০৭:৪৪ পি.এম
সন্তানের জন্য বাবারা-মায়েরা নিজেদের স্বপ্ন, সময় এবং সামর্থ্যের শেষটুকুও উজাড় করে দেন। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের জীবনেই দেখা দিতে পারে উল্টো চিত্র। যে মানুষগুলো একসময় সন্তানকে পথ চলতে শিখিয়েছেন, বার্ধক্যে সেই মানুষগুলো হয়ে পড়ে অবহেলিত। কেউ একাকী জীবনযাপন করেন, আবার কেউ সন্তানদের সঙ্গে থেকেও প্রয়োজনীয় যত্ন পান না। এমন বাস্তবতায় বাবা-মায়ের ভরণপোষণকে বাংলাদেশ শুধুমাত্র নৈতিক দায়িত্ব হিসেবেই নয়, আইনগত বাধ্যবাধকতা হিসেবেও বিবেচনা করছে।
এ কারণেই ২০১৩ সালে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩’। যদিও এই আইনটি কার্যকর রয়েছে, তবুও এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে এখনো অনেকের জন্য স্পষ্ট ধারণা নেই।
আইনের আওতাধীন, প্রত্যেক সন্তানের দায়িত্ব হল তার মা-বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করা। যদি একাধিক সন্তান থাকে, তাহলে সবাইকে পারস্পরিক আলোচনা এবং সমঝোতার ভিত্তিতে এ দায়িত্ব পালন করতে হবে। শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সহায়তা নয়, বরং মা-বাবার শারীরিক এবং মানসিক সুস্থতায়ও আইন গুরুত্ব দিয়েছে। সন্তানেরা নিয়মিত মা-বাবার খোঁজখবর রাখতে হবে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে এবং যথাযথ পরিচর্যার ব্যবস্থা করতেও বাধ্য থাকবে। আইন অনুযায়ী, মা-বাবাকে নিয়মিত সঙ্গ দিতে হবে, যা সন্তানের দায়িত্বের একটি অংশ।
আরও পড়ুন: দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির ষড়যন্ত্র চলছে : হারুনুর রশীদ আজাদ
বাবা-মাকে কি বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো যাবে?
অনেকের ধারণা, মা-বাবার থাকার ব্যবস্থা করে দিলে তাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আইন সে কথা বলছে না। পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন অনুযায়ী, কোন সন্তান তার মা-বাবাকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধাশ্রম বা অন্য কোথাও থাকতে বাধ্য করতে পারবেন না। যদি মা-বাবা তা না চান, তবে তাঁদের আলাদা করাও যাবে না।
বিশেষ পরিস্থিতিতে, যখন কোন সন্তান বাস্তব কারণে নিজের কাছে রেখে ভরণপোষণ করতে অক্ষম হন, তখন সরকারি বা বেসরকারি পরিচালিত পরিচর্যাকেন্দ্রে তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিধিমালার নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
অনেক মা-বাবা সন্তানের সঙ্গে বসবাস না করে আলাদা বাস করেন। সেক্ষেত্রে সন্তানের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। আইনের ৩(৭) ধারা অনুযায়ী, মা-বাবা যদি আলাদাভাবে থাকেন তবে প্রত্যেক সন্তানকে তার আয় অনুযায়ী যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ নিয়মিত মা-বাবার ভরণপোষণের জন্য দিতে হবে।
আরও পড়ুন: গাদি আইজেনকটের হাতে ইসরাইলে সরকার গঠনের দায়িত্ব
শুধু সন্তান নয়, সন্তানের স্ত্রী, সন্তান কিংবা অন্য কোন নিকটাত্মীয় যদি বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়, তবে তাঁদেরও আইনের আওতায় অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আইন না মানলে শাস্তির ব্যবস্থা
পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমানিত হলে সন্তানের বিরুদ্ধে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা যেতে পারে। জরিমানা পরিশোধে ব্যর্থ হলে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে। তবে এ ধরনের মামলার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আদালত সাধারণত বাবা বা মায়ের লিখিত অভিযোগ ছাড়া অভিযোগ আমলে নেবে না।
যদি কোন সন্তান জীবিত না থাকে
আরও পড়ুন: দেবিদ্বার বিএনপির সদস্য সচিব আবুল কালাম আজাদ বহিষ্কার
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ২০২৩ সালে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ বিধিমালা’ প্রণয়ন করেছে। সেখানে উল্লেখ আছে, যদি কোন মা-বাবার জীবিত সন্তান না থাকে অথবা ভরণপোষণের মতো কেউ না থাকে, তাহলে পিতা-মাতা ভরণপোষণ কমিটি তাঁদের জন্য পরিচর্যাকেন্দ্রে থাকার ব্যবস্থা করতে সক্ষম।
অসহায় মা-বাবার সহায়তার জন্য সরকারি অনুদান এবং দেশি-বিদেশি সহায়তায় একটি বিশেষ ভরণপোষণ তহবিল গঠনের কথাও বিধিমালায় উল্লেখ রয়েছে।
আইন শাস্তির ভয় জাগাতে পারে, কিন্তু বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা কিংবা দায়িত্ববোধ তৈরি করতে পারে না। তারপরও বাস্তবতা হলো, অনেক প্রবীণ মানুষ যখন নিজেদের সন্তানদের কাছ থেকে অবহেলিত হন, তখন তাদের অধিকার রক্ষায় আইনের প্রয়োজন হয়। আর সেই অধিকার নিশ্চিত করতেই বাংলাদেশে রয়েছে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন।
আরও পড়ুন: ছাত্রদল রাজপথে পাহারা দিচ্ছে, শিবির বা সুবিধাবাদীরা মাঠে নেই: রাশেদ খান
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন