১২:৩৮ পি.এম
যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেই আবারও ইরানে নারীদের হিজাব পরার বিষয়ে নতুন করে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। দেশটির কট্টরপন্থীরা বাধ্যতামূলক হিজাবের নিয়মকে আরও কঠোরভাবে কার্যকর করার দাবি তুলেছেন, কিন্তু অনেক নারী প্রকাশ্যে এই নিয়ম মানছেন না।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে সরকারের নজর অন্যদিকে থাকায় হিজাব ছাড়া অনেক নারীকে সরকারি অনুষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও দেখা গেছে। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হিজাবের নিয়ম কঠোরভাবে কার্যকরের দাবিও আবারও জোরালো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইরানের বিভিন্ন শহরে হিজাবের নিয়ম না মানার অভিযোগে ক্যাফে, রেস্তোরাঁ এবং দোকান বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৯ জুলাই তেহরানে অন্তত সাতটি ক্যাফে এবং রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পূর্বাঞ্চলের দক্ষিণ খোরাসান প্রদেশেও বাধ্যতামূলক হিজাব ও সামাজিক আচরণের নিয়ম না মানার অভিযোগে ১০টি ক্যাফে বন্ধ করা হয়েছে বলে ইরানের সংবাদমাধ্যম সুত্রে জানা গেছে।
আরও পড়ুন: জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস আজ
তবুও এসব পদক্ষেপের মধ্যেও তরুণীদের মধ্যে হিজাব না পরার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন ছবি এবং ভিডিওতে তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে নারীদের হিজাব ছাড়া চলাফেরা করতে দেখা যাচ্ছে। এমনকি অনেক তরুণী মোটরসাইকেল চালানোর সময়ও মাথায় হিজাব রাখছেন না।
মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ২০২২ সালে মাহসা আমিনির পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর পর ইরানে ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। পোশাকবিধি না মানার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলনটিকে কঠোরভাবে দমন করা হয়। তবে এরপরও নারীদের মধ্যে বাধ্যতামূলক হিজাবের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অনীহা পুরোপুরি থামেনি।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০২৪ সালের শেষে জানায়, বাধ্যতামূলক হিজাব আইন অমান্য করা নারী ও মেয়েদের দমনে ইরানি কর্তৃপক্ষ আরও কঠোর এবং সহিংস ব্যবস্থা নিচ্ছে। সংগঠনটির মতে, নতুন বাধ্যতামূলক হিজাব আইন নারীদের ওপর নিপীড়ন আরও বেড়েছে এবং এতে বেত্রাঘাত, কারাদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের মে মাসেও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, হিজাব পরতে অস্বীকৃতি জানানো নারী ও মেয়েদের ওপর নজরদারি, গ্রেপ্তার, আটক এবং অন্যান্য হয়রানি বাড়ানো হয়েছে। সংগঠনটি এই পরিস্থিতিকে নারীদের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল।
আরও পড়ুন: জামায়াতে ইসলামীর ইসলাম অস্বীকার করলেন হেফাজতের আমির বাবুনগরী
ইরানের কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতারা প্রকাশ্যে হিজাবের নিয়ম মানানোর দাবি জানাচ্ছেন। তেহরানের জুমার নামাজের ইমাম মোহাম্মদ জাভাদ হাজ আলী আকবরি অভিযোগ করেছেন, নারীদের মধ্যে ‘অশালীনতা’ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সংগঠিত প্রচেষ্টা চলছে।
হিজাব না পরার কারণে শাস্তির ঘটনাও ঘটেছে। চলতি বছর জুনে ইরানের জনপ্রিয় গায়িকা পারাস্তু আহমাদিকে ৭৪ বার বেত্রাঘাত এবং দুই বছরের জন্য দেশের বাইরে যেতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি অনুষ্ঠান ভিডিওতে তার কাঁধ ও চুল খোলা থাকার অভিযোগে মামলাও দায়ের করা হয়েছিল।
তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান হিজাব নিয়ে জোর করে আইন প্রয়োগের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর মতে, মানুষের আচরণ শুধু আইন করে পরিবর্তন করা যায় না; এটি সাংস্কৃতিক এবং বিশ্বাসের বিষয়।
উল্লেখ্য, দেশের সাবেক সংসদ সদস্য গোলামালি জাফারজাদেহ ইমানাবাদিও জানিয়েছেন, হিজাবের পরিবর্তে মূল্যস্ফীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সংকট মোকাবিলার দিকে সরকারের আরও মনযোগ দেওয়া উচিত।
আরও পড়ুন: রীতা রানীকে মারধরের অভিযোগ, ফেসবুকে ছড়ানো তথ্য নিয়ে ডিএমপির মন্তব্য
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর বাধ্যতামূলক হিজাব নিয়ে কঠোরতা শুরু হয়। ইরানের ইসলামী দণ্ডবিধির ৬৩৮ ধারায় জনসমক্ষে ‘ইসলামি হিজাব’ ছাড়া নারীদের উপস্থিতি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে হিজাব বলতে ঠিক কী বোঝানো হবে, তা আইনে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়নি।
২০২৪ সালে আরও কঠোর একটি আইন অনুমোদন করা হলেও এর বাস্তবায়ন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপে স্থগিত রাখা হয়। বিষয়টি দেশটির কট্টরপন্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। বর্তমানে সরকারও এই ব্যাপারে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সিএনএনের প্রতিবেদনে তেহরানের এক নারীর বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, শহরের রাস্তায় অনেক তরুণী এখন খোলামেলা পোশাকে চলাফেরা করছেন এবং হিজাব প্রায় দেখা যাচ্ছে না। তিনি জানান, এসব তরুণীকে আবার হিজাব পরতে বাধ্য করা সরকারের জন্য আগের মতো সহজ হবে না।
যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে হিজাব নিয়ে সরকারের নতুন করে কঠোর অবস্থান কতটা কার্যকর হবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুন: দোষী সাব্যস্ত রাসেল ব্র্যান্ড
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন