০৮:২৬ পি.এম
‘যশোরের যশ, খেজুরের রস’—এই প্রবাদটি শতাব্দী ধরে প্রচলিত থাকলেও, এটি এখন দেশের কৃষি অর্থনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে এবং এটি কেবল লোকসংস্কৃতির অংশ নয়।
যশোর, যা সবজিজোন হিসেবে পরিচিত, বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী খেজুর গুড়ের মাধ্যমে কৃষির রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। শীতকালীন চার মাসের মৌসুমে, এই জেলায় প্রায় দেড়শত কোটি টাকার রস ও গুড়ের বেচাকেনা হয়ে থাকে। সম্প্রতি জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর, এর চাহিদা ও বাজার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তুলছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, যশোর জেলা দেশের সর্বোচ্চ গুড় উৎপাদনকারী জেলা। গত পাঁচ বছরে খেজুর গুড়ের উৎপাদন ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে জেলায় ২৩ লাখ ৩০ হাজার ৬৯৫টি খেজুর গাছ রয়েছে, যার মধ্যে রস আহরণের উপযোগী গাছের সংখ্যা ৩ লাখ ৭ হাজার ১৩০টি। একটি গাছ থেকে মৌসুমে গড় ২০ কেজি রস আহরণ করা সম্ভব, যা থেকে প্রায় ৮ কেজি গুড় তৈরি হয়। সব মিলিয়ে, জেলায় মৌসুমে প্রায় ৯৫ লাখ কেজি বা সাড়ে ৯ হাজার মেট্রিক টন গুড় উৎপাদিত হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৫০ কোটি টাকা।
আরও পড়ুন: রাসায়নিক কীটনাশকের অতিব্যবহারে সিরাজগঞ্জের মাটির উর্বরতা ঝুঁকিতে
যশোরের চৌগাছা উপজেলার পঞ্চাশোর্ধ্ব গাছি মিসকিন দফাদার জানান, তিনি পাঁচ বিঘা জমিতে ধান, পাট ও সবজি আবাদ করে লাভবান হতে পারেন না। তবে শীতের চার মাস খেজুর গাছের পরিচর্যা ও রস-গুড় বিক্রি করে তিনি ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা নিট লাভ করেন। গত মৌসুমে তিনি ৮০ হাজার টাকার গুড় বিক্রি করেছেন।
এক সময় গাছিদের পরবর্তী প্রজন্ম এই পেশায় আসতে অনিচ্ছুক ছিল, কিন্তু বর্তমানে ভালো দাম পাওয়ার কারণে চিত্র পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। চৌগাছার বড় খানপুর গ্রামের রুবেল হোসেন, যিনি বাবা ইউসুফ আলীর ঐতিহ্য ধরে রেখে গত মৌসুমে ৬০ হাজার টাকার গুড় বিক্রি করেছেন, তিনি এই পরিবর্তনের উদাহরণ।
গ্রামের হাট-বাজারের বাইরে যশোরের খেজুর গুড়ের কদর এখন অনলাইন ও ই-কমার্সেও ছড়িয়ে পড়েছে। জেলা থেকে সরাসরি দেশে এবং বিদেশে ভোক্তাদের কাছে খাঁটি পাটালি পৌঁছে যাচ্ছে। পাশাপাশি, চিনির স্বাস্থ্যসম্মত বিকল্প হিসেবে শহরের বাসাবাড়ি, রাস্তার ধারের পিঠার দোকান এবং চায়ের দোকানেও খেজুর গুড়ের ব্যবহার বাড়ছে।
তবে এই শিল্পে কিছু সংকটও দেখা দিয়েছে। নতুন গাছ না লাগানো, ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে গাছ কেটে ফেলা এবং তরুণদের মাঝে দক্ষ গাছির অভাব অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া, বাজারে অসাধু চক্রের চিনি ও কেমিক্যাল মিশিয়ে ভেজাল গুড় বিক্রির প্রবণতা আসল গুড়ের সুনামকে ক্ষুণ্ন করছে।
আরও পড়ুন: রাজিবপুরে বাদামের বাম্পার ফলনের আশা, ৮৬৭ হেক্টর চাষের পরিকল্পনা
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, যশোরের খেজুর গুড় সুস্বাদু ও নিরাপদ রাখতে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ, প্রশিক্ষণ এবং উঠান বৈঠকের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। নিরাপদ রস ও গুড় উৎপাদনে জোর দেওয়ায় গত পাঁচ বছরে উৎপাদন যেমন বেড়েছে, তেমনি কৃষকরাও বাড়তি আয়ের মুখ দেখছেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন