০৪:৩০ পি.এম
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের সরকারি মুড়াপাড়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে ১২৫তম বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠান নিঃসন্দেহে নবীন-প্রবীণের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। উৎসবের একটি আনন্দময় পরিবেশে উল্লাস, গান, গল্প, এবং আড্ডায় সবাই মাতলেন।
শুক্রবার (১২ জুন) রূপগঞ্জের প্রাণকেন্দ্র মুড়াপাড়ায় এই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
আলোকিত মানুষ গড়ার বিদ্যাপীঠ ও ঐতিহ্যবাহী সরকারি মুড়াপাড়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ১২৫তম বর্ষপূর্তি উদযাপন অনুষ্ঠানে সাবেক শিক্ষার্থীরা আনন্দ এবং উল্লাসে মেতে উঠেছিলেন, যখন তারা প্রিয় শিক্ষকদের কাছে পেয়ে গেলেন। অনুষ্ঠানে কেউ কেউ প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে স্বামী-স্ত্রী, সন্তান এমনকি নাতি-পুতি নিয়েও যোগ দেন। একসময়ের সহপাঠীদের কাছে পেয়ে শৈশব এবং কৈশোরের সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণে তারা মাতোয়ারা হন।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর নবীন বিসিএস কর্মকর্তাদের সততা ও দক্ষতার সঙ্গে জনগণের সেবা করার আহ্বান
অনুষ্ঠান উপলক্ষে বিদ্যালয় মাঠে স্থাপিত ফটোবুথ, মঞ্চ, পেন্ডেল, বিদ্যালয় ভবন, এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্যাম্পাসে দল বেঁধে ছবি তোলার কাজ চলছিল। কেউ কেউ সেলফি তুলছিলেন। ঘনিষ্ঠ বন্ধুর আলিঙ্গনে আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হচ্ছিল। শিক্ষার্থীরা স্মৃতিচারণায় নিজেদের ভুবনে প্রবাহিত হচ্ছিলেন। উৎসবে আসা শিক্ষার্থীদের অনেকেই দেশ এবং বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। নবীন-প্রবীণের প্রাণোচ্ছল অংশগ্রহণে সবুজ প্রকৃতি আরো চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। মুখরিত হয়ে উঠেছিল স্কুলের মাঠপ্রাঙ্গণ। আনন্দের ঢেউ সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ছিল।
সকাল সাড়ে ৮টা থেকে রাতের অন্ধকার পর্যন্ত বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে নবীন-প্রবীণদের এই মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে বাঁধভাঙা আনন্দ এবং উৎসবের লক্ষ্য ছিল থাকা। কুশল বিনিময়ে প্রতিষ্ঠান চত্বর মুখর হয়ে উঠেছিল। শৈশবের কথা বলার পাশাপাশি নানা ব্যাচের শিক্ষার্থীরা সেলফি এবং ফটোসেশনের কাজেও ব্যস্ত ছিলেন।
সকাল ১০টায় গুণীজনদের উত্তরীয় পরিয়ে, জাতীয় সংগীতের সুরে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। এরপর ১২৫টি বেলুন উড়িয়ে এবং শান্তির প্রতীক কবুতর অবমুক্ত করার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
১২৫তম বর্ষপূর্তিকে সামনে রেখে ‘এসো মিলি হৃদয়ের টানে ও ১২৫তম বর্ষে শত প্রাণ, বাজুক মনে ঐক্যতান’ স্লোগানকে ধারণ করে বিদ্যালয়ের এ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। এই উপলক্ষে তোরণ নির্মাণ, বিদ্যালয় মাঠে বিশাল পেন্ডেল, কালের যাত্রার ধ্বনি নামে একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করা হয়। পাঁচ হাজারেরও বেশি সাবেক এবং বর্তমান শিক্ষার্থী এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। কৃতি শিক্ষার্থী, প্রয়াত ছাত্র, শিক্ষক এবং গুণীজনদের সম্মাননা জানানো হয়।
আরও পড়ুন: এপারে আসতে হলে ফিটফাট হয়ে আসতে হবে: মৎস্য প্রতিমন্ত্রী টুকু
অনুষ্ঠানে অতিথিদের উত্তরীয় পরিয়ে বরণ, পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করা হয়। প্রয়াত শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের স্মরণে দোয়া এবং এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। জাতীয় সংগীত পরিবেশন, ১২৫টি বেলুন উড়ানো এবং কবুতর অবমুক্তকরণ, স্মারক উন্মোচন ও বিতরণ হয়। ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভা, আনন্দ শোভাযাত্রা, কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা, স্মৃতিচারণ, আবৃতি, যাদু প্রদর্শনী, একক সংগীত, এবং ব্যান্ড লাইভ কনসার্টও অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৮৮ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী এবং রূপগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি এম.এ মোমেনের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯০১ সালে ৩৩বিঘা জমি নিয়ে সরকারি মুড়াপাড়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দীর্ঘ এক শতাব্দী ধরে, জ্ঞানের যে মশাল এ প্রতিষ্ঠানটি প্রজ্জ্বলিত রেখেছে, তার আলো আজ বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভাষাতাত্ত্বিক, সাহিত্যিক এবং প্রাবন্ধিক ডক্টর কাজী দীন মুহাম্মদ, এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। বাংলার প্রথম সেনাপ্রধান এবং ৩নং সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল (অব.) কে এম সফিউল্লাহ (বীর উত্তম) এই বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। এইভাবে বিপুল সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী এই বিদ্যালয় থেকে পাস করে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজ্ঞ, শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, এবং সাংবাদিক হয়েছেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা আলোকিত মানুষ গড়ার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
উদ্বোধনের পর ১২৫তম বর্ষপূর্তি উদযাপন কমিটির আহবায়ক ১৯৬৯ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি এবং বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী মনিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের মূল আয়োজন শুরু হয়।
শৈশব এবং কৈশোরের মধুময় স্মৃতিচারণ করে স্বাগত বক্তব্যে আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব গোলাম ফারুক খোকন বলেন, বিজ্ঞানসম্মত বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়নকে আরো আধুনিকভাবে দিতে হবে। গরিব মেধাবীদের সহযোগিতা করা হবে।
আরও পড়ুন: জাবি ছাত্রদলের ১১ নেতাকে শোকজ নোটিশ, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে হবে
সভাপতির বক্তব্যে কাজী মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আজ গৌরবময় ঐতিহাসিক দিন। ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয় থেকে শত শত শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। কে কোন পেশার, সেটা বড় কথা নয়, সবার আগে ভালো মানুষ হতে হবে। নৈতিক মূল্যবোধ শিখতে হবে। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১২৫তম বর্ষপূর্তি শুধুমাত্র সময়ের পরিমাপ নয়, এটা একটি দীর্ঘ সংগ্রাম, ঐতিহ্য, সাফল্য এবং অগণিত মানুষের ভালোবাসা ও অবদানের প্রতিফলন। এখান থেকে গড়ে উঠেছেন অসংখ্য মেধাবী এবং দেশপ্রেমী মানুষ। যাঁরা দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখে চলেছেন। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনার সঙ্গে যেসব গুণীজন জড়িত, তাঁদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।’
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া দিপু, রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সাইফুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জ জেলা সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মেহেদী ইসলাম, রূপগঞ্জ থানার ওসি এএইচএম সালাউদ্দিন, রূপগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি হাসান আলী, রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ওয়াহিদুল ইসলাম, ঢাকা জেলা সহকারী পুলিশ সুপার জিয়াউদ্দিন বশির, ভুলতা অ্যাপোলো হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. সাদিকুর রহমান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ডা. আলমগীর হোসেন ভুঁইয়া, এফবিসিসিআইয়ের সদস্য গণেশ চন্দ্র সাহা, মারুফ শারমীন স্মৃতি সংস্থার সভাপতি আলহাজ লায়ন মোজাম্মেল হক ভুঁইয়া, ব্যবসায়ী পারভিন আক্তার ভুঁইয়া, রূপগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহবায়ক শাহজাদা ভুঁইয়া, সরকারি মুড়াপাড়া কলেজের অধ্যক্ষ হাফিজুর রহমনা, কাঞ্চন সলিমউদ্দিন চৌধুরী কলেজের অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর মালুম, গন্ধর্বপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নারায়ণ চন্দ্র সাহা, সরকারি মুড়াপাড়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবু শংকর চক্রবর্তী, আয়োজক কমিটির কর্মকর্তাগণ আল-আমিন, সরকার, মনির হোসেন, এসকে মাহমুদ জেসপার প্রমুখ।
পরে মধ্যাহ্নভোজ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ব্যান্ড শো-এর মাধ্যমে অনুষ্ঠানটির সমাপ্তি ঘটে।
আরও পড়ুন: পল্লবী থানার ভেতরে ককটেল বিস্ফোরণ, আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন