০৬:১০ এম
স্বামীর চেয়ে স্ত্রীর আয় বেশি হলে পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়ে।
বিশ্বজুড়ে নারীদের আর্থিক স্বাধীনতা ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। ফলে অনেক পরিবারে স্বামীর চেয়ে স্ত্রীর বেশি আয় করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই পরিবর্তনটি লিঙ্গ সমতার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি অনেক পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মসম্মান এবং দাম্পত্য সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অর্থনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেলেও অনেক সমাজে এখনও পুরুষকে পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই কারণে, যখন স্ত্রীরা বেশি আয় করতে শুরু করেন, তখন কিছু পুরুষ নিজেদের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয়ে ভোগেন এবং হীনম্মন্যতা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকেন।
আরও পড়ুন: ‘ভালোবাসি’ বললেই কি যথেষ্ট? সম্পর্কে ৫টি বিষয়ও জরুরি
গবেষকরা মন্তব্য করেছেন যে, আয় কেবল একটি আর্থিক বিষয় নয়; এটি সামাজিক মর্যাদা, কর্তৃত্ব এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একাধিক গবেষণা প্রতিবেদনে সাক্ষাৎকার নেওয়া পুরুষরা জানান যে, স্ত্রীরা বেশি আয় করার পর বা তারা নিজস্বভাবে ঘরের কাজের দায়িত্ব নিতে শুরু করার পর সমালোচনা ও উপহাসের মুখোমুখি হয়েছেন, এমনকি তাদের পুরুষত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এই সামাজিক চাপ পুরুষদের মানসিক চাপ বৃদ্ধি করে এবং নিজেদের মূল্য ধরা দেয়।
সুইডেনে পরিচালিত একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় ১০ বছরের আর্থিক ও চিকিৎসা সংক্রান্ত রেকর্ড বিশ্লেষণ করে পারিবারিক আয়ের এই পরিবর্তনের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলাফল অনুসারে, যেসব পুরুষের স্ত্রীরা বেশি আয় করতে শুরু করেছিলেন, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল। বিশেষজ্ঞরা লক্ষ্য করেছেন, নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে এই মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের প্রবণতা অনেক বেশি স্পষ্ট।
গবেষণা অনুযায়ী, যেসব পুরুষ চাকরি হারিয়েছেন বা পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির ঐতিহ্যগত ভূমিকা থেকে সরে এসেছেন, তারা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, হতাশা এবং উদ্বেগের প্রতি বেশি সংবেদনশীল ছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীরা সাধারণত পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে শক্তিশালী সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখেন, যার ফলে তাদের একটি বড় মানসিক সমর্থনের নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। অন্যদিকে, পুরুষরা মানসিক ও সামাজিক সমর্থনের জন্য মূলত তাদের স্ত্রীদের ওপর বেশি নির্ভরশীল। এই অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে যখন সম্পর্কের মধ্যে ভূমিকার পরিবর্তন ঘটে, তখন কিছু পুরুষের জন্য তা মানসিকভাবে মেনে নেওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন: প্রতিদিন কতগুলো ডিম খাওয়া নিরাপদ?
গবেষকরা জানিয়েছেন, এই চ্যালেঞ্জগুলো কাটানোর পাশাপাশি পারিবারিক কাঠামোর এই পরিবর্তনের কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। যেসব বাবা ঘরে বেশি সময় কাটান, তাদের সন্তানের সঙ্গে আত্মিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয় এবং তারা সন্তানের লালন-পালনে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন। এছাড়া, ঘরের কাজের সুষম বণ্টন শিশুদের মনে লিঙ্গ সমতার লক্ষ্যে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞরা সুনির্দিষ্টভাবে বলেছেন, আসল সমস্যা নারীদের বেশি আয় করা নয়, বরং সমস্যাটি সমাজের সনাতন বিশ্বাস—যা একজন পুরুষের মূল্যকে কেবল তার উপার্জন ক্ষমতার সঙ্গে পরিমাপ করে। গবেষকরা পরামর্শ দেন, পুরুষদের নিজের পরিচয়কে আর্থিক অবস্থার ফ্রেমে বন্দি না করে বাবা, জীবনসঙ্গী, যত্নশীল অভিভাবক এবং সমাজের একজন অবদানকারী হিসেবেও নিজেদের মূল্যায়ন করা উচিত।
বিশ্বাস করা হচ্ছে যে, বিশ্বজুড়ে নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ যত বাড়বে, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে নারী ও পুরুষ উভয়ই পরিবারের ঐতিহ্যগত ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবা। এই পরিবর্তনের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে মানিয়ে নিতে পারলে আরও ভারসাম্যপূর্ণ, সুস্থ ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
আরও পড়ুন: ফেলে দেয়া ৬ হাজার প্লাস্টিক বোতলে নির্মিত পূজামণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড়
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন