১০:১০ পি.এম
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, সরকার মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, রপ্তানিমুখী শিল্পকে শক্তিশালী করা, এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য দেশের প্রস্তুতি আরও সুদৃঢ় করার জন্যে কাজ করছে।
আজ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি অর্থমন্ত্রীর উপস্থাপিত বাজেটের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, এই বাজেট তাঁর প্রত্যাশাকেও অনেক দূর ছাড়িয়ে গেছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটের মূল ভিত্তি হচ্ছে স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি। বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিবর্তে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন ও সফট পাওয়ার বিকাশের মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়নে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: নিকাহ রেজিস্ট্রারদের মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা সংবাদ সম্মেলনে
শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও থাকা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সাথে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। এ জন্য ধারাবাহিকভাবে ৮ দশমিক ৫ থেকে ৯ শতাংশ বাস্তব প্রবৃদ্ধি অর্জন প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি, ইনক্রিমেন্টাল ক্যাপিটাল আউটপুট রেশিও (আইসিওআর) কমানো, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি এবং সরকারি ও বেসরকারি উভয় বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে।
মুদ্রাস্ফীতি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর না করে উৎপাদন, পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যয় কমানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের লজিস্টিক ব্যয় জিডিপির প্রায় ১৬ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক মানদণ্ড প্রায় ১০ শতাংশ।
আরও পড়ুন: বিচারকের বিরুদ্ধে প্রেস ব্রিফ: ব্যারিস্টার সারোয়ারকে ২৬ নভেম্বর হাইকোর্টে তলব
তিনি জানান, চট্টগ্রাম বন্দরে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সময় কমানো এবং পণ্য পরিবহন ও কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ব্যয় হ্রাসের মাধ্যমে বন্দর ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বাজারে তথ্যপ্রবাহ উন্নত করা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করে উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যকার অপ্রয়োজনীয় মূল্যবৃদ্ধি কমানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কর্মসূচি এবং ধীরে ধীরে বৈদ্যুতিক ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানো হলে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় কমাবে, যা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে।
এলডিসি থেকে উত্তরণের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার ইতোমধ্যে উত্তরের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছে। আবেদন অনুমোদিত হলে বাংলাদেশ ২০২৯ সালের নভেম্বরে এলডিসি থেকে উত্তীর্ণ হবে। এতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যবসা-বাণিজ্যকে নতুন বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য প্রস্তুত করার অতিরিক্ত সময় পাওয়া যাবে।
আরও পড়ুন: সাভারে শ্রমিক আন্দোলনে উসকানি ও অর্থায়নের অভিযোগে যুবলীগ নেতা সোহেল গ্রেপ্তার
তিনি বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি সরকারের অন্যতম সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
মন্ত্রী স্বীকার করেন, গ্যাসের সংকট এখনো শিল্প উৎপাদনের বড় বাধা। এ সংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত একটি ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপনের মাধ্যমে প্রতিদিন আরও ৫৫০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়াও গ্যাস সংকটে প্রায়ই বন্ধ থাকা সার কারখানাগুলোর জন্য পৃথক এলএনজি নেটওয়ার্ক স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে বলেও তিনি জানান।
ব্যবসা সহজীকরণের লক্ষ্যে গৃহীত সংস্কার তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রক্রিয়া অনেক সহজ করা হয়েছে। সরকার আশা করছে, ভবিষ্যতে উদ্যোক্তারা মাত্র ১৪ দিনের মধ্যে যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার পর্যায়ে পৌঁছাতে পারবেন।
আরও পড়ুন: মগবাজারে ক্রেনচাপায় প্রকৌশলী আরিফের মৃত্যু, পরিবারের নিরপেক্ষ তদন্ত ও ক্ষতিপূরণ দাবি
তিনি বলেন, কোম্পানি নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স, আমদানি-রপ্তানি নিবন্ধন সনদসহ বিভিন্ন সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে একীভূত করা হচ্ছে এবং অপ্রয়োজনীয় ও পরস্পর-অতিব্যাপী বিধিনিষেধ তুলে দেওয়া হচ্ছে।
খুব শিগগিরই কোনো সরকারি অফিসে না গিয়ে সম্পূর্ণ অনলাইনে ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করা যাবে এবং ফি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা হবে বলেও তিনি জানান।
রপ্তানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে চামড়া শিল্পকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, বিপুল কাঁচামাল থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের চামড়া রপ্তানি কয়েক বছর ধরে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নিচেই রয়েছে।
এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে সরকার সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সাভারের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) উন্নয়ন, সব ট্যানারিকে পরিবেশসম্মত উৎপাদনের আওতায় আনা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) গোল্ড সার্টিফিকেশন অর্জনে সহায়তা দেওয়া।
আরও পড়ুন: বান্দরবানে যুবদল নেতা শরীফের মরদেহ ঝিরি থেকে উদ্ধার
তিনি বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ উচ্চমূল্য সংযোজনসম্পন্ন চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন করতে পারবে এবং ভবিষ্যতে চামড়া রপ্তানি ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব হবে।
পাট শিল্পের প্রসঙ্গেও তিনি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন পাট উৎপাদন করে। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে, বহুমুখী পাটপণ্য উদ্ভাবন এবং নতুন আন্তর্জাতিক বাজার সৃষ্টি করতে চীনের সঙ্গে যৌথ গবেষণাগার স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রচলিত প্যাকেজিং পণ্যের পাশাপাশি উচ্চমূল্য সংযোজনসম্পন্ন ব্লেন্ডেড ফ্যাব্রিক ও অন্যান্য বৈচিত্র্যময় পাটপণ্য উৎপাদনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারের চলমান সংস্কার কর্মসূচি এবং প্রস্তাবিত বাজেট সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার করবে, বিনিয়োগ আকৃষ্ট করবে, রপ্তানি বাড়াবে এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্যে বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।
আরও পড়ুন: কাল সংসদে উঠছে বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল-২০২৬
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন