০৭:৫২ পি.এম
রাজশাহীর বাঘায় জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে রুমানা বেগম (৫৯) নামে এক বৃদ্ধাকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় থানায় দায়ের করা এজাহার, আসামি গ্রেফতার ও পরে ছেড়ে দেওয়া এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে নিহতের পরিবার। বিশেষ করে ২২ বছর বয়সী এক নারীকে কিশোরী উল্লেখ করে মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বজন ও স্থানীয়রা।
গত (২০ অক্টোবর ২০২৬) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার কেশরপুর কামারপাড়া গ্রামে এ হামলার ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত রুমানা বেগম রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৬ অক্টোবর মারা যান। তিনি ওই গ্রামের কামাল মন্ডলের স্ত্রী।
নিহতের ছোট ছেলে মোহন ইসলাম জনি (৩৫) অভিযোগ করেন, গত ২০ অক্টোবর জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষ মোসারফ হোসেন রেন্টু (৫৫), বেল্লাল আহমেদ বিদ্যুৎ (২৭), বিউটি (৫০) ও সাবানা খাতুন (২২) তাঁদের পরিবারের ওপর হামলা চালান। এ সময় লোহার রড ও ধারালো কাঁচি দিয়ে তাঁর মায়ের মাথায় এলোপাতাড়ি আঘাত করা হয়। এতে তাঁর মায়ের মাথা গুরুতরভাবে থেঁতলে যায়।
মাকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে তাঁর স্ত্রী শান্তাকেও ধারালো কাঁচি দিয়ে আঘাত করা হয়। এতে শান্তার হাতের তালু কেটে যায়। একই সময় তাঁর বড় ভাই বুলবুল এগিয়ে এলে তাঁকেও রড ও বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। এতে তিনি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যান।
পরে স্থানীয় লোকজন আহতদের উদ্ধার করে বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে রুমানা বেগমের অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয় দিন পর তিনি মারা যান। আহতদের মধ্যে বুলবুলের বাকশক্তি হারিয়ে গেছে বলেও দাবি করেন তাঁর ছোট ভাই জনি। তিনি আরও বলেন, এজাহারে ও সাবানা খাতুনের নাম দেওয়া হলেও এসআই ও ওসি অজ্ঞাত কারনে তার নাম বাদ দিয়ে দেন বলে দাবি করেন নিহতের ছেলে মোহন ইসলাম জনি।
নিহতের পুত্রবধূ শান্তা বলেন, ঘটনার দিন সকালে রেন্টু, বিদ্যুৎ, সাবানা ও বিউটি তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। এ সময় রেন্টু ও বিদ্যুৎ লোহার রড দিয়ে এবং সাবানা ধারালো কাঁচি দিয়ে তাঁর শাশুড়ির মাথায় আঘাত করেন। শাশুড়িকে বাঁচাতে গেলে সাবানা তাঁকেও কাঁচি দিয়ে আঘাত করেন।
শান্তার অভিযোগ, হামলার পর বিউটি ও সাবানা নিজেদের বাড়িতে আশ্রয় নিলে স্থানীয়রা তাঁদের অবরুদ্ধ করে পুলিশে খবর দেন। পরে বাঘা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), একজন উপপরিদর্শক (এসআই) ও সঙ্গীয় পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের আটক করে থানায় নিয়ে যান।
তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এজাহারভুক্ত আসামি সাবানাকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, আহত বুলবুল কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলায় সেই সুযোগে তাঁর স্বাক্ষর নিয়ে পুলিশ নিজেদের মতো করে এজাহার তৈরি করেছে।
এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মোঃ আনোয়ারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাবানা কিশোরী হওয়ায় মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। কারন তাঁর এজাহারে নাম ছিল না। তবেম তাঁর মা বিউটিকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
তবে সাবানা খাতুনের বয়স ২২ বছর এবং তিনি অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী, এমন তথ্য তুলে ধরে তাঁকে কিশোরী হিসেবে বিবেচনার কারণ জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা কোনো স্পষ্ট উত্তর দেননি বলে অভিযোগ করেন সাংবাদিকরা।
এ বিষয়ে বাঘা থানার ওসি সিরাজুল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাচ্ছি না। আপনার কিছু জানার থাকলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আনোয়ারকে জিজ্ঞাসা করেন। এ কথা বলেই তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
সার্বিক বিষয়ে মুঠো ফোনে জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) সাবিনা ইয়াসমি বলেন, আইনের দৃষ্টিতে আসামি শুধুই একজন অভিযুক্ত, তার বয়স বেশি নাকি কম, তা মুখ্য নয়। অপরাধে জড়িত কাউকেই থানা থেকে সরাসরি ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। যদি কোনো আসামি শিশু বা কিশোর-কিশোরী হয়, তবে আইন অনুযায়ী তার জন্য পৃথক আইনি প্রক্রিয়া (Child-friendly procedures) অনুসরণ করতে হবে, কিন্তু তাকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়ার কোনো বিধান আইনে নেই।
তিনি আরও বলেন, এই নির্দিষ্ট মামলার নথিপত্র বা বিস্তারিত তথ্য এই মুহূর্তে আমার কাছে নেই। আমি বিস্তুারিত জেনে আপনাকে পরে জানাতে পারব।
এদিকে ঘটনার পর থেকে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, এত বড় একটি হত্যাকাণ্ডের পরও পুলিশের দৃশ্যমান তৎপরতা নেই। হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত একজন কীভাবে থানা থেকে ছাড়া পেলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, অর্থের বিনিময়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি জনতার হাতে আটক ২২ বছর বয়সী সাবানাকে কিশোরী দেখিয়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ এবং এজাহারে নাম না দিয়ে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া নিয়েও ওসি ও তদন্ত কর্মকর্তার ভূমিকা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।#
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন