বুধবার, ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ইং
০৩:৪৩ পি.এম
ব্রিটিশ শাসিত ভারত ভাগ হওয়ার সাত মাস পর, ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ, ঢাকায় আসেন পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। পূর্ব পাকিস্তানে এটি ছিল তার প্রথম এবং শেষ সফর। যক্ষ্মাসহ একাধিক শারীরিক সমস্যায় ভুগতে থাকা মি. জিন্নাহ এই সফরের ছয় মাসের মাথায় মারা যান।
দশ দিনের সফরকালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ঢাকা ও চট্টগ্রামে একাধিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন এবং বিভিন্ন স্থানে ভাষণ দেন। ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিয়ে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন মি. জিন্নাহ।
প্রধানত, তিনি ঢাকা আসার বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই বাংলা, যা তৎকালীন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষা ছিল, সেটিকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা বিক্ষোভ, ধর্মঘটসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছিল। এসব কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ঢাকা, যশোর, সিলেটসহ বেশ কিছু স্থানে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগে সেটি শান্ত করার উদ্দেশ্যে ঢাকা সফরের সিদ্ধান্ত নেন তৎকালীন পাকিস্তানের অবিসংবাদিত নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, যিনি তখন ছাত্রনেতা ছিলেন, তার ডায়েরিতে লিখেছেন যে মি. জিন্নাহর ঢাকা আগমনকে কেন্দ্র করে বাঙালিদের মধ্যে একটি প্রত্যাশা জন্ম নিয়েছিল যে, রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে তিনি দলের ওপরে উঠবেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মি. জিন্নাহ সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকে প্রাধান্য দেবেন।
কিন্তু উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণায় বাঙালিরা আশাহত হন। যার ফলে তাদের মধ্যে মি. জিন্নাহর জনপ্রিয়তা অনেকাংশে কমে যায় বলে তখনকার বিভিন্ন স্মৃতিকথা ও বইপত্রের লেখা থেকে জানা যায়।
এরপর ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, যাকে ‘কায়েদে আজম’ বা মহান নেতা বলা হত, তার সঙ্গে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়, এমনকি জিন্নাহকে অপসারণের হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে বলে জানা যায়।
আর কী কী ঘটেছিল ওই দশ দিনে? সে সময়ের বিভিন্ন স্মৃতিকথা, বইপত্র এবং পত্রপত্রিকার খবর থেকে সেটাই এই প্রতিবেদনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
শহরজুড়ে সাজ সাজ রব
গভর্নর জেনারেল মি. জিন্নাহর সফরকে কেন্দ্র করে তখন বড় আকারে প্রস্তুতি নিয়েছিল তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকার। তার আগমন উপলক্ষে আলাদা একটি অভ্যর্থনা কমিটি গঠন করা হয়।
ওই কমিটির অধীনে ছোট ছোট আরো অন্তত নয়টি উপকমিটি গঠিত হয়, যারা মূলত মি. জিন্নাহকে স্বাগত জানাতে ঢাকায় ব্যাপক জনসমাগম ঘটানো, তোরণ নির্মাণ, আলোকসজ্জা, বিভিন্ন উৎসব এবং জনসভার আয়োজনসহ সফরের যাবতীয় বিষয়ে প্রস্তুতি নেন।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তার ‘ঢাকায় জিন্না’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, গভর্নর জেনারেল ঢাকায় পৌঁছানোর আগেই শহরজুড়ে নির্মাণ করা হয় অর্ধশতাধিক তোরণ। সেগুলোর সঙ্গে ঢাকার প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে মি. জিন্নাহর বড় বড় ছবি এবং পাকিস্তানের পতাকা টানানো হয়। তোরণগুলোতে আলোকসজ্জার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল।
‘কায়েদে আজমের সম্মানে শহর সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে এবং প্রায় সর্বত্র আলোকসজ্জা করা হয়েছে’, নিজের ডায়েরিতে লেখেন তখনকার তরুণ ছাত্রনেতা তাজউদ্দীন আহমদ।
জনসভার জন্য ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান, যা বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামে পরিচিত, সেখানে বড় মঞ্চ তৈরি করা হয়। সফলভাবে সমাবেশ সম্পন্ন করার জন্য আট শতাধিক স্বেচ্ছাসেবকের একটি দল ছাড়াও অ্যাম্বুলেন্স ও অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়।
ঢাকার বাইরে থেকে যারা জিন্নাহকে স্বাগত জানাতে আসবেন, তাদের আসা-যাওয়ার জন্য বিশেষ ট্রেন ও স্টিমারের ব্যবস্থা করে প্রশাসন। সেই সঙ্গে, তাদের খাওয়াদাওয়ার সুবিধার্থে আলাদা দোকান বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
বিমানবন্দরে ব্যাপক জনসমাগম
১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ সন্ধ্যায় একটি বিশেষ বিমানে চড়ে করাচি থেকে সরাসরি ঢাকায় আসেন তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। সফরসঙ্গী হিসেবে সঙ্গে ছিলেন তার বোন ফাতেমা জিন্নাহ।
বিমানটি ঢাকার তেজগাঁও এলাকার পুরনো বিমানঘাঁটিতে অবতরণের পর মি. জিন্নাহকে স্বাগত জানান পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন, গভর্নর স্যার ফ্রেডরিক বর্ণ, গণপরিষদের সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্তসহ আরো অনেকে।
এরপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ও পাকিস্তান নারী ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরা মি. জিন্নাহকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন।
এদিকে সেদিন দুপুরের পর ঢাকায় মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছিল। সেই বৃষ্টি উপেক্ষা করেই ঢাকা বিমানবন্দর এলাকা লোকের লোকারণ্য হয়ে গিয়েছিল বলে দৈনিক আজাদ পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে। মি. জিন্নাহকে বিমান থেকে নামতে দেখার পর তারা তাকে স্বাগত জানিয়ে নানান ধরনের স্লোগান দিতে থাকেন।
বিমানবন্দর থেকে মি. জিন্নাহকে নেওয়া হয় রমনা এলাকায় অবস্থিত একটি সরকারি বাসভবনে, যেখানে থাকতেন পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন চিফ সেক্রেটারি আজিজ আহমদ। সেখানে তার থাকার ব্যবস্থা করা হয়।
বিমানবন্দর থেকে রমনা এলাকার বাড়িতে যাওয়ার সময় রাস্তার দু'ধারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে অসংখ্য মানুষ মি. জিন্নাহকে শুভেচ্ছা জানান।
তবে ভাষা আন্দোলন দমনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ থাকায় তাদের মধ্যে কাউকে সেভাবে স্লোগান ধরতে দেখা যায়নি বলে নিজের ডায়েরিতে লিখেছেন তখনকার ছাত্রনেতা তাজউদ্দীন আহমদ।
‘একটা বিষয় লক্ষণীয় যে লোকজনের মধ্যে স্লোগান তোলার মতো তেমন উচ্ছ্বাস দেখা গেল না। সাম্প্রতিক পুলিশি নির্যাতনের ফলে ছাত্ররা নিস্পৃহ’, লিখেছেন মি. আহমদ।
সেনাদের যা বলেছিলেন জিন্নাহ
ঢাকায় আসার পরদিন সেনানিবাসে একটি কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে যোগ দেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ২০ মার্চ সকালের কুর্মিটোলা প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে তিনি ইংরেজিতে একটি ভাষণও দিয়েছিলেন।
সেখানে পূর্ববঙ্গকে তিনি পাকিস্তানের অন্যতম ‘শ্রেষ্ঠ শক্তিশালী অংশ’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
‘বহু শতাব্দী পর্যন্ত আপনারা যে সুযোগ পাননি, আজ সেই সুবর্ণ সুযোগ আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে। এতদিন পর্যন্ত বাংলাকে, বিশেষত পূর্ববঙ্গকে সামরিক লক্ষ্যের দিক থেকে অহবেলার যোগ্য বলে বিবেচিত হয়ে আসছিল’, ভাষণে বলেন মি. জিন্নাহ।
পূর্বাংশের বাসিন্দাদেরকে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে যোগদানের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অতীতে বাংলার মুসলমানরা যে বীরত্ব দেখিয়েছেন তা ইতিহাসে সুবিদিত...এখন বাংলার পুরনো সামরিক উদ্দীপনা পুনরুজ্জীবিত করে বিশ্বের কাছে বাংলার শক্তি প্রদর্শনের সবরকম সুবিধা আমরা পেয়েছি। দেশরক্ষা ও দেশের নিরাপত্তার দায়িত্ব আপনাদের।’
ভাষণ শেষে মি. জিন্নাহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর এম আহমদকে ‘মিলিটারি ক্রস’ পদক পরিয়ে দেন।
ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা তখন রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবিতে বিক্ষোভ, ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছিল।
ফলে সেনানিবাসের অনুষ্ঠান শেষ করেই একইদিন সন্ধ্যায় ছাত্রদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নেন মি. জিন্নাহ। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল রমনায় তিনি যেখানে উঠেছিলেন, সেই চিফ সেক্রেটারির সরকারি বাসভবনে।
লেখক, গবেষক ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের প্রয়াত নেতা বদরুদ্দীন উমর তার ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ গ্রন্থে লিখেছেন যে, আমন্ত্রণ পেয়ে সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলেন যেসব ছাত্রনেতারা বৈঠকে গিয়েছিলেন, সেখানে জগন্নাথ হলের দুজন হিন্দু ছাত্রনেতাও ছিলেন।
ছাত্রপ্রতিনিধিদের প্রত্যেকের সাথে পরিচিত হওয়ার পর মি. জিন্নাহ তাদের কাছে জানতে চান যে, তিনি ছাত্রদের জন্যে কী করতে পারেন।
জবাবে ছাত্রনেতাদের মধ্য থেকে মহম্মদ তোয়াহা বলেন যে, ইচ্ছে করলে মি. জিন্নাহ একটি ছাত্র সমাবেশে বক্তৃতা দিতে পারেন। জিন্নাহ বলেন, এ বিষয়ে তিনি চিন্তা করে দেখবেন।
লেখক ও গবেষক মি. উমর তার বইতে লিখেছেন, পনেরো-বিশ মিনিটকাল স্থায়ী এই সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে কোন আলোচনা কোন পক্ষ থেকেই উত্থাপন করা হয়নি। জিন্নাহ ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকের কুশল জিজ্ঞাসা করেন এবং অত্যন্ত মামুলি কিছু কথাবার্তার পর তিনি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান।
“এই সময় মহম্মদ তোয়াহা তাঁর হাতে ইংরেজিতে লিখিত একটি স্মারকলিপি দিয়ে বলেন, ‘ভাষা সমস্যার উপর এটি একটি স্মারকলিপি। আপনি এটি পড়ে দেখবেন।’ জিন্নাহ স্মারকলিপিটি হাতে নিয়ে পাশের টেবিলে রেখে দেন, কিন্তু সে বিষয়ে কোন মন্তব্য করেন না”, ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন মি. উমর।
তিনি আরো লিখেছেন যে, ঘর থেকে বের হওয়ার পর মি. জিন্নাহর মিলিটারি সেক্রেটারি হঠাৎ দৌড়ে এসে মহম্মদ তোয়াহাকে বলেন যে, তিনি ও নজরুল ইসলাম যেন গভর্নর জেনারেলের সঙ্গে আরেকবার দেখা করেন।
‘মিলিটারি সেক্রেটারির এই কথা শুনে তাঁরা দু'জনে ভেতরে গিয়ে দাঁড়াতে জিন্নাহ তাঁদের বললেন যে, সাক্ষাৎকারের ব্যাপারে একটা ভুল হয়ে গেছে। তিনি শুধু মুসলমান ছাত্রদের সাথে দেখা করতে চেয়েছিলেন, হিন্দু ছাত্রদের সাথে নয়’, নিজের বইতে লিখেছেন মি. উমর।
পরবর্তীতে মুসলিম ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে মি. জিন্নাহ তাদের মধ্যকার বিরোধ নিরসন এবং ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
ভাষণ ঘিরে রেসকোর্সে হট্টগোল
সফরের তৃতীয় দিন ২১ মার্চ বিকেলে তৎকালীন রেসকোর্সের ময়দান, যা এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামে পরিচিত, সেখানে মি. জিন্নাহকে সম্বর্ধনা দেওয়ার আয়োজন করেন ঢাকার নাগরিক কমিটি। অনুষ্ঠানে কমিটির সভাপতি নবাব হাবিবুল্লাহ মি. জিন্নাহকে দেওয়া মানপত্র পড়ে শোনান। এরপর মি. জিন্নাহ ইংরেজিতে বক্তৃতা দেন।
প্রায় এক ঘণ্টার ওই ভাষণে তিনি ভাষা আন্দোলনের নিন্দা জানান এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার বিষয়ে সরকারের মনোভাব কী, সেটি তিনি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
‘আপনাদের দৈনন্দিন জীবনের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে কোন রকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হবে এ কথার মধ্যে কোন সত্যতা নেই। কিন্তু আপনারা, এই প্রদেশের অধিবাসীরাই, চূড়ান্তভাবে স্থির করবেন আপনাদের প্রদেশের ভাষা কী হবে। কিন্তু এ কথা আপনাদেরকে পরিষ্কারভাবে বলে দেওয়া দরকার যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোন ভাষা নয়’, বলেন মি. জিন্নাহ।
‘এ ব্যাপারে যদি কেউ আপনাদেরকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে তাহলে বুঝতে হবে সে হচ্ছে রাষ্ট্রের শত্রু। একটিমাত্র রাষ্ট্রভাষা ছাড়া কোনো জাতিই এক সূত্রে গ্রথিত হয়ে কার্যনির্বাহ করতে পারে না। অন্য দেশের ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে দেখুন। অতএব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু’, যোগ করেন তিনি।
তার এমন বক্তব্যে দর্শকসারি অনেকেই হতাশ হন। তারা ‘না, না’ ধ্বনি তুলে প্রতিবাদ করলে জনসভায় হট্টগোল শুরু হয়। যদিও পরবর্তীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে এবং জনসভাটি শান্তভাবেই শেষ হয়।
মি. জিন্নাহর ভাষণের প্রতিক্রিয়া সম্পর্ক বলতে গিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ তার ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘কায়েদে আজমের ভাষণ এ প্রদেশের সবাইকে আহত করেছে। প্রত্যেকেই নিদারুণ বিরক্ত- তিনি দলের ওপরে উঠবেন, সবাই সে আশাই করেছিল।’
ফের শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে জিন্নাহ
রেসকোর্স ময়দানের ভাষণের তিন দিনের মাথায়, অর্থাৎ ২৪ মার্চ সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগ দেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। সেখানে গিয়ে রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে তিনি আবারও একই বক্তব্য তুলে ধরেন।
ইংরেজিতে দেওয়া সেই ভাষণের বর্ণনা ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ গ্রন্থে তুলে ধরেছেন বদরুদ্দীন উমর।
‘আমি রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে আমার বক্তব্য আবার বলছি। এই প্রদেশের সরকারি কাজের জন্য এই প্রদেশের লোকেরা নিজেদের ইচ্ছামতো যে কোনো ভাষা ব্যবহার করতে পারে। যথাসময়ে এবং এই প্রদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সুচিন্তিত মতামতের মাধ্যমে তাদের ইচ্ছানুসারেই এই প্রশ্নের মীমাংসা হবে। কিন্তু রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রদেশের যোগাযোগের ভাষা হিসাবে একটি ভাষা থাকবে। এবং সে ভাষা হবে উর্দু অন্য কোন ভাষা নয়’, বলেন মি. জিন্নাহ।
উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবে রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, যা এই উপমহাদেশের লক্ষ লক্ষ মুসলমানদের দ্বারা পুষ্ট হয়েছে, যা পাকিস্তানের এক থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত সকলেই বোঝে এবং সর্বোপরি যার মধ্যে অন্য যে কোনো প্রাদেশিক ভাষার থেকে ইসলামি সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য বাস্তবরূপ লাভ করেছে এবং যে ভাষা অন্যান্য ইসলামী দেশগুলিতে ব্যবহৃত ভাষার সর্বাপেক্ষা কাছাকাছি।’
ভাষা আন্দোলনকে বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। পাকিস্তান রাষ্ট্রের একতা নষ্ট করার জন্যই একটি মহল ছাত্রদের ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
কিন্তু তার সামনে উপস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মি. জিন্নাহর সব যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেন এবং ‘না, না’ বলে চিৎকার করতে থাকেন।
মি. উমর তার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, সেদিন যারা জিন্নাহর বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন, তাদের মধ্যে ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন এবং এ কে এম আহসানও ছিলেন।
“জিন্নাহ তার সমাবর্তন বক্তৃতায় ‘উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে’- এ কথা যে উল্লেখ করবেন, সেটা ছাত্রেরা নিশ্চিতভাবে ধরে নিয়েছিলেন। কাজেই তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্যেও তাঁরা আগে থেকেই প্রস্তুত হয়েছিলেন”, লিখেছেন বদরুদ্দীন উমর।
তর্কাতর্কি, অপসারণের হুমকি
সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়ার পর ওইদিন সন্ধ্যায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।
অন্যান্যদের মধ্যে সেখানে উপস্থিত ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, শামসুল হক, কমরুদ্দীন আহমদ, আবুল কাসেম, লিলি খাঁ, মহম্মদ তোয়াহা এবং অলি আহাদ।
তারা বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তুলে ধরলে মি. জিন্নাহ সেটি প্রত্যাখ্যান করেন। বিষয়টি একপর্যায়ে তর্কাতর্কির পর্যায়ে চলে যায় বলে ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন বদরুদ্দীন উমর।
‘ভাষা প্রশ্ন নিয়ে সাধারণভাবে জিন্নাহর সাথে তাঁদের তর্কাতর্কি শুরু হয়ে পরিশেষে তো ঘোরতর ঝগড়ায় পরিণত হলো। প্রথমেই মহম্মদ তোয়াহা তাঁকে সরাসরি বলেন যে, তাঁরা রাষ্ট্রভাষা বাংলা চান। এর উত্তরে জিন্নাহ বলেন যে, তিনি তাঁদের কাছে রাজনীতি শিক্ষা করতে আসেননি’, লিখেছেন গবেষক মি. উমর।
মি. জিন্নাহর মতে, পাকিস্তানে একাধিক রাষ্ট্রভাষা করা হলে সেটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিপন্ন করবে। একাধিক রাষ্ট্রভাষা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন বলেও বর্ণনা করেন তিনি। তখন মি. তোয়াহা কানাডা, সুইজারল্যান্ডসহ বেশ কিছু দেশ, যাদের একাধিক রাষ্ট্রভাষা রয়েছে, সেটির উদাহরণ তুলে ধরেন।
“তোয়াহা তাঁকে বলেন যে, একাধিক রাষ্ট্রভাষার কথা একটি ঐতিহাসিক সত্য কাজেই সেই সত্যকে তিনি কিভাবে অস্বীকার করতে পারেন। এর উত্তরে জিন্নাহ উষ্মার সাথে বলেন যে তিনি ইতিহাস পাঠ করেছেন, তিনি এসব কথা জানেন”, বদরুদ্দীন উমর তার বইতে উল্লেখ করেছেন।
এর প্রতিক্রিয়ায় মি. জিন্নাহকে উদ্দেশ করে অলি আহাদ বলেন, তিনি শুধু ইতিহাসই জানেন, তা নয়; বরং তিনি এটাও জানেন যে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল জিন্নাহকে অপসারণের জন্য তারা ইংল্যান্ডের রানীর কাছে আবেদনও জানাতে পারেন।
“অলি আহাদের উপরোক্ত কথায় জিন্নাহ রীতিমতো ক্রুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং অলি আহাদ ও সংগ্রাম পরিষদের অন্যান্য সদস্যদের উচ্চকণ্ঠে বকাবকি করতে থাকেন। এর ফলে ঘরের মধ্যে দারুণ হৈ চৈ পড়ে যায়”, লিখেছেন মি. উমর।
ফাতেমা জিন্নাহর বেতার ভাষণ
২৪ মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তানের নারীদের উদ্দেশ্যে ঢাকা বেতারে ভাষণ দেন গভর্নর জেনারেলের বোন ফাতেমা জিন্নাহ। ‘ঢাকায় জিন্না’ বইতে সেটির একটি বিবরণ তুলে ধরেছেন লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ।
সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, পূর্ব পাকিস্তানে আসার পর আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করার জানাতে ভাষণের শুরুতে সবাইকে ধন্যবাদ জানান ফাতিমা জিন্নাহ।
পরে তৎকালীন ‘শিশুরাষ্ট্র’ পাকিস্তানকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার জন্য নারীদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
“আপনারা জানেন, ইসলামের সুদীর্ঘ ও মহান ইতিহাসে নারীরা এক মহান ভূমিকা পালন করেছেন এবং দেশ-জাতির কল্যাণ ও অগ্রগতিতে সাহায্য করেছেন। ইতিহাসে নারীদের অসাধারণ রাজনীতিজ্ঞান, শৌর্যবীর্য ও আত্মত্যাগের অনেক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়”, ভাষণে বলেন ফাতিমা জিন্নাহ।
“আজ শিশুরাষ্ট্র পাকিস্তানও আপনাদের কাছে ভক্তি, ত্যাগ ও সাহসিকতার দাবি করে এবং আপনারা এসব জ্ঞানের অধিকারী”, যোগ করেন তিনি।
পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম নারী ন্যাশনাল গার্ড প্রতিষ্ঠা করায় প্রশংসা করেন।
বেতার ভাষণে ভাষা আন্দোলনের প্রসঙ্গও আনেন গভর্নর জেনারেল মি. জিন্নাহর বোন।
“আরেকটি ক্ষেত্রে আপনারা রাষ্ট্রকে বিশেষভাবে সাহায্য করতে পারেন। এটা হচ্ছে, একতার বন্ধন সুদৃঢ় করা। নানা প্রকাশ বিতর্ক ও বিরোধের সৃষ্টি করে শত্রুরা এই ঐক্য ধ্বংস করার জন্য সচেষ্ট রয়েছে। আপনারা আপনাদের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হবেন না”, বলেন ফাতিমা জিন্নাহ।
চট্টগ্রামে যা যা করেছিলেন
ঢাকায় রাজনৈতিক নেতা ও ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক বৈঠকের পর ২৫ মার্চ সকালে বিমানযোগে চট্টগ্রামে যান মি. জিন্নাহ। পতেঙ্গা ঘাঁটিতে নামার পর পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন এবং চাকরা রাজা নলীনাক্ষ রায় ছাড়াও হাজারো মানুষ তাকে স্বাগত জানান।
লেখক মহিউদ্দিন আহমদ তার ‘ঢাকায় জিন্না’ গ্রন্থে লিখেছেন, জিন্নাহর আগমন উপলক্ষে ঢাকার মতো চট্টগ্রামেও তখন বিশেষভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল।
পতেঙ্গা বিমানঘাঁটি থেকে চট্টগ্রামের পুরনো গভর্নমেন্ট হাউজ পর্যন্ত প্রায় দশ মাইল পথে অন্তত দুইশ'টি তোরণ নির্মাণ করা হয়। সকাল থেকে হাজার হাজার মানুষকে সেখানে অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
‘জিন্নার আগমন উপলক্ষে চট্টগ্রামের মানুষ উৎসবে মেতে ওঠে। সবাই নিজ নিজ বাসা, দোকান, রেস্তোরাঁ সাজায়’, নিজের বইতে লিখেছেন মি. আহমদ।
পুরনো গভর্নমেন্ট হাউজে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর মি. জিন্নাহ চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শনে যান। সেখানে বন্দর ও জেটি সম্প্রসারণের বিষয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। এরপর চট্টগ্রাম শহরে ফিরে এসে পুরাতন বাজার ও পাহাড়ি এলাকা ঘুরে দেখেন এবং সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম ক্লাবে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
চট্টগ্রামে সফরের দ্বিতীয় ও শেষদিন ২৬শে মার্চ মি. জিন্নাহ পুলিশ লাইনস মাঠে আয়োজিত সংবর্ধনা সভায় ভাষণ দেন। ওই সভায় প্রায় অর্ধলাখ মানুষ সমবেত হয়েছিল বলে বইতে উল্লেখ করেছেন লেখক মি. আহমদ।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের শুরুতে একটি মানপত্র পাঠ করা হয়, তারপর উপহার হিসেবে মি. জিন্নাহ'র হাতে একটি রুপার জাহাজ তুলে দেন চট্টগ্রামের বাসিন্দারা। সেইসঙ্গে, 'কায়েদে আজম সাহায্য তহবিলে' প্রায় দুই লাখ ২৫ হাজার টাকা দেন তারা।
ভাষণ প্রদানকালে জিন্নাহ প্রতিশ্রুতি দেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বন্দরে পরিণত করা হবে। সেইসঙ্গে, এটাও বলেন যে, চট্টগ্রামে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সম্ভাব্য জলবিদ্যুৎ তৈরির জন্য কর্ণফুলী নদীর স্রোত নিয়ন্ত্রণকে তার সরকার বিশেষভাবে পরীক্ষা করে দেখছে।
জনসভার পর চট্টগ্রামের বোমাং ও চাকমা নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন মি. জিন্নাহ।
এছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশেও একটি ভাষণ দেন। সেখানে তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনকালে কোনো মন্ত্রীও যদি হস্তক্ষেপ করতে আসে, তাতেও যেন কর্মকর্তারা কর্তব্যচ্যুত না হন।
জিন্নাহ'র বিদায় ভাষণ
দশ দিনের সফর শেষ করে করাচি রওনা হওয়ার আগে মি. জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উদ্দেশ্যে রেডিও পাকিস্তানে একটি ভাষণ দেন।
১৯৪৮ সালের ২৮শে মার্চ প্রচারিত ওই ভাষণে তিনি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
"এক শ্রেণির লোকের মধ্যে নব-অর্জিত স্বাধীনতাকে যথেচ্ছাচারের অধিকার হিসাবে দেখার একটা দুঃখজনক প্রবণতা আমি লক্ষ্য করছি...কোন সরকারের পক্ষে এক মুহূর্তের জন্য ঐ জাতীয় উচ্ছৃঙ্খল দায়িত্বজ্ঞানহীন লোকদের দলবদ্ধ গুণ্ডামী এবং রাজত্ব সহ্য না করে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে এই অবস্থার মোকাবেলা করা উচিত," রেডিও ভাষণে বলেন মি. জিন্নাহ।
"এক্ষেত্রে আমি বিশেষভাবে ভাষার বিতর্কের কথা ভাবছি, যেটা এই প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে অযথা অনেক উত্তেজনা ও সমস্যা সৃষ্টি করেছে। এই অবস্থাকে আয়ত্তে না আনলে এর ফলাফল ভয়ঙ্কর হতে পারে," যোগ করেন তিনি।
মি. জিন্নাহ এটাও বলেন যে, "আমরা যদি প্রথমে নিজেদেরকে বাঙালী, পাঞ্জাবী, সিন্ধী ইত্যাদি মনে করে শুধু প্রসঙ্গক্রমে নিজেদেরকে পাকিস্তানী মনে করি, তাহলে পাকিস্তান ধ্বংস হতে বাধ্য।"
ভাষা আন্দোলনের পেছনে ভারতের হাত রয়েছে বলে সন্দেহ পোষণ করেন পাকিস্তানের এই নেতা।
"আমি চাই, যাতে আপনারা প্রাদেশিকতার এই হলাহল, যা আমাদের শত্রুরা আমাদের রাষ্ট্রের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে চায়, তার সম্পর্কে সতর্ক থাকুন," বলেন মি. জিন্নাহ।
পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার্থীরা গভর্নর জেনারেলের এসব বক্তব্যে কান দেননি। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তারা আন্দোলন চালিয়ে যান।
১৯৫২ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করলে ঢাকায় পুলিশের গুলিতে সালাম, রফিক, জব্বারসহ আরো বেশ কয়েকজন নিহত হন।
এ ঘটনার পর আন্দোলন আরো তীব্রতর হয়ে ওঠে, যার ফলশ্রুতিতে ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
জুলাই মাসে গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর উত্তরায় মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ ১১ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২৬ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হবে কি না, সে বিষয়ে ২৩ সেপ্টেম্বর আদেশ প্রদান করবেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ এই আদেশটি দেওয়া হয়।
এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর এ মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী এম লিটন আহমেদ।
পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে ছিলেন মো. আমির হোসেন ও এম হাসান ইমাম। মামলার ২৬ আসামির মধ্যে সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মির্জা সালাউদ্দিনসহ আটজন কারাগারে অবস্থান করছেন।
সাবেক সংসদ সদস্য হাবিব হাসান, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান এবং উত্তরা বিভাগের সাবেক ডিসি কাজী আশরাফুল আজীমসহ ১৮ আসামি পলাতক রয়েছেন। এ মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রথম অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে গণ-অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে নিতে সহযোগিতা করার পাশাপাশি আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার মধ্যে পানি ও বিস্কুট বিতরণ করছিলেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। এ সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। সতীর্থ আন্দোলনকারীরা তাঁকে উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
একই দিন উত্তরা এলাকায় জাহিদুজ্জামান তানভীন, শেখ ফাহমিন জাফর, মো. শাকিল হোসেন, মো. সাব্বির হোসেন ও সজিব সরকারকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া সেদিন উত্তরায় এপিসির (সাঁজোয়া যান) পেছনের চাকায় পিষ্ট করে উবারচালক মোখলেসুর রহমান দুর্জয়কে হত্যার অভিযোগও রয়েছে।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই উত্তরা এলাকায় রিদোয়ান শরীফ, মো. ছাব্বির ইসলাম, মো. আসাদুল্লাহ ও নাঈমা সুলতানাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
চার তরুণ উদ্যোক্তা স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষ শুরু করেছিলেন। তারা বছরে এক লাখ টাকা লিজে পুকুর নিয়ে প্রায় চার লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। পুকুরটিতে রুই, কাতলা, পাঙাশ, সিলভার কার্পসহ ৭-৮ প্রজাতির মাছ ছিল। কিছুদিনের মধ্যে মাছ বিক্রি করে লাভের মুখ দেখার পরিকল্পনা ছিল তাদের। কিন্তু দুর্বৃত্তদের কারণে সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে। রাতের আঁধারে পুকুরে বিষ প্রয়োগের ফলে আনুমানিক ৯০ মণ মাছ মারা গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের দাবি, এতে প্রায় ৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার রামজয়পুর গ্রামে।
ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা হলেন— মাজহারুল ইসলাম অপু, সাইফুল ইসলাম সম্রাট, রাহাত আলী ও তানজীর আহমেদ মানিক।
তথ্য অনুযায়ী, চার তরুণ একসঙ্গে উদ্যোগ নিয়ে রামজয়পুর গ্রামের একটি পুকুর বছরে এক লাখ টাকা লিজ নেন। এরপর পুকুর প্রস্তুত করে প্রায় চার লাখ টাকা বিনিয়োগ করে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের চাষ শুরু করেন। দীর্ঘদিন পরিচর্যার পর মাছগুলো বিক্রির উপযোগী হয়ে উঠেছিল। তারা কিছুদিনের মধ্যে মাছ বিক্রি করে বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ার পাশাপাশি লাভের আশা করেছিলেন।
কিন্তু রাতের কোনো একসময় দুর্বৃত্তরা পুকুরে বিষ প্রয়োগ করে। সকালে পুকুরে গিয়ে অসংখ্য মৃত মাছ ভাসতে দেখে বিষয়টি তাদের নজরে আসে। পরে তারা নিশ্চিত হন যে, পুকুরের প্রায় ৯০ মণ মাছ মারা গেছে।
উদ্যোক্তাদের দাবি, মাছ মারা যাওয়ায় তাদের প্রায় ৭ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তারা অভিযোগ করেছেন, পরিকল্পিতভাবে পুকুরে বিষ প্রয়োগ করে মাছ নিধন করা হয়েছে।
চার তরুণ উদ্যোক্তা বলেন, মাছ চাষের মাধ্যমে নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরি করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা। তবে দুর্বৃত্তদের বিষ প্রয়োগে শুধু পুকুরের মাছই মারা যায়নি, তাদের স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নও বড় ধাক্কা খেয়েছে।
এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা। তারা ক্ষয়ক্ষতির সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতারও দাবি করেন।
শৈলকুপা থানার ওসি হুমায়ুন কবির মোল্লা বলেন, অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
বাস টার্মিনাল রয়েছে। যাত্রী ওঠানামা ও বাস রাখার জন্য নির্ধারিত জায়গাও রয়েছে। নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকা। অথচ টার্মিনালটি পড়ে আছে, আর ব্যস্ত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কেই বাসগুলো পার্কিং করা হচ্ছে।
ফলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়া পৌরসভার বাস টার্মিনাল কেন ব্যবহার করা হচ্ছে না, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টার্মিনাল নির্মাণের পরও বাস মালিক ও শ্রমিকদের একটি অংশ সেখানে বাস না রেখে পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মহাসড়কের পাশে বাস দাঁড় করিয়ে রাখছেন। নির্দিষ্ট স্টপেজের পরিবর্তে সড়কেই যাত্রী ওঠানামা করানো হচ্ছে। ব্যস্ত সময়ে একই স্থানে একাধিক বাস দাঁড়ানোর কারণে সেখানে সৃষ্টি হচ্ছে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। বিশেষ করে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পটিয়া পৌরসদর অংশে ভয়াবহ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।
পটিয়া পৌরসভার গিরিশ চৌধুরী বাজার এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে নির্মিত বাস টার্মিনালের নির্মাণকাজ ২০১৪ সালের নভেম্বরে শেষ হয়। এরপর উদ্বোধন করা হয় ওই বছরের ১৩ ডিসেম্বর। এর পর কেটে গেছে প্রায় এক যুগ। কিন্তু দীর্ঘ এই সময়ে টার্মিনালটি পটিয়ার যানজট নিরসনে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারছে না।
এদিকে, পটিয়া শহরের ব্যস্ততম অংশে বিভিন্ন রুটের বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানোর দৃশ্য এখন অনেকটাই নিয়মিত হয়ে গেছে। বাস থামার পর পেছনে থাকা গাড়িগুলোকে ধীরগতিতে চলতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিপরীত লেন দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে এগোতে হয় ছোট যানবাহনকে।
একটি বাসের পেছনে আরেকটি বাস দাঁড়িয়ে গেলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে পড়ে। বাসের আড়ালে পথচারী সড়ক পার হওয়ার চেষ্টা করলে দেখা দেয় দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
এ ব্যাপারে পটিয়া বাস মিনিবাস মালিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম উদ্দিন বলেন, পৌর বাস স্টেশনে বাস রাখার পরিবেশ নেই। সেখানে নেই নিরাপত্তা, পানি, বিদ্যুৎ ও পর্যাপ্ত আলোর। পাশাপাশি সেখানে বড় বড় খানাখন্দ রয়েছে। তাছাড়া সেখানে গাড়ি রাখলে যন্ত্রাংশ চুরি হয়। তাই নিরাপত্তার অভাবে সেখানে কেউ গাড়ি রাখতে চায় না।
পটিয়া ট্রাফিক জোনের ইনচার্জ মো. আমীর ফারুক বলেন, বিষয়টি নিয়ে পটিয়া বাস মালিক সমিতির সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা আশ্বস্ত করেছেন খুব দ্রুত অবৈধ বাস স্টেশন থেকে বাস সরিয়ে নিয়ে পৌর বাস টার্মিনালে রাখবেন।
তিনি বলেন, শেষবারের মতো তাদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর পরও তারা নির্দেশনা না মানলে আমরা সম্মিলিতভাবে আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে বাধ্য হবো।
পটিয়া পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারহানুর রহমান বলেন, তিন মাস আগে বাস মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে পটিয়া পৌরসভায় একটি সভা হয়েছিল। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছিল এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে বাস পার্কিংয়ে টার্মিনাল ব্যবহার করা হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা টার্মিনালে বাস রাখছেন না।
ইউএনও আরো বলেন, পটিয়ার ট্রাফিক সার্জেন্ট বাস মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। টার্মিনালটি সচল না করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ