০১:১১ পি.এম
দেশে গত ১৩ বছরে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনার ফলে অন্তত ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। একই সময়ে অন্তত ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন আহত হয়েছেন।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে বুধবার বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি একটি প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করেছে।
প্রতিষ্ঠানটি অভিযোগ করেছে, বিগত সরকারের ভুলনীতির কারণে সড়কে বেপরোয়া কাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের যাতায়াত সড়কে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, যা দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে।
আরও পড়ুন: সুরঞ্জিতের নেতৃত্বে অভিজ্ঞতা নিয়ে আসিফ নজরুল ও সালাহউদ্দিন আহমদের মতভেদ
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, "স্বাধীনতার পূর্বে এ দেশের প্রধান যাতায়াত মাধ্যম ছিল নৌপথ, দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল রেলপথ। নিরাপদ ও সাশ্রয়ী এই দুই পথে ৮০ শতাংশ মানুষের যাতায়াত হতো। সড়কে মাত্র ২০ শতাংশ মানুষের যাতায়াত ছিল। তখন সড়ক দুর্ঘটনাও ২০ শতাংশে সীমিত ছিল।"
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, স্বাধীনতার পর বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ঋণের জালে আবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার বেহিসাবি লুটপাট, পরিবহনে বেপরোয়া চাঁদাবাজি এবং বহুমাত্রিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ার পরিবর্তে নতুন নতুন সড়ক নির্মাণের ফলে ৮০ শতাংশ মানুষের যাতায়াত সড়কে নিয়ে আসা হয়েছে। সরকারের দুর্নীতি ও ভুলনীতির কারণে সড়ক দুর্ঘটনাও ৮০ শতাংশ বেড়েছে। অতএব, সড়কে এই গণহত্যার দায় অতীতের সব সরকারকেই নিতে হবে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সড়ক সেক্টরে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও কিছু দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তার চাঁদাবাজি ও নৈরাজ্যের কারণে সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন অবাধে চলাচল করছে, লাইসেন্সবিহীন ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকরা রাস্তায় আছেন। ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ৭২,৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১,২৫,৪০৫ জন নিহত এবং ১,৭৬,২৪৯ জন আহত হয়েছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এই তথ্য গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পেলেও, দেশের হাসপাতালগুলোর চিত্র হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি বলে জানাচ্ছে। একই সময়ে ইউক্রেন-রাশিয়া, ইসরায়েল-ফিলিস্তিনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যার চেয়ে কম।
আরও পড়ুন: মেঘনা নদীতে নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলছে মা ইলিশ নিধনের মহোৎসব
যাত্রী কল্যাণ সমিতির অভিযোগ, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ বিভিন্ন খাতে উন্নতি করলেও পরিবহন সেক্টরে দীর্ঘদিন ধরে দূরদর্শী নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। নিরাপদ নৌপথ ও রেলপথের ব্যবহার বাড়ানোর পরিবর্তে সড়ক সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ বাড়ানোর ফলে সড়কের ওপর চাপ বেড়েছে। সড়কে ম্যাস ট্রানজিট বাড়েনি; ডেডিকেটেড বাস নেটওয়ার্কও গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। উন্নত গণপরিবহনের অভাবে মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াতের ভোগান্তি বাড়ছে। এই সংকটকে পুঁজি করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, রাইডশেয়ারিং মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং নসিমন-করিমন ব্যবহার বাড়ানোর ফলে সড়কে যানজট ও দুর্ঘটনা বেড়েছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনার পর্যবেক্ষণে উল্লেখযোগ্য কারণসমূহ:
১. দেশে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার বেপরোয়া বৃদ্ধি ও অবাধ চলাচল।
২. সড়কে মিডিয়ান বা রোড ডিভাইডার না থাকা এবং সড়কের গাছপালায় অন্ধবাঁকের সৃষ্টি।
আরও পড়ুন: বন্যার্তদের দুর্দশা লাঘবে উদ্যোগ গ্রহণের ঘোষণা পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রীর
৩. মহাসড়কের নির্মাণত্রুটি, যানবাহনের ত্রুটি ও ট্রাফিক আইন অমান্য করা।
৪. উল্টোপথে যানবাহন চালানো, সড়কে চাঁদাবাজি ও পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহন।
৫. অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন।
৬. বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং বিরামহীন ও বিশ্রামহীনভাবে যানবাহন চালানো।
আরও পড়ুন: তৃতীয় টার্মিনাল চালুর অগ্রগতি নিয়ে গুরুত্ব পাবে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর, গেলেন বিমানমন্ত্রী
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যাত্রী কল্যাণ সমিতির সুপারিশসমূহ:
১. সড়কে হাজারো মানুষের প্রাণ বাঁচাতে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআরটিএ আমলাদের পরিবর্তে দেশি-বিদেশি পরিবহন বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিচালনা করা জরুরি।
২. সারা দেশে উন্নত বিশ্বের আদলে প্রযুক্তিভিত্তিক আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।
৩. প্রযুক্তিভিত্তিক সড়ক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাপান সফরে যাচ্ছেন হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক
৪. চালকদের উন্নত প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে লাইসেন্স প্রাপ্তি নিশ্চিত করা।
৫. গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে ফুটপাতসহ সার্ভিস লেনের ব্যবস্থা করা।
৬. কাঠামোগত সংস্কার করে সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ করা এবং চালকের বেতন ও কর্মঘণ্টা সুনিশ্চিত করা।
৭. মহাসড়কে ফুটপাত ও পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা রাখা এবং রোড সাইন ও রোড মার্কিং স্থাপন করা।
আরও পড়ুন: ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকারের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ : এরশাদ উল্লাহ
৮. মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও মেরামত সুনিশ্চিত করা এবং নিয়মিত রোড সেফটি অডিট করা।
৯. ফিটনেস প্রদান পদ্ধতি আধুনিকায়ন করা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ গণপরিবহন স্ক্র্যাপ করা।
১০. নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর সক্ষমতা বাড়ানো এবং ট্রাফিক ট্রেনিং একাডেমি গড়ে তোলা।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন