০৭:০২ পি.এম
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের জন্য স্বেচ্ছাসেবী ভিত্তিতে নৌ-পরিচালনা সেবা ফি চালুর একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করছে ইউরোপীয় দেশগুলো। তবে এই ফি যেন বাধ্যতামূলক না হয় এবং জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও)-এর সমর্থন পায়, সে বিষয়েও জোর দেওয়া হচ্ছে। দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এ খবর জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রিটেনের উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছেন, হরমুজ প্রণালীতে বাধ্যতামূলক টোল আরোপ করা হলে তা বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য ‘বিপর্যয়কর’ হবে। যদিও ব্রিটিশ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী মনে করেন, মালাক্কা প্রণালী বা ইংলিশ চ্যানেলের মতো প্রাকৃতিক নৌপথে নির্দিষ্ট নৌ-পরিচালনা সেবার জন্য স্বেচ্ছাসেবী ফি নেওয়ার নজির রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে যে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত থাকবে এবং সেখানে চলাচলকারী জাহাজের ওপর আর হামলা চালানো হবে না। ওয়াশিংটনের দাবি, তেহরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণেই এ বিষয়ে সমঝোতা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে।
আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে জাতীয় সমবায় দিবস উদযাপন উপলক্ষে র্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আজ শুক্রবার (১১ জুলাই) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়ে গেছে। তবে তিনি স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান। পরে তিনি ইরানকে সতর্ক করে বলেন, তার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা হলে ‘হাজারটি ক্ষেপণাস্ত্র’ ইরানকে লক্ষ্য করে প্রস্তুত রয়েছে।
এদিকে ওমান মালাক্কা প্রণালীর আদলে হরমুজ প্রণালীর জন্য একটি বিকল্প ব্যবস্থার প্রস্তাব তৈরি করেছে। ব্রিটিশ আইন বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় প্রস্তুত করা এই পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করতে ওমান তাদের বিশেষজ্ঞ দল তেহরানে পাঠানোর প্রস্তাবও দিয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি শনিবার (১২ জুলাই) ওমান সফরে যাচ্ছেন। সফরে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা এবং জাহাজ চলাচল নিয়ে আলোচনা হবে।
ওমানের অবস্থান হলো, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী হরমুজ প্রণালীতে অবাধ নৌ-চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং সেখানে বাধ্যতামূলক ট্রানজিট ফি আরোপ করা উচিত নয়। তবে নৌ-নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা, দূষণ রোধ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বেচ্ছাসেবী সেবাভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
আরও পড়ুন: সমবায়ের হাত ধরেই বদলাবে গ্রামীণ মানুষের জীবন প্রতিমন্ত্রী টুকু
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেছেন, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন উপেক্ষা করে ইরানকে হরমুজ প্রণালীর ওপর একক নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হলে ভবিষ্যতে যে কোনো উগ্রপন্থি গোষ্ঠী ওই পথকে জিম্মি করতে পারে।
তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ইরানের ভেতরেও এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান চাইলেও অন্য অংশ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পক্ষে।
এদিকে উপসাগরীয় ও ইউরোপীয় কয়েকটি দেশ আইএমওর বৈঠকে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে হামলার জন্য ইরানের নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করে। তবে রাশিয়া ও চীন সেই প্রস্তাব সমর্থন করেনি। রাশিয়ার মতে, প্রস্তাবটি সংকটের মূল কারণ উপেক্ষা করেছে। আর চীন বলেছে, এটি একপেশে এবং আইএমওর দায়িত্বের সীমা অতিক্রম করেছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ১৫০টির বেশি স্থাপনায় হামলা চালানোর পর উত্তেজনা আরও বেড়েছে। জবাবে ইরান কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায়।
আরও পড়ুন: সমবায় আন্দোলনকে যুগোপযোগী করার তাগিদ রাষ্ট্রপতির
কূটনীতিকদের মতে, বর্তমানে বিরোধের দুটি মূল বিষয় রয়েছে। একটি হলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর সময় এর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। অন্যটি হলো দীর্ঘমেয়াদে প্রণালিটির ব্যবস্থাপনা কীভাবে পরিচালিত হবে এবং মালাক্কা প্রণালির মডেল সেখানে প্রয়োগ করা সম্ভব কি না।
গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতির রূপরেখায় ইরান ৬০ দিনের জন্য কোনো ধরনের অতিরিক্ত ফি ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমানের মধ্যস্থতায় আলোচনায় বসতেও সম্মত হয়েছে।
তবে আইএমওর মহাসচিব আর্সেনিও দোমিঙ্গেজের উদ্যোগে দক্ষিণাঞ্চলীয় নৌপথ খুলে দেওয়ার একটি পরিকল্পনায় প্রথমে সম্মতি দিলেও পরে ইরান সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। ফলে আটকে পড়া হাজারো নাবিককে সরিয়ে নেওয়ার জাতিসংঘের পরিকল্পনা স্থগিত করতে হয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে দক্ষিণাঞ্চলীয় নৌপথ ব্যবহার করতে উৎসাহিত করছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, মে মাসের শুরু থেকে তাদের সহায়তায় ৮০০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং প্রায় ৩৮ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।
আরও পড়ুন: তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে সংশয় না রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন সরকারপ্রধান: অর্থমন্ত্রী
এদিকে আইআরজিসির নৌবাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘হরমুজ প্রণালি ও এ অঞ্চলে বিদেশি শক্তির কোনো ভূমিকা নেই।’ বর্তমানে কূটনীতিকরা খতিয়ে দেখছেন, ইরান সব জাহাজকে উত্তর দিকের পথ ব্যবহার করতে বাধ্য করতে চায়, নাকি দক্ষিণাঞ্চলীয় রুট ব্যবহার করলেও আগে তেহরানের অনুমতি নেওয়ার শর্ত আরোপ করতে চায়।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন