযোগ উড়াল সড়কের জন্য সড়ক প্রশস্ত করার দোহাই দিয়ে জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনা বাজার অংশ থেকে গাছ কাটার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
আরও পড়ুন: জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উদ্যাপন
সড়কের দুই পাশে রয়েছে রেইনট্রি, কড়ই, আকাশমণি, অর্জুন, মেহগনি সহ বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ। সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় স্থানীয় উপকারভোগীদের পরিচর্যায় বেড়ে ওঠা এসব গাছ পথচারীদের ছায়া দেওয়া ছাড়াও পাখির আবাসস্থল হিসেবে কাজ করেছে।
রবিবার (২৩ আগস্ট) সকালে সরেজমিন দেখা যায় যে, সড়কের বিভিন্ন অংশে কেটে ফেলা গাছের গুঁড়ি ও বড় টুকরা পড়ে রয়েছে। কোথাও শ্রমিকরা গাছ কাটছেন, এবং কোথাও কাটা গাছ সরানো হচ্ছে। আগে ঘন সবুজে আচ্ছন্ন ছিল যে জায়গাগুলি, এখন তা ফাঁকা হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনা বাজারের বাসিন্দা মো. খুরশিদ মিয়া বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেখানে সারা দেশে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছেন, সেখানে সুনামগঞ্জ বন বিভাগ গাছ কাটার উদ্যোগ নিয়েছে। এটি সরকারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’
সুনামগঞ্জ বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘সামাজিক বনায়নের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় গাছগুলো কাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’ তিনি জানান, জামালগঞ্জ অংশের গাছ বিক্রি হয়েছে ৫৬ লাখ ৪৪ হাজার টাকায়। সদর অংশের গাছ বিক্রি হয়েছে ২৮ লাখ ৩৬ হাজার টাকায়। দুই অংশ মিলিয়ে বিক্রয়মূল্য ৮৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
আরও পড়ুন: ঢাকায় গিয়ে ৫ দিন ধরে নিখোঁজ শিশু ইমাম, সন্ধান চেয়ে পরিবারের আকুতি
রেঞ্জ কর্মকর্তা আরও জানান, সামাজিক বনায়ন বিধিমালা অনুযায়ী বিক্রির অর্থের ৫৫ শতাংশ পাবেন উপকারভোগীরা। বন অধিদপ্তর পাবে ১০ শতাংশ, ভূমির মালিক হিসেবে সওজ পাবে ২০ শতাংশ এবং ইউনিয়ন পরিষদ পাবে ৫ শতাংশ। অবশিষ্ট ১০ শতাংশ দিয়ে নতুন করে গাছ লাগানো হবে।
তিনি জানান, বন বিভাগের তালিকাভুক্ত টাঙ্গাইলের দুটি, সিলেটের একটি এবং দোয়ারাবাজারের একটি—মোট চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গাছ কাটার কার্যাদেশ পেয়েছে। নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গাছগুলো বিক্রি করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সাজেদুর রহমান বলেন, ‘সুনামগঞ্জ-সাচনা সড়ক প্রশস্ত করার কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়নি। গাছ কাটার বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কিছু জানা নেই। বন বিভাগ থেকে গাছ কাটার একটি দরপত্রের কপি তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।’
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মতিউর রহমান খান বলেন, ‘বর্তমান জেলা প্রশাসকের দায়িত্বকালে, অর্থাৎ গত তিন-চার মাসে এ ধরনের কোনো অনুমোদন হয়নি। তার আগে অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র ও ফাইল দেখে বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে।
আরও পড়ুন: কোম্পানীগঞ্জে মাটিবাহী ট্রাকের চাপায় মাদরাসা ছাত্রের মৃত্যু
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন