০২:৪৯ পি.এম
চলমান সামরিক সংঘাত ও দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অবরোধে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি যখন প্রায় স্থবির, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও চড়া, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সব পূর্বাভাস ভুল প্রমাণ করে চলেছে ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি। পশ্চিমা বিশ্ব ও ওয়াশিংটনের একের পর এক অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ ইরানকে ধসিয়ে দেওয়ার বদলে উল্টো এক অবাধ্য ও প্রতিরোধমুখী অর্থনীতিতে রূপ দিয়েছে।
বাহ্যিক দৃষ্টিতে পরিসংখ্যানগুলোকে বেশ ভয়াবহ মনে হতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবে চলতি বছর দেশটির অর্থনীতি ৫ দশমিক ৪ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। খোলাবাজারে প্রতি ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের দর নেমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ লাখে, আর খাদ্যের দামসহ সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছুঁয়েছে আকাশচুম্বী উচ্চতা। কিন্তু এই চরম বিরূপতার মধ্যেও দেশটির প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি ভেঙে পড়েনি, যা অনেক উন্মুক্ত বাজারভিত্তিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই ঘটত।
বিগত প্রায় দেড় দশক ধরে একের পর এক নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হতে ইরান এমন এক স্বাবলম্বী ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যা বাইরের ধাক্কা সামলাতে অভ্যস্ত। সাধারণ শান্তিকালীন সময়ে যেসব বিষয়কে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় প্রতিবন্ধক ভাবা হয়—যেমন বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্নতা, বিদেশি বিনিয়োগের অভাব ও অভ্যন্তরীণ বাজারে রাষ্ট্রের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ—যুদ্ধকালীন চরম সংকটে সেসব উপাদানই ইরানকে দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে।
আরও পড়ুন: ইরানের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামরিক প্রশিক্ষণের উদ্যোগে বিতর্কের সৃষ্টি
বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা থেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন থাকায় দেশটিতে আন্তর্জাতিক কোনো মূলধন বা ঋণ ফেরতের চাপ ছিল না। ফলে যুদ্ধের ধাক্কায় মুহূর্তের মধ্যে পুঁজি পাচারের যে ঝুঁকি থাকে, তা আগে থেকেই অবরুদ্ধ ছিল। এমনকি তেহরান স্টক এক্সচেঞ্জ টানা ৮০ দিন বন্ধ থাকার পর চালু হলেও সূচকের রেকর্ড ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়। রিয়ালের অবমূল্যায়ন এবং ডলার অর্জনের বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়ে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা স্থানীয় পুঁজিবাজারেই নিজেদের অর্থ লগ্নি করেছেন।
একই সঙ্গে বছরের পর বছর আরোপিত অবরোধের পথ ধরে ইরান যেসব বিকল্প আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ উন্মুক্ত করেছে, তা যুদ্ধের সময়েও সচল রয়েছে। চীন, রাশিয়া, তুরস্ক বা পাকিস্তানের সঙ্গে স্থল, রেল ও অপ্রাতিষ্ঠানিক সমুদ্রপথে তেল রপ্তানির নিজস্ব নেটওয়ার্ক তাদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড সোজা রেখেছে। এই সক্ষমতার জোরেই চরম সামরিক উত্তেজনার মাঝেও ইরান তাদের বাজেটের নির্ধারিত তেল রাজস্বের অর্ধেকেরও বেশি সচল রাখতে পেরেছে।
তবে এতে নিশ্চিতভাবেই কোনো স্থায়ী স্বস্তির খবর নেই। এই টিকে থাকার ব্যবস্থার পুরো মাশুল দিতে হচ্ছে দেশটির সাধারণ জনগণকেই। আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতির বাজারে পণ্য দিয়ে ভরিয়ে রাখলেও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে এনেছে। বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বলছে, দেশটির দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৪৫ শতাংশে।
অবকাঠামো সংস্কার স্থগিত রেখে কিংবা পুঞ্জীভূত সঞ্চয় ব্যয় করে এই কৌশল বেশি দিন চালানো সম্ভব নয়। দীর্ঘ দেড় দশকের নিষেধাজ্ঞায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন থমকে গেলেও, ইরান এমন এক অর্থনৈতিক প্রতিরোধশক্তি গড়ে তুলেছে যা উন্মুক্ত অর্থনীতির দেশগুলোতে দেখা যায় না। বাহ্যিক অর্থনৈতিক চাপ কিংবা অবরোধ প্রয়োগ করে কোনো দেশকে দ্রুত নতিস্বীকার করানোর প্রচলিত ধারণাকে ইরান আরও একবার পুনর্বিবেচনার মুখোমুখি দাঁড় করাল।
আরও পড়ুন: দুই বাংলাদেশির বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য দেয়নি সৌদি সরকার: পররাষ্ট্রমন্ত্রী শামা ওবায়েদ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন