০১:৫১ পি.এম
ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষার জন্য সরকারী নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ভোলায় মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে মা ইলিশ শিকার অব্যাহত রয়েছে। চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরের মা ইলিশ রক্ষা কর্মসূচির অংশ হিসেবে ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিনের জন্য সব ধরনের মাছ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বিক্রির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তবে নদীর অভয়াশ্রমে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরা চলতে থাকায় এবং প্রশাসনের 'ঢিলেঢালা' ভূমিকার কারণে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) পর্যন্ত মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ শিকারের দায়ে ভোলা জেলায় পরিচালিত অভিযানে প্রায় অর্ধশতাধিক জেলেকে আটক করা হয়েছে। মৎস্য বিভাগ ও প্রশাসনের উদ্যোগে পরিচালিত এসব অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৫১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, ৪৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং ৩৫ জন জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় কিছু জেলেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। উদ্ধারকৃত ইলিশ বিভিন্ন এতিমখানায় বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ১ লাখ ৭০ হাজার মিটার জাল জব্দ করা হয়েছে এবং বেশ কিছু নৌকা আটক করে নিলামে বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন।
এর আগে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় মৎস্য বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পৃথক অভিযান পরিচালনা করে। ভোলা সদর উপজেলায় ১৭ জন জেলেকে আটক করা হয়, যাঁদের পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানা করা হয় এবং ৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ককে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়; এ সময় ৩টি নৌকা, ১০ কেজি ইলিশ ও ২৫ হাজার মিটার জাল জব্দ করা হয়। দৌলতখান উপজেলায় ৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক জেলেকে মুচলেকা দিয়ে মুক্ত করার পাশাপাশি ১টি নৌকা, ১৫ কেজি ইলিশ ও ১ লাখ মিটার জাল জব্দ করা হয়েছে। তজুমদ্দিন উপজেলায় ১০ জন জেলেকে আটক করে কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং তাঁদের কাছ থেকে ২টি নৌকা, ৬ কেজি মাছ ও ২০ হাজার মিটার জাল জব্দ করা হয়। অন্যদিকে চরফ্যাশন উপজেলায় আটক ৮ জনের মধ্যে ৬ জনকে কারাদণ্ড এবং ২ জনকে মুচলেকা দিয়ে মুক্তি দেওয়া হয়েছে; এ সময় ১০ কেজি ইলিশ ও ২২ হাজার মিটার জাল উদ্ধার করে পুলিশ ও মৎস্য বিভাগ।
আরও পড়ুন: এখন থেকে গণতান্ত্রিক ধারায় সরকার পরিবর্তন হবে, জোর করে কেউ ক্ষমতায় থাকতে পারবে না: হুইপ নিজান
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ভোলার সাতটি উপজেলায় সরকারিভাবে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩১২ জন। তবে এ বছর ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমের জন্য ১ লাখ ৪৩ হাজার ৬৫৬ জন জেলের জন্য ৩ হাজার ৫৯১ দশমিক ৪ টন খাদ্য সহায়তার চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উপজেলাওয়ারী বরাদ্দের মধ্যে ভোলা সদরে ৫২৫ টন, দৌলতখানে ৫০০ টন, বোরহানউদ্দিনে ৪৩০ টন, তজুমদ্দিনে ৪৩২ দশমিক ৫ টন, লালমোহনে ৫২৫ টন, চরফ্যাশনে ৮৯১ দশমিক ৪ টন ও মনপুরা উপজেলায় ২৮৭ দশমিক ৫ টন চাল দেওয়া হবে। প্রতি জেলে ২৫ কেজি করে চাল পেলেও নিবন্ধিত থেকেও সরকারি এই সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ২৩ হাজার ৬৫৬ জন জেলে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বরাদ্দকৃত চালের ৫০ শতাংশ ইতিমধ্যে জেলেদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।
এদিকে ভোলার সাতটি উপজেলার নদী পরিবেষ্টিত এলাকায় মাছ শিকার করে প্রায় ৩ লাখ জেলে জীবিকা নির্বাহ করলেও নিবন্ধনের খাতায় আছেন কেবল ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩১২ জন। উপজেলাভিত্তিক হিসেবে ভোলা সদরে ২২ হাজার ২৫২ জন, দৌলতখানে ২১ হাজার ৫০২ জন, বোরহানউদ্দিনে ১৯ হাজার ৩৫০ জন, তজুমদ্দিনে ১৮ হাজার ৭১৭ জন, মনপুরায় ১৬ হাজার ৪০০ জন, লালমোহনে ২৪ হাজার ৮০৬ জন এবং চরফ্যাশনে ৪৪ হাজার ২৮৫ জন জেলে নিবন্ধিত রয়েছেন।
স্থানীয় মাঝিরা জানান, সরকার প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরা বন্ধের যে নির্দেশ দেয়, জেলেরা কষ্ট হলেও তা মেনে চলে। কিন্তু জেলেদের কষ্টের কথা কেউ ভাবেন না। অনেক জেলে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ৪-৫ বছর আগে জেলে কার্ড পেয়েও এখনো সরকারি চাল জোটেনি তাঁদের ভাগ্যে। প্রতি বছর চাল পাওয়ার আশায় ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে খালি হাতে ফিরতে হয় তাঁদের। পরিষদ থেকে জানানো হয় সবার নামে বরাদ্দ আসেনি। ফলে বাধ্য হয়ে ধার-দেনা করে পরিবার চালাতে হয় জেলেদের।
পূর্ব ইলিশা ইউনিয়নের জংষন গ্রামের জেলে আবুল কালাম মাঝি জানান, নিষেধাজ্ঞার এই ২২ দিন কোনো আয়-রোজগার না থাকায় পরিবার কীভাবে চলবে এবং ব্যাংক বা এনজিওর কিস্তি কীভাবে শোধ করবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তাঁরা। প্রতিটি জেলেই এনজিও ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে জাল-নৌকা কিনেছেন। এ কারণে ২২ দিনের এই নিষেধাজ্ঞার সময় এনজিও ও ব্যাংকের কিস্তি বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জেলেরা।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ-ভারতের দুর্গাপূজার মধ্যে গভীর মিলের কথা বললেন ডেপুটি হাই কমিশনার
ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, এ বছর দ্রুত সময়ের মধ্যে চাল বিতরণের কাজ করা হচ্ছে। কোনো জেলে যেন ওজনে চাল কম না পান সে জন্য মৎস্য বিভাগের কঠোর নজরদারি রয়েছে। একই সঙ্গে ২২ দিনের জন্য এনজিওগুলোর কিস্তি আদায় বন্ধ রাখার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। মৎস্য অভিযানে জনবল ও প্রয়োজনীয় সহায়তার কিছুটা ঘাটতি থাকলেও ইলিশের প্রজনন সফল করতে সব ধরনের কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে, যেন আগামীতে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জিত হয়।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন