০৫:১৪ পি.এম
চলে গেল ১৪৪৭ হিজরি। হিজরি বর্ষ হিসাবে আমাদের জীবন থেকে আরেকটি বছর বিদায় নিচ্ছে। মানুষের জীবনে একটি বছরের প্রস্থান ছোটখাটো ঘটনা নয়। প্রতিটি বিদায়ী বছর আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে জীবনের পুঁজি ক্রমেই ক্ষয় হচ্ছে এবং চূড়ান্ত গন্তব্যের দিকে আমরা যাবতীয়ভাবে এগিয়ে চলেছি। নতুন বছরে পদার্পণের এই মুহূর্তে আমাদের প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, আত্মপর্যালোচনা এবং বিগত সময়ের হিসাব-নিকাশ।
মুহাসাবা মুমিন জীবনের অপরিহার্য অনুশীলন।
হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলেছিলেন, "حَاسِبُوا أَنْفُسَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُحَاسَبُوا" - তোমরা নিজেদের হিসাব করো, তোমাদের হিসাব গ্রহণের পূর্বেই। মুমিন জীবনে মুহাসাবা বা আত্মসমালোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। যখন মানুষ নিজের কর্ম, আচরণ ও দায়িত্বসমূহের পর্যালোচনা করে, তখন সে নিজের ত্রুটি-বিচ্যুতি চিহ্নিত করতে পারে এবং সংশোধনের উপায় খুঁজে পায়।
আরও পড়ুন: মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় হানিফসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে আজ রায়
আমাদের প্রথম হিসাব হওয়া উচিত ঈমান ও আমলের ব্যাপারে। কি আমরা ঈমান সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করেছি? ঈমানবিরোধী চিন্তা ও কর্ম থেকে কতটুকু দূরে থাকতে পেরেছি? ফরজ নামাজ, রোজা, জাকাত ও হজের মতো মৌলিক ইবাদতসমূহ কি যথাযথভাবে আদায় করা সম্ভব হয়েছে? একইভাবে ওয়াজিব ও সুন্নাতে মুয়াক্কাদা আমলসমূহের পাশাপাশি কুরআন তিলাওয়াত, দুআ, জিকির, তাসবিহ ও ইস্তিগফারের ব্যাপারে নিজের অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, "يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ" - হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন লক্ষ্য করে, সে আগামী দিনের জন্য কী প্রেরণ করেছে। (সুরা হাশর: ১৮)
মুহাসাবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো পারিবারিক দায়িত্ব। মা-বাবার সেবা, স্ত্রী-সন্তানের প্রতি সদাচার, আত্মীয়-স্বজনের হক আদায়, তাদের দ্বীনি ও দুনিয়াবি প্রয়োজন পূরণের চেষ্টা সম্পর্কে আমাদের অবস্থান কি? পরিবারকে দ্বীনের পথে পরিচালিত করতে আমরা কতটুকু চেষ্টা করেছি?
আল্লাহ তাআলা বলেন, "يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا" - হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো। (সুরা তাহরিম: ৬)
আরও পড়ুন: ডিসেম্বরে খুলছে পঞ্চবটি-মুক্তারপুর দ্বিতল সড়ক, টোল নির্ধারণ
চাকরি, ব্যবসা কিংবা যেকোনো পেশাগত দায়িত্বও মুহাসাবার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত। আমরা কি চুক্তিকৃত সময় যথাযথভাবে দিয়েছি? অর্পিত দায়িত্ব আমানতদারিত্বের সঙ্গে পালন করেছি? ব্যবসা-বাণিজ্যে হালাল পন্থা অবলম্বন করতে পেরেছি? অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পেরেছি?
রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "لَا إِيمَانَ لِمَنْ لَا أَمَانَةَ لَهُ" - যার আমানতদারি নেই, তার পূর্ণ ঈমান নেই। (মুসনাদু আহমদ: ১২৫৬৭)
আমাদের দায়িত্ব কেবল নিজের পরিবার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। চারপাশের মুসলিম সমাজ, নির্যাতিত মানুষ এবং বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর প্রতিও আমাদের দায় রয়েছে। আমরা কতটুকু তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি? কতটুকু সহমর্মিতা প্রকাশ করেছি? কতটুকু দুআ করেছি? কতটুকু সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করেছি? এসব প্রশ্নের উত্তরও আমাদের খুঁজে দেখতে হবে।
রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "مَثَلُ الْمُؤْمِنِينَ فِي تَوَادِّهِمْ وَتَرَاحُمِهِمْ وَتَعَاطُفِهِمْ كَمَثَلِ الْجَسَدِ الْوَاحِدِ" - মুমিনরা পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহমর্মিতায় একটি দেহের ন্যায়। (সহিহ বুখারি: ৬০১১)
আরও পড়ুন: যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাই সন্দেহে গণপিটুনিতে আহত যুবক নিশাত মিয়ার মৃত্যু
উন্নতি কি হয়েছে? মুমিনের জীবন স্থবির হতে পারে না। প্রতিনিয়ত তার উন্নতির পথে এগিয়ে চলার কথা। প্রচলিত একটি বাণী রয়েছে, "مَنْ اسْتَوَى يَوْمَاهُ فَهُوَ مَغْبُونٌ" - যার আজ ও গতকাল সমান, সে ক্ষতিগ্রস্ত। সুতরাং ঈমান, আমল, ইলম, আখলাক ও চরিত্র সব ক্ষেত্রেই আমাদের উন্নতির ধারা অব্যাহত থাকা উচিত।
আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান, তার সিফাত ও গুণাবলীর পরিচয়, তার প্রতি ভয় ও ভালোবাসা, শরিয়তের বিধান সম্পর্কে সচেতনতা এসব বিষয়ে ক্রমাগত অগ্রগতি একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
ইসলামি আখলাক কেবল কিছু ভদ্র আচরণের নাম নয়; বরং এটি মানুষের অন্তর, চিন্তা, স্বাভাবিকতা ও কর্মের সামগ্রিক পরিশুদ্ধির শিক্ষা। সুন্দর চরিত্র শিক্ষা, অনুশীলন এবং আত্মসংযমের মাধ্যমে অর্জিত হয়। তাই আমাদের নিজের চরিত্র ও আচরণের উন্নতি কতটুকু হয়েছে, সেটাও মুহাসাবার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ" - আমি তো প্রেরিত হয়েছি উত্তম চরিত্রকে পরিপূর্ণ করার জন্য। (মুসনাদ আহমদ: ৭৯৫২)
আরও পড়ুন: গণভোটের রায় না মানলে তারেক রহমানের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই: জুনায়েদ
মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার জীবন এবং সময়। এই পুঁজিই আমরা প্রতিনিয়ত ব্যয় করে চলেছি। একজন সচেতন ব্যবসায়ী যেমন নিয়মিত তার লাভ-ক্ষতির হিসাব মিলিয়ে দেখে, তেমনি একজন মুমিনের উচিত তার সময় ও কর্মের হিসাব নেওয়া। আর এই জীবনও আমাদের নিজস্ব সম্পদ নয়; এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রদত্ত একটি আমানত।
রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "كُلُّ النَّاسِ يَغْدُو فَبَائِعٌ نَفْسَهُ فَمُعْتِقُهَا أَوْ مُوبِقُهَا" - প্রত্যেক মানুষ সকালে বের হয়; অতঃপর সে নিজেকে বিক্রি করে, কেউ তাকে মুক্ত করে, আর কেউ তাকে ধ্বংস করে। (সহিহ মুসলিম: ২২৩) প্রতিটি দিন, প্রতিটি সপ্তাহ, প্রতিটি মাস এবং প্রতিটি বছর মানুষকে একই বার্তা দেয় যে, সে কি মুক্তির দিকে এগোচ্ছে, নাকি ধ্বংসের দিকে?
নতুন মাসের চাঁদ দেখে রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দুআ পাঠ করতেন, "اللَّهُمَّ أَهِلَّهُ عَلَيْنَا بِالْأَمْنِ وَالْإِيمَانِ، وَالسَّلَامَةِ وَالْإِسْلَامِ، رَبِّي وَرَبُّكَ اللَّهُ" - হে আল্লাহ! এ চাঁদকে আমাদের ওপর উদিত করুন নিরাপত্তা ও ঈমানসহ, শান্তি ও ইসলামসহ। (হে চাঁদ!) আমার ও তোমার উভয়ের রব আল্লাহ। (মুসতাদরাকে হাকেম: ৭৭৬৭; সহিহ ইবনু হিব্বান: ৮৮৮)
এই দুআ আমাদের শিক্ষা দেয়, নতুন মাস ও নতুন বছর কেবল ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন নয়; বরং ঈমান, ইসলাম, নিরাপত্তা ও কল্যাণের নতুন প্রত্যাশা।
আরও পড়ুন: বিয়ের ১৫ দিনের মাথায় সড়কে প্রাণ গেল ইতালি প্রবাসী তানভীরের
ব্যক্তি ও সমাজের অশান্তি, অন্যায়-অবিচার, দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলার প্রধান কারণ মানুষের ভুল বিশ্বাস, দুর্বল চরিত্র এবং অসৎ কর্ম। তাই ব্যক্তি ও সমাজের প্রকৃত সংস্কারের জন্য প্রয়োজন আত্মশুদ্ধি, চরিত্র গঠন এবং আল্লাহর বিধানের অনুসরণ। ১৪৪৮ হিজরির সূচনালগ্নে আসুন আমরা নিজেদের দিকে ফিরে তাকাই। বিগত সময়ের হিসাব গ্রহণ করি, ভুল-ত্রুটির জন্য তাওবা করি এবং অবশিষ্ট জীবনকে ক্ষতি পূরণ ও উন্নতির সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের নতুন বছরকে ঈমান, ইসলাম, শান্তি, নিরাপত্তা ও কল্যাণে পরিপূর্ণ করে দিন। আমাদের জীবনকে করুন তাঁর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন