০২:৩৪ পি.এম
রাশিয়ার সাইবেরিয়ায় প্লেগ গবেষণাগারের এক কর্মীর মৃত্যুর পর প্রায় ২০০ জনকে কোয়ারেন্টাইনে ও চিকিৎসা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। রুশ গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ওই নারী নিউমোনিক প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন, তবে দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এখনো এই তথ্য নিশ্চিত করেনি। বরং, প্রাথমিক পরীক্ষায় তার মৃত্যুর সঙ্গে গবেষণাগারে থাকা কোনো জীবাণুর সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
২৮ বছর বয়সী দারিয়া শিপিলোভা ইরকুৎস্ক অ্যান্টি-প্লেগ রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব সাইবেরিয়া অ্যান্ড দ্য ফার ইস্টে কর্মরত ছিলেন। ৩০ সেপ্টেম্বর অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২ অক্টোবর ইরকুৎস্কের কাছের শহর শেলেখভের একটি হাসপাতালে তার মৃত্যু ঘটে। রুশ কর্তৃপক্ষ তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘অজ্ঞাত কারণের নিউমোনিয়া’ উল্লেখ করেছে।
ঘটনার পর শিপিলোভার সংস্পর্শে আসা প্রায় ২০০ জনকে কোয়ারেন্টাইন ও চিকিৎসা পর্যবেক্ষণে নেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত প্লেগ বা অন্য কোনো উচ্চঝুঁকির সংক্রামক রোগের নিশ্চিত সংক্রমণ পাওয়া যায়নি। হাসপাতালটিতেও কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: পশ্চিমবঙ্গে ২৪ ঘণ্টায় দুই ‘এনকাউন্টার’, বিজেপি সরকারের বার্তা কী?
রুশ গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছিল যে, গবেষণাগারে একটি পরীক্ষানল ভেঙে যাওয়ার কারণে ওই নারী প্লেগের জীবাণুর সংস্পর্শে এসে থাকতে পারেন। তবে এই দাবি এখনো প্রমাণিত নয়। রাশিয়ার জনস্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ সংস্থা রসপোত্রেবনাদজর জানিয়েছে যে, গবেষণাগারে কোনো বিপজ্জনক জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার মতো দুর্ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, রুশ কর্তৃপক্ষ তাদের জানিয়েছে ইরকুৎস্কে এখন পর্যন্ত প্লেগের কোনো নিশ্চিত ঘটনা শনাক্ত হয়নি। সংস্থাটি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং রাশিয়ার বাইরে এই ঘটনার ঝুঁকি বর্তমানে খুবই কম বলে জানিয়েছে।
প্লেগ ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস (Yersinia pestis) নামের ব্যাকটেরিয়াজনিত একটি গুরুতর সংক্রামক রোগ। সাধারণত আক্রান্ত ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী ও তাদের শরীরে থাকা মাছির মাধ্যমে এই জীবাণু ছড়ায়। সাইবেরিয়াসহ বিশ্বের কিছু অঞ্চলে প্লেগ এখনো প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান।
প্লেগের তিনটি প্রধান ধরন হলো বুবোনিক, সেপটিসেমিক ও নিউমোনিক। এর মধ্যে বুবোনিক প্লেগ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এতে সাধারণত লসিকা গ্রন্থি ফুলে যায় এবং জ্বর, কাঁপুনি, মাথাব্যথা ও শরীরব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
আরও পড়ুন: কোরিয়ায় বাংলাদেশিসহ বিদেশি কর্মীদের ওপর জরিমানা বন্ধে নজরদারির তাগিদ
সেপটিসেমিক প্লেগ রক্তে সংক্রমণ ঘটায়। আর নিউমোনিক প্লেগ ফুসফুসে আক্রান্ত করে। এ ধরনের সংক্রমণে কাশি, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট এবং কখনো রক্তমিশ্রিত কফ হতে পারে। নিউমোনিক প্লেগ আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসতন্ত্রের নিঃসরণ থেকে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা অন্য মানুষের শরীরেও ছড়াতে পারে।
চিকিৎসা না করা হলে নিউমোনিক ও সেপটিসেমিক প্লেগ দ্রুত প্রাণঘাতী হতে পারে। তবে দ্রুত শনাক্ত করা গেলে অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে প্লেগের চিকিৎসা করা সম্ভব। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার কারণে বর্তমানে রোগটির বৈশ্বিক ঝুঁকি অতীতের তুলনায় অনেক কম।
ইরকুৎস্কের ঘটনাটি ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নজরদারি শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই, তবে ঘটনাটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভও জনগণ ও সংবাদমাধ্যমকে গুজব বা অনুমানের বদলে রুশ জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সরকারি তথ্য অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: মাওকে নিয়ে রসিকতায় চীনের বড় দুটি কোম্পানির চুক্তি হারাল এমবাপ্পে
বিশেষজ্ঞদের মতে, গবেষণাগারে সম্ভাব্য বিপজ্জনক জীবাণুর সংস্পর্শের আশঙ্কা তৈরি হলে সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে কোয়ারেন্টাইনে রাখা এবং চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ করা স্বাভাবিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা। ফলে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও সেটিকে নিশ্চিত প্লেগের প্রাদুর্ভাব হিসেবে দেখার মতো প্রমাণ এখনো নেই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রুশ কর্তৃপক্ষ এখনো দারিয়া শিপিলোভার মৃত্যুর কারণ হিসেবে প্লেগ নিশ্চিত করেনি। সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের মধ্যেও প্লেগের কোনো নিশ্চিত সংক্রমণ পাওয়া যায়নি। তাই ঘটনাটি পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন থাকলেও এটিকে এই মুহূর্তে নতুন কোনো বৈশ্বিক প্লেগ মহামারির সূচনা হিসেবে দেখার কারণ নেই। তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন