০৭:১৩ পি.এম
দেড় দশক আগে ঢাকায় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশ রাইফেলস-বিডিআররের (বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি) সদর দপ্তর পিলখানায় ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের মামলাটি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারের চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে। আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষ মামলার আপিল ও লিভ টু আপিলের জন্য সারসংক্ষেপ জমা দিয়েছে।
আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর প্রায় ১৭ বছর অতিবাহিত হয়েছে। আসামিপক্ষ দ্রুত আলোচিত মামলার আপিল-লিভ টু আপিলের শুনানি সম্পন্ন করার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের কোনো বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআরে বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিদ্রোহী জওয়ানদের হাতে ৫৭ সেনা কর্মকর্তা নিহত হন। মোট ৭৪ জন প্রাণ হারান, যার মধ্যে বেসামরিক ব্যক্তিরাও ছিলেন। বিদ্রোহের ফলে ঢাকার বাইরেও পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এ ঘটনার পর সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) রাখা হয়।
আরও পড়ুন: স্ত্রীর ছবি ফেসবুকে দেয়ায় বন্ধুকে হত্যা, কুয়েতে বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড
বিদ্রোহের ৫৭টি মামলার বিচার বাহিনীর নিজস্ব আদালতে সম্পন্ন হয়। সেখানে ছয় হাজার জওয়ানের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিদ্রোহের বিচারের পর ‘পিলখানা হত্যাকাণ্ড’ ও ‘বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে’ মামলার বিচার দেশের প্রচলিত আদালতে শুরু হয়।
২০১৩ সালে ঢাকার জজ আদালত হত্যাকাণ্ডের মামলায় রায় প্রদান করে। রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া ২৫৬ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। বিচারিক আদালতের রায় ঘোষণার পূর্বে চার আসামি মারা যান।
পরে এ মামলার ডেথ রেফারেন্স (বিচারিক আদালতের মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের আবেদন) হাইকোর্টে আসে। পাশাপাশি রায়ের বিরুদ্ধে আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। বিচারিক আদালতের রায়ে খালাস পাওয়া ২৭৮ জনের মধ্যে ৬৯ জনের খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। এসব আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর হাইকোর্ট রায় প্রদান করে।
বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ১৫২ জনের মধ্যে হাইকোর্ট ১৩৯ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। ৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন। আর ৫ আসামিকে খালাস দেওয়া হয় উচ্চ আদালত থেকে।
আরও পড়ুন: দুর্গাপুরে ডেপুটি স্পিকারের উদ্যোগে পুলিশ তদন্তকেন্দ্র স্থাপিত হচ্ছে
অন্যদিকে বিচারিক আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন দেওয়া ১৬০ আসামির মধ্যে হাইকোর্ট ১৪৬ আসামির সাজা বহাল রেখে ১৪ জনকে খালাস দেয়। বিচারিক আদালতের খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ৬৯টি আপিলের মধ্যে ৩১ জনের খালাস বাতিল করে তাদের যাবজ্জীবন ও ৪ জনকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দেন হাইকোর্ট।
বাকি ৩৪ জনের ক্ষেত্রে বিচারিক আদালতের খালাসের রায় বহাল রাখা হয়। সব মিলিয়ে ১৩৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন, ৪ জনের সাত বছরের কারাদণ্ড ও ৫৩ জনকে খালাস দেওয়া হয় উচ্চ আদালত থেকে।
রায়ে উল্লেখ করা হয়, ওই ঘটনা (বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ড) ছিল রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক-সামাজিক নিরাপত্তায় বিঘ্ন সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র। আইনজীবীরা জানান, হাইকোর্টের রায়ের আগে ১৫ জনসহ মোট ৫৯ জন আসামি মারা গেছেন।
হাইকোর্টের রায়ের তিন বছর পর ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলেও ২৯ হাজার ৫৯ পৃষ্ঠার রায়ের প্রত্যায়িত অনুলিপি তোলার খরচ, অনুলিপি পাওয়ার প্রক্রিয়া, আপিলের পেপারবুক তৈরিতে সময় লেগে যায় প্রায় দেড় বছর। গত বছর রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষ আপিলের সারসংক্ষেপ (কনসাইজ স্টেটমেন্ট) জমা দিলেও এখন পর্যন্ত শুনানি শুরু হয়নি।
আরও পড়ুন: সরকার পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন দমনের চেষ্টা করছে : নাহিদ ইসলাম
অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হাইকোর্টের রায়ে খালাস পাওয়া বা মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন হওয়া আসামিদের সাজা বাড়াতে ৩১টি লিভ টু আপিল দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে হাইকোর্টের রায়ে খালাস পাওয়া ৭৫ জনের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন পাওয়া ১৯ জনের শাস্তি বাড়ানোর আবেদন রয়েছে এসব লিভ টু আপিলে।
আসামিপক্ষের এক আইনজীবী জানিয়েছেন, ২২৬ জনের পক্ষে আপিল-লিভ টু আপিল করা হয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি আপিল হচ্ছে ১৩৯টি। বাকি লিভ টু আপিল। তবে লিভ টু আপিলের প্রকৃত সংখ্যা জানাতে পারেনি আসামিপক্ষ।
আইনজীবীদের তথ্য অনুযায়ী, আসামিপক্ষের আপিল ২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে ওঠে। সেদিন চেম্বার আদালত বিষয়টি আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে পাঠায়। এরপর আসামিপক্ষের আপিল গত বছরের ২৩ জানুয়ারি আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় ওঠে। আসামিদের এই আপিল ১৯ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় ৪০৫ নম্বর ক্রমিকে ছিল।
এ মামলায় ২২৬ আসামির পক্ষের আইনজীবী ছিলেন মো. আমিনুল ইসলাম; যিনি বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর। এই পদে থেকে আসামিপক্ষের হয়ে মামলা লড়ার সুযোগ আছে কিনা, জানতে চাইলে আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেহেতু এত বড় একটি মামলা। এই মামলায় শুনানির জন্য আপিল বিভাগের কাছে অনুমতি চাইব। আশা করি আপিল বিভাগ অনুমতি দেবেন।’
আরও পড়ুন: চলতি বছরে সারের আমদানি বাড়ানোর ঘোষণা কৃষিমন্ত্রীর
তবে আমিনুল ইসলাম জানান, বর্তমানে এই মামলায় আসামিপক্ষের মূল আইনজীবী আইনজীবী সুলতানা আক্তার রুবি। এই আইনজীবী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি দ্রুত মামলাটির শুনানি করার জন্য।’
বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় চলছে সাক্ষ্যগ্রহণ। পিলখানায় বিদ্রোহের ঘটনা যেমন পুরো বিশ্বে আলোড়ন তুলেছিল, তেমনি এক মামলায় এত আসামির সর্বোচ্চ সাজার আদেশও ছিল নজিরবিহীন। ওই ঘটনায় দুটি মামলার মধ্যে বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টে হত্যা মামলার রায় হলেও ১৬ বছরেও শেষ হয়নি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের বিচারকাজ।
প্রায় ১৭ বছর আগে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিস্ফোরক আইনের মামলায় দেড় শতাধিক আসামি জামিন হয় গত ১৯ জানুয়ারি। ঢাকার বিশেষ ট্রাইবুনাল-২ এর বিচারক মো. ইব্রাহিম মিয়া এই মামলায় তাদের জামিন মঞ্জুর করেন। তিনদিন পর তাদের কারামুক্তি ঘটে।
জানতে চাইলে পিপি মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় হত্যা মামলায় খালাস বা সাজাভোগ শেষে বিস্ফোরক মামলার কারণে ৪৬৮ বিডিআর সদস্যের মুক্তি আটকে ছিল। এর মধ্যে বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে করা মামলায় বেশিরভাগ আসামিরই জামিন হয়েছে। আরো জামিন আবেদন রয়েছে।’
আরও পড়ুন: আ.লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, ফ্যাসিবাদবিরোধীদের ঐক্য অটুট বলছেন নেতারা
সরকারের এই আইন কর্মকর্তা বলেন, ‘বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় এখন পর্যন্ত ৩০০ জনের বেশি সাক্ষীর জবানবন্দি বা সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।’
বৃহস্পতিবার এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য আছে বলে জানান বোরহান উদ্দিন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন