১০:২৩ এম
একসময় অস্ত্র হাতে থাকা জলদস্যুরা, যাদের ভয়ে সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরতে যাওয়ার সাহস পেতেন না জেলেরা, তাদের অনেকেই এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার চেষ্টা করছেন। তবে সুন্দরবন এখনও পুরোপুরি দস্যুমুক্ত হয়নি। সম্প্রতি সুন্দরবন রিজিয়ন-৬-এর (এসআরবি-৬) কাছে ৭৪ জন জলদস্যু আত্মসমর্পণ করেছেন। তারা অস্ত্র ছেড়ে মাছ ধরার জাল হাতে নিয়েছেন। জীবিকার তাগিদে নদী ও বনের কঠিন জীবন বেছে নিয়েছেন। কিন্তু অপরাধের অতীত পেছনে ফেলে নতুন করে বেঁচে থাকা কতটা সহজ? পরিবার, সমাজ ও জীবিকার সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াইয়ে সাবেক জলদস্যুরা কেমন আছেন?
সুন্দরবনের অন্যতম জলদস্যু বাহিনী দুলাভাই বাহিনীর প্রধান আফজাল হোসেন ২০১৮ সালে দস্যুতা ছেড়ে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। তবে কিছুদিন পর তিনি আবারও অপরাধজগতে ফিরে যান। আফজাল জানান, স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইলেও সমাজ তাকে গ্রহণ করেনি। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে তিনি আবারও দস্যুতায় জড়িয়ে পড়েন। তবে সম্প্রতি তিনি নতুন করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন।
আফজাল হোসেন বলেন, "কেউ একবার খারাপ পথে গেলে সেখান থেকে ফিরে আসার পর যদি কেউ তাকে বুকে টেনে নিয়ে বলতেন, ‘ভাই, ফিরে এসেছিস, খুব ভালো কাজ করেছিস। আয়, আমার বুকে আয়।’ তাহলে হয়তো নতুন করে বাঁচার সাহস মেলে; কিন্তু কেউ এমন কথা বলেন না। বরং সবাই আবারও অপরাধের অন্ধকারে ঠেলে দেন।"
আরও পড়ুন: শিল্পীর তুলিতে প্রস্তুত প্রতিমা, সন্ধ্যায় দেবীকে আবাহন
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় সুন্দরবনের নদী-খালে মাছ ধরতে যাওয়া মানেই ছিল অনিশ্চয়তা। জলদস্যুদের কবলে পড়ার ভয়, মুক্তিপণের জন্য অপহরণ এবং সর্বস্ব হারানোর আতঙ্ক ছিল সাধারণ ঘটনা। পুরো সুন্দরবনজুড়ে জলদস্যুদের দাপট ছিল।
সুন্দরবনের নদীগুলো একসময় তাদের অপরাধজগতের অংশ ছিল। ২০১৮ সালে সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়। সেই সময় বহু জলদস্যু আত্মসমর্পণ করেন। কিন্তু কিছুদিন পর তাদের অনেকেই আবারও দস্যুতায় ফিরে যান।
এখন আবার অস্ত্র ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অনেকে। তবে অতীত থেকে মুক্ত হয়ে নতুন করে বাঁচার লড়াই এখনও শেষ হয়নি। তাদের এই প্রত্যাবর্তন কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, জীবিকার সুযোগ, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও কার্যকর পুনর্বাসনের ওপর।
সম্প্রতি আত্মসমর্পণ করা সাবেক কয়েকজন জলদস্যুর সঙ্গে কথা হয় সময় সংবাদের। তাদের প্রত্যেকের গল্প প্রায় একই। অস্ত্রের জীবন ছেড়ে মাছ ধরার জালে ফিরেছেন তারা। পরিবার নিয়ে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু এলাকায় ফিরেও কাটছে না অপরাধীর তকমা। মানুষের অবিশ্বাস, সামাজিক দূরত্ব ও জীবিকার অনিশ্চয়তায় নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।
আরও পড়ুন: মাগুরায় খাদ্যে ভেজাল রোধে কঠোর পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত
এক সাবেক জলদস্যু বলেন, "আগে প্রশাসনকে ঘৃণা করতাম। কিন্তু গত দুই মাসে প্রশাসনের সদস্যদের আচরণে আমার ধারণা বদলেছে। এ সময়ে তারা আমার খোঁজখবর নিয়েছেন, কেউ বিরক্ত করেননি। ফলে এখন শান্তিতে খাওয়া-ঘুমাতে পারছি।"
আরেক সাবেক জলদস্যু বলেন, "আগে সব সময় ভয় কাজ করত; কখন অন্য কোনো বাহিনী এসে গুলি করে, কখন প্রশাসন, কোস্টগার্ড, র্যাব বা পুলিশের মুখোমুখি হতে হয়। পানিতে নামলে কুমিরের ভয়, বাঘের ভয়-সব মিলিয়ে এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হতো। তবে এখন নতুন জীবন পেয়ে ভালো আছি।"
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সুন্দরবন আবারও অশান্ত হয়ে ওঠে। তবে গত দুই মাসে এসআরবি-৬-এর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে সুন্দরবনের কয়েকটি বাহিনীর ৭৪ জন জলদস্যু। এবারের আত্মসমর্পণ যেন আগের মতো ব্যর্থ না হয়, সে জন্য তাদের সামাজিক সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসআরবি-৬-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল নিস্তার আহমেদ জানান, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে সুন্দরবনের প্রায় ছয়টি জলদস্যু বাহিনীর ৭৪ জন সদস্য এসআরবি-৬ খুলনার কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। এসময় ৭৩টি অস্ত্র, ৮৫২ রাউন্ড গুলি এবং দস্যুতায় ব্যবহৃত অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। আত্মসমর্পণকারীরা ঠিক আছেন কি না, স্বাভাবিক পেশায় ফিরেছেন কি না, কোনো ধরনের অসুবিধা বা আইনি সমস্যায় পড়ছেন কি না-এসব বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: টেকনাফে পাচারের সময় নারীসহ ৯ জনকে উদ্ধার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ
তবে সুন্দরবনে এখনও সক্রিয় রয়েছে বেশ কয়েকটি জলদস্যু বাহিনী। তাদেরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে এসআরবি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন